হঠাৎ আলোচনায় ইন্দোনেশিয়ান অভিনেত্রী, কে এই আগনেজ মো

আগনেজ মো। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

ইন্দোনেশিয়ার বিনোদনজগতে তাঁর পরিচিতি তিন দশকেরও বেশি সময়ের। গান, অভিনয়, নাচ, টেলিভিশন উপস্থাপনা—সবখানেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু বিশ্বের অনেক দর্শক হয়তো তাঁকে প্রথমবার দেখছেন ‘রিচার’-এর চতুর্থ মৌসুমে। তিনি আগনেজ মো।

প্রাইম ভিডিওর জনপ্রিয় অ্যাকশন সিরিজ ‘রিচার’-এর চতুর্থ মৌসুমে লিলা হথ চরিত্রে অভিনয় করছেন এই ইন্দোনেশীয় তারকা। ১২ আগস্ট শুরু হয়েছে নতুন মৌসুম। আর সিরিজে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনোদনমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা।
ইন্দোনেশিয়ায় অবশ্য আগনেজ মোকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ছয় বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই তারকা এখন দেশটির সবচেয়ে পরিচিত বিনোদন তারকাদের একজন। তিন দশকের ক্যারিয়ারে শিশুশিল্পী থেকে কিশোর তারকা, অভিনেত্রী, গায়িকা, নৃত্যশিল্পী ও আন্তর্জাতিক পপ তারকা—একাধিক পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। এবার তাঁর সেই দীর্ঘ যাত্রায় যুক্ত হলো হলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি।

ছয় বছর বয়সেই শুরু
১৯৮৬ সালের ১ জুলাই জাকার্তায় জন্ম অ্যাগনেস মনিকা মুলজোতোর। পরে পেশাগতভাবে পরিচিত হন আগনেজ মো নামে। মাত্র ছয় বছর বয়সে বিনোদনজগতে প্রবেশ করেন তিনি। শিশুশিল্পী হিসেবে নব্বইয়ের দশকে তিনটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। একই সময়ে শিশুদের অনুষ্ঠান উপস্থাপনাও করতেন।

শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু হলেও খুব দ্রুতই অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ২০০১ সালে ইন্দোনেশীয় টেলিভিশন ড্রামা ‘পেরনিকাহান দিনি’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। স্কুলপড়ুয়া এক কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি, যে গর্ভবতী হয়ে অল্প বয়সেই বিয়ের মুখোমুখি হয়। চরিত্রটি তাঁকে কিশোর প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা বানিয়ে দেয়।

এরপর ইন্দোনেশিয়ার একাধিক টেলিভিশন সিরিজে অভিনয় করেন আগনেজ। শুধু নিজের দেশেই থেমে থাকেননি; তাইওয়ানের ‘দ্য হসপিটাল’ ও ‘রোমান্থ ইন দ্য হোয়াইট হাউস’-এর মতো প্রযোজনাতেও দেখা গেছে তাঁকে।

অভিনয় থেকে গানে
কিশোর বয়সে অভিনয়ের পাশাপাশি গানেও নিজের জায়গা তৈরি করেন আগনেজ। ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘অ্যান্ড দ্য স্টোরি গোজ’ অ্যালবামের মাধ্যমে শিশুশিল্পী থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পপ তারকায় রূপান্তরের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ‘হোয়াড্ডাপ এ...?’ ও ‘সেক্রেডলি অ্যাগনেশিয়াস’ তাঁকে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ সংগীত তারকাদের একজন করে তোলে।

গানই একসময় আগনেজের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে। তবে অভিনয় পুরোপুরি ছেড়ে দেননি; বরং বিভিন্ন সময় টেলিভিশনেও সক্রিয় ছিলেন। ‘ইন্দোনেশিয়ান আইডল’ ও ‘দ্য ভয়েস অব ইন্দোনেশিয়া’র বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তত দিনে আগনেজ মো আর শুধু ইন্দোনেশিয়ার তারকা নন; তাঁর লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক সংগীতবাজার।

