‘প্রেশার কুকার’ শহুরে নারীদের আর্তচিৎকারের সরব প্রতিচ্ছবি
কথাসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনা ও রায়হান রাফীর পরিচালনায় ‘প্রেশার কুকার’ একটি নারীবাদী সিনেমা, যেখানে চারজন নারীর নগরকেন্দ্রিক ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও মধ্যবিত্ত সমাজের কঠোর আর্থিক টানাপোড়েনের রূঢ় বাস্তবতার চিত্র অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটিতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নগরভিত্তিক কাঠামোর অন্ধকার বা অপ্রকাশিত দিকগুলোসহ নারীর প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর তীক্ষ্ণ সমালোচনা করা হয়েছে। হাইপারলিংক চলচ্চিত্রের স্টাইলকে ব্যবহার করে বহু বছর ধরে চলমান নারীর সংগ্রামশীলতাকে আধুনিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ভিন্ন চার নারী চরিত্রের লড়াকু চেতনাকে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এবার সিনেমার নামকরণের বিষয়ে আসা যাক। নারীকেন্দ্রিক সিনেমাটিতে দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে নারীদের প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হওয়া মানসিক ও সামাজিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক নগরজীবনের জটিলতা, সামাজিক, পারিবারিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ক্রমবর্ধমান চাপ বোঝাতেই ‘প্রেশার কুকার’ নামটি প্রতীকী অর্থে বেছে নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া বর্তমান সমাজের মানুষের বর্ধিষ্ণু উৎকণ্ঠা ও স্নায়বিক চাপের এক রূপক প্রতিফলন হিসেবে ‘প্রেশার কুকার’ নামকরণ করা হয়েছে। সার্বিকভাবে সিনেমার বিষয়বস্তু, চিত্রনাট্য, চরিত্র বিশ্লেষণ, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ‘প্রেশার কুকার’ নামকরণটি অত্যন্ত জুতসই ও অর্থবহ হয়েছে। এদিকে ‘প্রেশার কুকার’ নামটি আমাদের দেশে পুরোনো হলেও সুজয় করমপুরী ও সুশীল করমপুরীর যৌথ পরিচালনায় ২০২০ সালে ভারতের তেলেঙ্গানায় মুক্তি পাওয়া ‘প্রেশার কুকার’ নামের সিনেমায় একজন বাবা জোর করে তাঁর সন্তানকে বিদেশে পড়াশোনার জন্য চাপ দেওয়ার কাহিনিকে উপজীব্য করে চিত্রিত হয়েছে।
তেলেগু সিনেমাটি একটি পারিবারিক কমেডি ড্রামা, যা হাস্যরসের ছলে সমাজের ভুল ধারণাগুলোকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মেগা সিটি ঢাকা শহরের কঠোর বাস্তবতাকে রূপক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে ঢালিউডের এই সিরিয়াস থ্রিলার সিনেমায়। তবে গল্প ও চরিত্রের দিক থেকে সিনেমার নাম ‘প্রেশার কুকার’ রাখার ক্ষেত্রে পরিচালক রায়হান রাফী তেলেগু ভাষার ‘প্রেশার কুকার’ মুভি থেকে নিয়েছিলেন কি না, তা বলা মুশকিল। বস্তুত সিনেমার নামকরণের ক্ষেত্রে আমাদের পরিচালকদের মৌলিক নামের দিকে বিশেষ নজর দেওয়াসহ বিকল্প ভাবনার প্রয়াস রাখা উচিত।
এদিকে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় রায়হান রাফী স্ক্রিপ্টিং, নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার ঢঙে এক নতুন স্তরের পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। পুরো গল্পকেই মেটাফোরিক্যাল বা রূপকধর্মী হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যম ঢাকা শহরকে কেবল একটি লোকেশন হিসেবে নয়; বরং একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। শহরের ট্রাফিক–ব্যবস্থা, মানুষের ভিড়, ঘিঞ্জি লোকালয়, আধুনিক ঢাকার রূপান্তর, নাইট ক্লাব ও নাগরিক যান্ত্রিকতাকে এমনভাবে সংলাপ ও দৃশ্যে আনা হয়েছে, যা প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্ক্রিপ্টে নারীদের কেবল ‘অসহায়’ হিসেবে না দেখিয়ে চরিত্রগুলো নিজস্ব ভঙ্গিতে ধাপে ধাপে বিকশিত হতে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, রায়হান রাফীর সিনেমার সংলাপ সব সময়ই খুব ধারালো এবং বাস্তবসম্মত হয়, যা ‘প্রেশার কুকার’-এর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। ঢাকা শহরের মানুষের দৈনন্দিন কথ্য ভাষা, চরিত্রের ইমোশনাল গ্রাফ, নারীদের চাপা ক্ষোভ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ সংলাপে সতেজভাবে ফুটে উঠেছে।
