মন ভালো করতে গিয়ে অভিনেত্রী
অভিনেত্রী হিসেবে ধীরে ধীরে পরিচালকদের আস্থা অর্জন করছেন স্বর্ণালী চৈতী। মুক্তির অপেক্ষায় আছে চারটি সিনেমা। শিগগিরই শুরু করবেন বাংলাদেশ–ফ্রান্স যৌথ প্রযোজনায় নতুন আরেকটি সিনেমা।
ব্যক্তিগত কারণে মন–মেজাজ ভালো নেই। সময়টা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। বন্ধু মহুয়াই বুদ্ধি দিলেন, ‘চল, আমার সঙ্গে নাটক করবি।’ মঞ্চ বা অভিনয় নিয়ে স্বর্ণালী চৈতীর খুব যে একটা আগ্রহ ছিল, তা নয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিষয় নিয়ে পড়ার সময় বিভাগের শিক্ষক অভিনেতা শরীফ সিরাজের তত্ত্বাবধানে একবার একটু অভিনয় করেছিলেন, এই যা। তা–ও দোনোমনা করে মহুয়ার সঙ্গে গেলেন। এভাবেই নাট্যদল তাড়ুয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। কিছুদিন পর মনে হলো অভিনয় ব্যাপারটা মন্দ নয়। আবিষ্কার করলেন, নিজেকে পর্দায় দেখতে ইচ্ছা করছে। এই ইচ্ছাই বদলে দিল পরের চার বছরের গতিপথ। ‘শুরুর সময় থিয়েটারের মৌলিক বিষয়গুলোই জানতাম না, যেতাম খারাপ সময়ে পেছনে ফেলে একটু আনন্দের জন্য। পরিচালক যখন চরিত্র ধরিয়ে দিতেন, সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজেকে কল্পনায় পর্দায় দেখতে পেতাম। কিন্তু আমি তো কাউকে চিনি না। আমাদের দলের বাকার বকুল ভাইকে নিজের ইচ্ছার কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে প্রাচ্যনাট অ্যাক্টিং স্কুলে ভর্তির পরামর্শ দেন। বিভিন্ন অডিশনের খবর জানান। এভাবেই শুরু,’ বলছিলেন চৈতী।
নানা রকম সিনেমা
চৈতীর প্রথম সিনেমা রতন পালের অন্তরখোলা। ২০২১-২২ অর্থবছরে অনুদান পাওয়া সিনেমাটির জন্য অডিশন দিয়েই টিকে যান। সিনেমাটির জন্য নিয়মিত ওয়ার্কশপ হতো, সঙ্গে প্রাচ্যনাটের স্কুলেও অভিনয় শিখেছেন। তত দিনে চৈতী পুরোপুরি অভিনয়ে মজে গেছেন। প্রাচ্যনাটের কোর্স শেষে আবার তাড়ুয়ায় ফিরে নাটকে ব্যস্ত হলেন আর খুঁজতে থাকলেন নতুন সুযোগ। তাড়ুয়ার হয়ে করছেন আদম সুরত, লেট মি আউটসহ কয়েকটি নাটক।
ওয়াহিদ তারেক ও ইমতিয়াজ সজীবের একটা প্রকল্পে কাজ করলেন। এসব কাজের শুটিং আর ডাবিংয়ে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। কয়েকটা বিজ্ঞাপনচিত্র করলেন। তত দিনে মোটামুটি একটা পরিচিতি তৈরি হয়ে গেছে। এর মধ্যেই পেয়ে গেলেন দ্বিতীয় সিনেমা, নূর ইমরান মিঠুর কুরকাব। সেই সিনেমার শুটিং শেষেই পেলেন এন রাশেদ চৌধুরীর সখী রঙ্গমালা সিনেমার অডিশনের ডাক। ফুলেশ্বরী চরিত্রে চূড়ান্ত হলেন। এরপর রায়হান রাফীর আন্ধার। অডিশনের পরে চূড়ান্ত হলেন। কিন্তু মনে একটু ভয়ও ছিল, আফসানা মিমি, চঞ্চল চৌধুরী, সিয়াম আহমেদ, নাজিফা তুষি, মোস্তফা মন্ওয়ার—এত অভিনেতার ভিড়ে হারিয়ে যাবেন না তো। সংশয় থেকেই পরিচালককে কথাটা বললেন। অভয় দিলেন রাফী, তিনি তাঁর শিল্পীদের কখনো ‘মিসইউজ’ করেন না। ভরসা পেয়ে কাজে ডুবে গেলেন। সিদ্ধান্তটা যে ভুল ছিল না, সেটা গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিনেমাটির টিজার মুক্তির পর থেকেই বুঝতে পারছেন। সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশংসা করছেন।
আলোচিত নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ ছাড়াও চৈতীর কাছে আলাদা হয়ে আছে সিনিয়র শিল্পীদের সান্নিধ্য। ‘চঞ্চল ভাই, তুষি আপুসহ সিনিয়র সবাই খুব সাহায্য করেছেন। আমার নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য মজা করেছেন। লাঞ্চের পর দেখা যেত, চঞ্চল ভাই আমার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতেন। এসব আমার জন্য বড় পাওয়া,’ বললেন চৈতী। কথায় কথায় একটা মজার ব্যাপারও শেয়ার করতে ভুললেন না এই তরুণ অভিনেত্রী, হরর সিনেমা আন্ধার–এ তাঁর কাজ ছিল সবাইকে ভয় দেখানো; কিন্তু বাস্তবে সেটের সবার মধ্যে তিনিই নাকি সবচেয়ে ভীতু!