‘রিচার’–এর চতুর্থ মৌসুমে আগনেজের চরিত্র লায়লা হথ। গল্পে তার মা আমিশা হথকে সঙ্গে নিয়ে ফিলাডেলফিয়ায় আসে। সে জানায়, তার লিউকেমিয়া হয়েছে এবং তার বাবা কংগ্রেসম্যান জন স্যাম্পসনের সন্ধান করছে। কারণ তার কাছ থেকে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু লিলার গল্প যত এগোয়, ততই সেটি জ্যাক রিচারের তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। লায়লার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি গায়িকা আংগুন। ফলে একই মৌসুমে দুই আন্তর্জাতিক সংগীত তারকাকে অভিনয়ে দেখা গেছে। লায়লা সম্পর্কে আগনেজের নিজের ব্যাখ্যাও বেশ আকর্ষণীয়। তাঁর ভাষায়, লিলা এমন একজন মানুষ, যার ভেতরে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। বুদ্ধিমান, দৃঢ় এবং আবেগের দিক থেকে বহুস্তরীয়। তাঁর সবচেয়ে ভালো লেগেছে চরিত্রটির একমাত্রিক না হওয়া। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সে একজন স্বাভাবিক মানুষ।

স্বপ্ন ছিল আমেরিকার বাজার
২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় আগনেজের ইংরেজি ভাষার অ্যালবাম ‘আগনেজ মো’। এরপর আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তিনি। মার্কিন র‍্যাপার টি আই এবং প্রযোজক টিম্বাল্যান্ডের সঙ্গে ‘কোক বটল’ তাঁকে আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে আলোচনায় আনে। পরে ক্রিস ব্রাউনের সঙ্গে ‘ওভারডোজ’ গানেও কাজ করেন। ফ্রেঞ্চ মন্টানা, স্টিভ আওকি ও জুসি জের মতো শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
২০১৯ সালে পান আইহার্ট রেডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসের সোশ্যাল স্টার স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এটি তাঁর উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতিগুলোর একটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আগনেজের প্রভাব কম নয়। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৩ কোটির বেশি।

১৫ বছর পর আবার অভিনয়ে
এত কিছু করার পরও অভিনয়ের জায়গাটা যেন কোথাও একটা অসম্পূর্ণ ছিল। প্রায় ১৫ বছর অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন আগনেজ। তাই ‘রিচার’ তাঁর কাছে নিছক আরেকটি কাজ ছিল না; ছিল নিজের পুরোনো পরিচয়ে ফিরে যাওয়ার পরীক্ষা।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আগনেজ বলেছেন, ‘রিচার’-এর জন্য অডিশন দেওয়ার সময় তিনি চেয়েছিলেন, নিজের নাম বা সংগীত ক্যারিয়ারের কারণে যেন কাজটি না পান। তিনি সত্যিই যোগ্য কি না, সেটি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন।
আগনেজ বলেন, ‘রিচার’ তাঁর কাছে বিশেষ; কারণ, চরিত্রটি তিনি অর্জন করেছেন। প্রায় ১৫ বছর পর অভিনয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়াই ছিল বড় পদক্ষেপ। আর এরপর সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম অডিশন।

অডিশনের পর ছিল কলব্যাক ও কেমিস্ট্রি টেস্ট। সবকিছু পেরিয়ে যখন চরিত্রটি পান, তখন বিষয়টি তাঁর কাছে শুধু একটি অভিনয়ের সুযোগ ছিল না। বরং মনে হয়েছিল, নতুন অধ্যায়ের জন্য এটাই সঠিক শুরু।

আগনেজ মো। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘লিলা’ কেমন চরিত্র?
‘রিচার’–এর চতুর্থ মৌসুমে আগনেজের চরিত্র লিলা হথ। গল্পে তার মা আমিশা হথকে সঙ্গে নিয়ে ফিলাডেলফিয়ায় আসে। সে জানায়, তার লিউকেমিয়া হয়েছে এবং তার বাবা কংগ্রেসম্যান জন স্যাম্পসনের সন্ধান করছে। কারণ তার কাছ থেকে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু লিলার গল্প যত এগোয়, ততই সেটি জ্যাক রিচারের তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

লিলার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি গায়িকা আংগুন। ফলে একই মৌসুমে দুই আন্তর্জাতিক সংগীত তারকাকে অভিনয়ে দেখা গেছে।