এ সিনেমা শুধু একটি নারীবাদী গল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে; বরং এটি একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। নামকরণ, চিত্রনাট্য, চরিত্রবিন্যাস, ক্যামেরার সূক্ষ্ম ব্যবহার, ভাষার প্রয়োগ ও গল্পের গভীরতার দিক থেকেই চিত্রনাট্যটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মানুষের মনে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছে। অপর দিকে এ সিনেমায় এমন কিছু আনফিল্টারড শব্দ ও সংলাপ রয়েছে, যা ছোটদের জন্য উপযুক্ত নয়। যদিও নির্মাণপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক সিনেমাটি ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ ঘোষিত হলেও এখানে বেশ কিছু অশালীন শব্দ বা স্ল্যাং ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও গল্প ও চরিত্রের বাস্তবতা প্রমাণের ক্ষেত্রে যৌন লালসাপূর্ণ সংলাপের তীব্রতা বোঝাতে অনেক সিনেমায় ‘অ্যাডাল্ট ভাষা’র প্রয়োজন হয়।
তবে সুচিন্তিতভাবে এ সিনেমায় অ্যাডাল্ট শব্দ ব্যবহারে অশ্লীলতার সীমা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে হয়নি; কিন্তু কাহিনি ও চরিত্রের প্রয়োজনে অশালীন শব্দ ব্যবহারের চেয়েও কামলালসাপূর্ণ অনেক দৃশ্য খানিকটা দেখানো হয়েছে। যদিও হাল আমলের অধিকাংশ সিনেমায় নির্বিচার অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের আধিক্যের কারণে পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখা দুরূহ হয়ে পড়েছে। তবে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় ব্যবহৃত ডবল মিনিং শব্দ ব্যবহারে শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে বলে মনে হয়নি এবং চরিত্রের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার সেটুকুই করা হয়েছে। এ কারণে পরিচালকের মুনশিয়ানার প্রশংসা করতেই হয়।
অধিকন্তু ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমার চরিত্রগুলো দর্শকদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। কারণ, প্রতিটি চরিত্রই আমাদের সমাজের কোনো না কোনো স্তরের ব্যক্তির প্রতিচ্ছবিকে প্রতিনিধিত্ব করছে। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা রেশমা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমৃত্যু লড়ে গেছেন, যা নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তির মূর্ত প্রতীক। আর মিলার চরিত্রে অভিনয় করা বুবলীকে এখানে একজন উচ্চমধ্যবিত্ত সংসারী নারীর চরিত্রে দেখা যায় এবং সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে যিনি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। এদিকে স্নিগ্ধা চৌধুরী ও মারিয়া শান্ত মূলত আধুনিক শহরের তরুণী ও কর্মজীবী নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। করপোরেট জগৎ ও ব্যক্তিজীবনে এসব নারী যেসব সূক্ষ্ম বৈষম্য ও মানসিক হেনস্তার শিকার হন, তা এই দুটি চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, তরুণ প্রজন্মের নারী দর্শকেরা এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের জীবনের অনেক মিল খুঁজে পেতে পারেন।
