বিয়ের রাত থেকেই স্বামী–স্ত্রীর মনোমালিন্য শুরু...

আরিফিন শুভ ও কেয়া পায়েল
ছবি: চরকির সৌজন্যে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মোহে আমাদের সম্পর্কগুলো কি দিন দিন মরচে পড়ে যাচ্ছে? বর্তমান সময়ে সম্পর্কের এই দূরত্ব, টানাপোড়েনের প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করেই চরকির নতুন ওয়েব সিনেমা হ্যাপিলি ম্যারিড। প্ল্যাটফর্মটির ‘মিনিস্ট্রি অব লাভ’ প্রকল্পের সিনেমাটি বানিয়েছেন জাহিদ প্রীতম। এতে প্রথমবার জুটি বেঁধেছেন আরিফিন শুভ ও কেয়া পায়েল। কেমন জমল তাঁদের ‘বিবাহিত জীবন’?

কী আছে এর গল্পে
আনিস (আরিফিন শুভ) বিদুৎ অফিসের প্রকৌশলী। বয়স ৩৫ বছর পেরোলেও বিয়ে করতে চান না। পাত্রী দেখানো হয়। কিন্তু সব পরিকল্পনাই ব্যর্থ। একদিন মেয়ের বাবা (সালাহউদ্দিন লাভলু) কায়দা করে মেয়ে অনামিকাকে (কেয়া পায়েল) দেখান। হবু শ্বশুরের এই গোয়েন্দাগিরি বুঝতে পারে না আনিস। কিন্তু তাঁর মেয়েকে বিয়ের জন্য মনে ধরে যায়। কিন্তু তাঁদের বয়সের ব্যবধান বেশ। দুজন দুই প্রজন্মের। শুরুতে এসব কোনো বাধা হয় না। বিয়ে হয়ে যায়। এটাকেই ‘হ্যাপিলি ম্যারিড’ ধরে নিয়ে ভুল করবেন। এটা মাত্র গল্পের শুরু।

নবদম্পতির বিয়ের দিন থেকেই জটিলতা বাড়তে থাকে। বাসরঘরে মন খারাপ করে বসে থাকে কনে অনামিকা। সদ্য টিনেজ পার করা মেয়েটির মনের ভাবনা বোঝার কথা নয় স্বামীর। অনামিকা রাতেই স্বামীকে বলে দেয়—‘এটা কোনো বিয়ে হলো?’ তার স্বপ্ন ছিল, পাত্র আসবে ঘোড়ায় চড়ে, রাজপুত্রের মতো। সবার তাক লেগে যাবে। পাত্রী কত আশা নিয়ে বসে আছে বিয়ে ছবি ফেসবুক পোস্ট করবে। প্রচুর লাইক কমেন্ট আসবে সেই পোস্টে। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার মতো বিয়ের কোনো ছবিই পাওয়া যায় না। আনিস বুঝতে পারে, বউয়ের তার চেয়ে ফেসবুক–ইনস্টাগ্রাম–প্রীতিই বেশি। তবু সে শুরুতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। দুজনের মিল অমিল আর মানসিক দ্বন্দ্বের শুরু বাসরঘর থেকেই। এরপর কী হয়, তা নিয়েই এগিয়েছে সিনেমাটির গল্প। সিনেমাটির গল্পের সঙ্গে এই সময়ের যোগ আছে; সে কারণেই হয়তো প্রিমিয়ারে আরিফিন শুভ আগেই বলেছিলেন, ‘যাঁরা বিয়ে করেন নাই, তাঁদের এই সিনেমা দেখে বিয়ে করতে মন চাইবে। বিবাহিত অবিবাহিত সবাইকে এই সিনেমা ভাবাবে।’

আরিফিন শুভ ও কেয়া পায়েল
ছবি: চরকির সৌজন্যে

জটিল সম্পর্কে তৃতীয়জন
হ্যাপিলি ম্যারিড নামটি যতটা মিষ্টি শোনায়, বাস্তব জীবনে একটি দম্পতির পথচলা কি সব সময় এত মসৃণ, এতটা মধুর হয়? আনিস ও অনামিকার সম্পর্কের এই দোলাচলের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গল্পের পরতে পরতে সামনে আসে আধুনিক জীবনের নানা জটিলতা, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভূত। প্রযুক্তির এই প্রভাবে সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে দিচ্ছে, সেটা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই ওয়েব ফিল্মে। দুই প্রজন্মের চাওয়া–পাওয়ার ব্যবধানও স্পষ্ট করেছেন নির্মাতা। কারও কাছে জীবন মানে মানিয়ে নেওয়া; কারও কাছে জীবন মানে নিজের ইচ্ছেমতো সব পাওয়া। সেই ইচ্ছা থেকেই স্বামীকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না অনামিকা। দেয় কঠিন শর্ত— মানসিকভাবে দুজন একাত্ম না হলে শারীরিক দূরত্বও বজায় রাখতে হবে। সেই শর্ত কি পূরণ করতে পারবে আনিস? সংসারে জন্ম নেয় সন্দেহ। দৃশ্যপটে হাজির হন আলোচিত এক সেলিব্রিটি। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরেফিন জিলানী, যাঁর ভক্ত অনামিকা। প্রিয় তারকার সঙ্গে কি প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন অনামিকা? সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্ন গভীর হতে থাকে।