লিলা সম্পর্কে আগনেজের নিজের ব্যাখ্যাও বেশ আকর্ষণীয়। তাঁর ভাষায়, লিলা এমন একজন মানুষ, যার ভেতরে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। বুদ্ধিমান, দৃঢ় এবং আবেগের দিক থেকে বহুস্তরীয়। তাঁর সবচেয়ে ভালো লেগেছে চরিত্রটির একমাত্রিক না হওয়া। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সে একজন স্বাভাবিক মানুষ।
অভিনেত্রীর কাছে এমন চরিত্রই আকর্ষণীয়, যে চরিত্রকে পুরোপুরি ভালো বা খারাপ বলে এক কথায় বিচার করা যায় না।

‘রিচার ৪’–এর পোস্টার। আইএমডিবি

গান ও অভিনয়—দুটি কি আলাদা
আগনেজের উত্তর, খুব একটা নয়। তিনি ছোটবেলা থেকেই অভিনয় করেছেন। তাঁর মতে, অভিনয়ই তাঁকে আরও ভালো গীতিকার ও গল্প বলিয়ে হতে সাহায্য করেছে। কারণ, অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের আবেগ, মনস্তত্ত্ব ও চরিত্রকে গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন

আগনেজের কাছে গান ও অভিনয়—দুটিই মূলত গল্প বলার মাধ্যম। গানে একজন শিল্পী শুধু কথা গেয়ে যান না, শ্রোতাকে কোনো অনুভূতির ভেতর নিয়ে যান। অভিনয়েও একই ব্যাপার। তাঁর মতে, দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘আবেগের সততা’। দর্শক বুঝতে পারেন, একজন শিল্পীর অনুভূতি সত্যি কি না।
এ দর্শনই হয়তো তাঁকে ১৫ বছর পর অভিনয়ে ফিরেও স্বচ্ছন্দ থাকতে সাহায্য করেছে।

‘রিচার’ বদলে দিতে পারে পরিচয়
আগনেজ মো ইন্দোনেশিয়ায় এতটাই পরিচিত যে তাঁর দেশের দর্শকদের কাছে ‘রিচার’ দিয়ে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় একটি দর্শকগোষ্ঠীর কাছে লিলা হথই হতে পারে আগনেজ মোকে চেনার প্রথম দরজা। আর সেই দরজা মোটেও ছোট নয়।

‘রিচার’ প্রাইম ভিডিওর অন্যতম সফল সিরিজ। তৃতীয় মৌসুমের প্রথম ১৯ দিনে বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি ৪৬ লাখ দর্শক সিরিজটি দেখেছিলেন। চতুর্থ মৌসুম প্রচারের আগেই পঞ্চম মৌসুমের অনুমোদনও দিয়েছে অ্যামাজন।
তাই এ সিরিজে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করা আগনেজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নতুন গতি আনতে পারে।

ইতিমধ্যে আগনেজের নাম ঘিরে আগ্রহও বেড়েছে। ‘রিচার’-এ অভিনয়ের পর আইএমডিবিতে একসময় ষষ্ঠ সর্বাধিক ট্রেন্ডিং তারকা হয়েছিলেন তিনি, যা তাঁর নিজের কাছেও ছিল বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।

আগনেজ মো।

সামনে আরও বড় প্রকল্প
‘রিচার’ দিয়েই অবশ্য থামছেন না আগনেজ। তাঁর আরেকটি আন্তর্জাতিক প্রকল্প ‘গ্রোভ টেলস’ নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পথটি এবার তাঁর সামনে আরও পরিষ্কার।

এমনকি ‘রিচার’-এর পর মার্ভেলের ‘এক্স–মেন’–এর চরিত্র সাইলকেও অভিনয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের এক ফ্যান-কাস্টিংয়ের জবাবে জানিয়েছেন, তিনি সেই ইচ্ছাটি ‘বিশ্বের কাছে ছুড়ে দিচ্ছেন’। অবশ্য তাঁকে ওই চরিত্রে নেওয়ার কোনো ঘোষণা এখনো হয়নি।

ভ্যারাইটি, আইএমডিবি ও দ্য জাকার্তা টাইমস অবলম্বনে