চার সিনেমা শেষ করে চৈতী এখন ব্যস্ত হয়ে পড়বেন দ্য অরেঞ্জ সিনেমার কাজে। স্বপন আহমেদের সিনেমাটিতে আরও আছেন তৌকীর আহমেদ ও ফয়জুল ইয়ামিন। বাংলাদেশের ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও ফ্রান্সের চারটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণাধীন সিনেমাটির বাংলা নাম পথের বন্ধু। ফ্রান্সে গিয়ে একজন বাংলাদেশিপ্রবাসী নিখোঁজ হয়ে যান। অনেক বছর পর তাঁর খোঁজে ফ্রান্সে যান তাঁর মেয়ে। হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খুঁজে ফেরার গল্প নিয়েই সিনেমা। এতে চৈতীর অংশের শুটিং শুরু হবে আগামী মাসে।
মেরিল স্ট্রিপ ফর্মুলা আর অরুন্ধতী হতে চাওয়া
সিনেমার মানুষ হলেও অবসরে দেখার চেয়ে চৈতী বেশি পড়েন। সিনেমা–সিরিজও দেখেন তবে বেশির ভাগই চরিত্রের প্রস্তুতির জন্য। এই যেমন দ্য অরেঞ্জ–এর শুটিংয়ের জন্য এখন দেখছেন ঋতুপর্ণ ঘোষের বাড়িওয়ালি। তবে তাঁর চরিত্রের প্রস্তুতির জন্য একটা কমন ফর্মুলা আছে—মেরিল স্ট্রিপ। ‘তিনি আবার খুবই পছন্দের অভিনেত্রী। তাঁর কাজ থেকে আমি সব সময়ই প্রেরণা নেই। কোনো দৃশ্য করার আগে মাঝেমধ্যেই তাঁর সিনেমার ক্লিপস দেখি—এটা একটা সিক্রেট,’ বললেন চৈতী।
বই যেহেতু পড়েন, এখন কী পড়ছেন? জানালেন অরুন্ধতী রায়ের মাদার মেরি কামস টু মির কথা। চৈতী এমনিতেই আত্মজৈবনিক ঘরানার বই পড়তে ভালোবাসেন। অরুন্ধতী রায়ের এই বইটি তাঁকে মুগ্ধ করেছে। জানিয়ে রাখলেন একটা গোপন ইচ্ছার কথাও। কখনো এই বই থেকে সিনেমা হলে তিনি পর্দায় অরুন্ধতী হতে চান। ‘অনেকেই নিজের গল্প বলতে গেলে সৎ থাকতে পারেন না। কিন্তু বইতে তিনি (অরুন্ধতী রায়) অকপটে নিজের ভুলের কথাও বলেছেন। এ জন্যই এত ভালো লেগেছে,’ বললেন চৈতী।
সামনের দিনগুলোয় মনের মতো আরও কাজ করতে চান, মুক্তির পর সিনেমাগুলো নিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানতেও মুখিয়ে আছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা নেই; বরং এগোতে চান, দিন হিসাব করে; ছোট ছোট পদক্ষেপে। জানিয়ে রাখলেন, সিনেমা করলেও মঞ্চটা ছাড়বেন না। মন খারাপ সরাতে এসে সেখান থেকেই তো শুরু!