বস্তুত, হাইপারলিংক থ্রিলার শ্রেণির মুভি হিসেবে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় অভিনয় করা শবনম বুবলী, নাজিফা তুষি, মারিয়া শান্ত এবং স্নিগ্ধা চৌধুরীর ভিন্ন চারটি আলাদা জীবন ও সংগ্রাম সমান্তরালভাবে চলতে থাকে। মূলত, হাইপারলিংক সিনেমায় সব চরিত্রকে একটি সাধারণ সুতায় বাঁধতে হয় এবং এই সিনেমায় সেই সুতাটি হলো ঢাকা শহর; আর পরিচালক এই ঢাকা শহরকে রূপক অর্থে একটি বিশালাকায় ‘প্রেশার কুকার’ হিসেবে দেখিয়েছেন। এদিকে এই রূপকটিই হাইপারলিংক গল্পের গভীরতা ও তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ রকম অনেক হাইপারলিংক সিনেমা ইতিমধ্যে বলিউড, হলিউড ও ঢালিউডে নির্মিত হয়েছে। অনুরূপভাবে বলিউডের প্রখ্যাত পরিচালক অনুরাগ বসুর ‘লাইফ ইন আ...মেট্রো’ সিনেমার অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে মুম্বাই শহরের বিভিন্ন মানুষের জীবনের নাগরিক জটিলতা, বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক, দেহসর্বস্ব ভালোবাসা ও সম্পর্কের জটিল টানাপোড়েন সাবলীলভাবে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া, ‘মেট্রো’ মুভিতে মানুষের বিবাহ–বহির্ভূত সম্পর্ক দেখানো হয়েছে; আর ‘প্রেশার কুকার’-এ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষের নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক চাপে মানুষের মানবিকতা বদলে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। অপর দিকে, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব শহীদুল ইসলাম খোকনের পরিচালনায় এবং হুমায়ূন ফরীদির প্রযোজনায় ‘পালাবি কোথায়’ সিনেমা বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম প্রধান নারীকেন্দ্রিক কমেডি সিনেমা, যেখানে ভিন্ন তিনজন নারীর কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।
তা ছাড়া, অনুরাগ বসুর আরেকটি হাইপারলিংক ডার্ক কমেডি ও ক্রাইম থ্রিলার ‘লুডো’ সিনেমায় লাল, নীল, সবুজ, হলুদ—চারটি ভিন্ন রঙের মতো চারটি আলাদা গল্প উঠে এসেছে। অনুরূপভাবে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায়ও চারজন নারীর (বুবলী, তুষি, শান্ত ও স্নিগ্ধা) চারটি আলাদা জীবন সমান্তরালভাবে দেখানো হয়েছে। একইভাবে প্রখ্যাত ভারতীয় পরিচালক সাতরাম রামানির হাইপারলিংক শ্রেণির ‘ডাবল এক্সএল’ সিনেমাটিও দুজন স্থূলকায় তরুণীর বডি শেমিং এবং শরীরের গড়ন নিয়ে সমাজের ট্যাবু ভাঙার গল্প তৈরি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশে নির্মিত হাইপারলিংক সিনেমাগুলোর মধ্যে রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমাটির চিত্রনাট্য, সংগীত, সংলাপ, থিম ও ক্যামেরার উপস্থাপনাসহ সব দিক থেকে আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে, যা বাংলা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক উত্তরণে নবদিগন্ত উন্মোচন করেছে।
উপরন্তু এ সিনেমায় গান ও নেপথ্য সংগীত কেবল বিনোদনের জন্য নয়; বরং গল্পের মানসিক চাপ ও থ্রিলার আমেজ ফুটিয়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রেশার কুকারের বাষ্পের শব্দ, ধাতব ঘর্ষণ, আলু সেদ্ধ করার আওয়াজ এবং পানির টগবগানির শব্দগুলোকে নেপথ্য মিউজিকের সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা দর্শকদের মনে একধরনের দমবন্ধ করা অস্বস্তি তৈরি করে। ঢাকা শহরের একাকিত্ব, মানসিক বিচ্ছিন্নতা, ক্ষোভ ও শহুরে যান্ত্রিকতা নিয়ে কিছু বিরহী, মেলোডিয়াস গান ও আবহসংগীত রয়েছে, যা দর্শকদের ‘লাইফ ইন আ... মেট্রো’ সিনেমার আমেজ মনে করিয়ে দেয়। তা ছাড়া ‘মদিনাতে যাই...’ গানটি গভীরভাবে মানুষের মনে স্পর্শ করেছে। সার্বিকভাবে, ‘প্রেশার কুকার’-এর গান ও নেপথ্য সংগীত ভীষণ উত্তর-আধুনিক, আরবান ও সাইকোলজিক্যাল; যা দর্শকদের পঞ্চইন্দ্রিয়কে দারুণভাবে আলোড়িত করতে পেরেছে।