আরিফিন শুভ ও কেয়া পায়েল
ছবি: চরকির সৌজন্যে

অভিনয় ও রসায়ন
সিনেমার অন্যতম বড় প্রাপ্তি প্রধান দুই চরিত্রের অভিনয়। চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ তাঁর স্বভাবসুলভ অভিনয় দিয়ে আনিস চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সহজ–সরল যুবকের চরিত্র। অফিস আর রান্না করা ছাড়া তাঁর জীবনে বিয়ের আগে কিছুই ছিল না। বাড়িতে আনিসের আটপৌরে জীবন কিংবা অফিসে কর্মী হিসেবে তাঁর চরিত্রায়ণ ছিল যথাযথ। এ ছাড়া সাদামাটা রান্না করা, বউয়ের মন পাওয়ার জন্য উতলা হওয়া; আনিসকে দেখে মনে হয় পাশের বাড়ির চেনা কেউ। অনামিকার সঙ্গে তাঁর রোমান্টিক দৃশ্যগুলোও চোখজুড়ানো।

সোশ্যাল মিডিয়া-আসক্ত তরুণীর চরিত্রে কেয়া পায়েলও বেশ মানিয়ে গেছেন। কখনো রাগী, কখনো জীবন নিয়ে হিসেবি, কখনো স্বামীর প্রতি কিছুটা মনোযোগী। অনামিকা খাবারের ব্যাপারে খুব সচেতন। স্বামীর রান্না করা কোন খাবারে কত ক্যালরি রয়েছে, সবই তাঁর মুখস্থ। স্বামীর সাধারণ জীবনযাপন একসময় তিনি গোপনেই পছন্দ করতে থাকেন। সম্পর্কের এই রসায়ন দর্শকের নজর কাড়বে। পর্দায় তাঁদের টানাপোড়েনও বাস্তবসম্মত মনে হয়।

নজড় কেড়েছে পার্শ্বচরিত্র
শখের গোয়েন্দা চরিত্রে সালাহউদ্দিন লাভলুর কথা আলাদা করে বলতে হয়। একসময় তিনি গল্প থেকে হারিয়ে যান। তাঁর চরিত্র গল্পের প্রয়োজনে আরেকটু বড় করলে মন্দ হতো না। এ ছাড়া গল্পের শেষ পর্যন্ত তাঁর গোয়েন্দাগিরি চললে আরও মানানসই হতো। মোটাদাগে তাঁর চরিত্রায়ণ ছিল যথাযথ। ফ্যামিলি ড্রামায় বাড়তি পাওয়া ছিল দীপা খন্দকার ও তুষার খানের অভিনয়। তাঁদের খুনসুটি দর্শকদের হাসিয়েছে। গল্পের প্রয়োজনের তাঁদের চরিত্র এসেছে, যা যথাযথ ছিল। শিশুশিল্পী হিসেবে ভালো নম্বর পাবে রাই রাজন্য।

আরও পড়ুন
জাহিদ প্রীতম। চরকির সৌজন্যে
ছবি: চরকির সৌজন্যে

নির্মাণশৈলী, চিত্রনাট্য, আবহ সংগীত ও সিনেমাটোগ্রাফি
পরিচালক জাহিদ প্রীতম রোমান্টিক গল্পটিতে বেশ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন দৃশ্যের নান্দনিক উপস্থাপনে। দুই প্রজন্মের জীবনযাপন যথাযথভাবে তুলে ধরেছেন। সম্পর্কের ভেতরের হাহাকারকে তিনি খুবই কাছ থেকে দেখিয়েছেন। হালকা চালে অথচ গভীর অর্থে তুলে ধরেছেন। চিত্রনাট্যের সঙ্গে সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেশ মানিয়ে গেছে। শহুরে যান্ত্রিকতা এবং মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরের ভেতরের উষ্ণতা—উভয় পরিবেশই সিনেমাটোগ্রাফার চমৎকারভাবে ক্যামেরাবন্দী করেছেন।

কতটা জমল

হ্যাপিলি ম্যারিড–এর গল্পটি আগে থেকেই ধারণা করা যায়। চিত্রনাট্যের এ জায়গায় আরেকটি যত্ন নেওয়া যেত। কারণ গল্পটি নতুন ছন্দ তৈরি করে না। একই ভাবে এগোতে থাকে। এ ছাড়া দীর্ঘ একটা সময় স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন দেখানো হয়েছে। এখানে দৈর্ঘ্য আরও কমালে গল্পটি টানটান হতে পারত। বিয়ের আগে আনিস ও অনামিকার প্রথম দেখার কথোপকথন মনে করে দেয়, অনামিকার পরিপক্বতার কথা। বিয়ের পরে সেই অনামিকাকে একেবারেই বিপরীত আচরণ দেখা যায়। গল্পে মায়ের সঙ্গে তরুণ আনিসের ভিডিওটি আরও আবেগ যোগ করতে পারত। এ ছাড়া সেলিব্রেটি হিসেবে আরিফিন জিলানীকে হাজির করা হলেও তাঁর উপস্থাপনা আরও জমকাল হতে পারত। তাঁর সঙ্গে চ্যাটকে ঘিরে যে সন্দেহ তৈরি হয়, সেটা পরে ভিন্নভাবে দেখানো হয়। স্রেফ নাটকীয়তা যোগ করার জন্য যে দৃশ্যগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলোতে আরও যত্নবান হলে ভালো হতো। কারণ কারও সঙ্গে প্রেম আর বন্ধুত্ব সম্পর্কটা আলাদা। তবু হালকা মেজাজের রোমান্টিক–কমেডি, ড্রামা সিনেমাটি মোটের ওপর উপভোগ্য।