এদিকে ডার্ক আরবান সিনেমা হিসেবে ‘প্রেশার কুকার’ জনগণকে সচেতন করতে বর্তমান শহুরে জীবনের নানান অসংগতি সুপরিকল্পিতভাবে তুলে আনা হয়েছে। নারীর প্রতি অধিকতর সহনশীল হতে পারিবারিক সহিংসতা, নারীর প্রতি দৈহিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা, জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, নারীদের অন্ধকার জগতের পরিণতি, শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা, একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নৈতিক অবক্ষয় ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার ইত্যাদি নেতিবাচক সামাজিক অসংগতি এ সিনেমায় সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া পার্লার বা স্পা সেন্টারের আড়ালে দেহ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া নারীদের জীবনের গুমোট পরিস্থিতি ও এর নিষ্ঠুর পরিণতি পরিচালক অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বড় পর্দায় তুলে এনেছেন। এ সিনেমায় স্পা সেন্টারে কর্মরত ‘স্পা গার্ল’–এর জীবনকে অত্যন্ত রূঢ় এবং বাস্তবসম্মতভাবে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি এই চরিত্রগুলোর মাধ্যমে ঢাকা শহরের অন্ধকার গলির আড়ালে থাকা অবদমিত কান্না ও সামাজিক শোষণের চিত্র উঠে এসেছে। স্পা গার্ল চরিত্রগুলোর সাজসজ্জায় একদিকে যেমন গ্ল্যামার ও মেকআপের আধিক্য থাকে, অন্যদিকে তাদের চোখের ক্লান্তিতে দীর্ঘদিনের অনিদ্রা ও মানসিক হাহাকার ফুটে উঠেছে। উপরন্তু, এই স্পা গার্লদের বাহ্যিক চাকচিক্য বনাম অভ্যন্তরীণ ক্ষত বিষয়টি সিনেমার গভীরতা ও সার্থকতা বহু গুণ বাড়িয়েছে। এদিকে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় সবচেয়ে নিষ্ঠুর চিত্র উঠে এসেছে অসৎ পুলিশ বাহিনীর ঘুষ, দুর্নীতি ও চারিত্রিক অধঃপতনের দিকগুলো সচেতনভাবে চিত্রিত করার মাধ্যমে। ভিকটিমদের উদ্ধারে তথাকথিত অভিযানে বিচার–বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারের নামে কয়েক বছর ধরে চলা পুলিশের একটি অংশ অপকর্মগুলোকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বড় পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা ঢালিউডের কোনো সিনেমায় আগে এমনভাবে খোলামেলাভাবে দেখানো হয়নি।
এদিকে রায়হান রাফী এ সিনেমায় সচেতনভাবে পোশাক, সাজসজ্জা ও কস্টিউম ডিজাইনকে কেবল চরিত্র ফুটিয়ে তোলার মাধ্যম হিসেবে নয়; বরং গল্পের গভীরতা ও চরিত্রের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন। এ সিনেমায় ব্যবহৃত সাধারণ কুর্তি বা সালোয়ার-কামিজ ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত মেয়েদের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামের চিরচেনা রূপ। এদিকে সিনেমার অনেক দৃশ্যে অভিনেত্রীদের মেকআপ ব্যতীত খুব সাধারণ পোশাকে দেখানো হয়েছে, যা দৃশ্যগুলোকে নেহায়েত বাস্তব হিসেবে লেগেছে। কিছু দৃশ্যে স্পা গার্লদের চোখের নিচের ডার্ক সার্কেল ও অবিন্যস্ত চুল, সামগ্রিক গেটআপের মাধ্যমে নারীদের দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তি ও অভ্যন্তরীণ প্রেশারের বিষয়টি অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি, তাঁদের কস্টিউমে আধুনিক শহুরে ও বোল্ড স্টাইলের ছোঁয়া দেখা গেছে, যা তাঁদের চরিত্রের রহস্যময়তা ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। স্পা গার্লদের পোশাকের রং এবং প্যাটার্নগুলো মূলত ডার্ক বা ড্রামাটিক টোনের রাখা হয়েছে, যাতে চরিত্রগুলোকে একদম ন্যাচারাল লাগে। তা ছাড়া, চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিনেত্রীদের পোশাকে নানান রঙের ব্যবহার করা হয়েছে। এদিকে বাস্তবসম্মতভাবে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতাবোধ, মানসিক যন্ত্রণা, বিষণ্ণতা ক্যামেরায় প্রকাশের জন্য লাল, ধূসর, নীল ও ফ্যাকাশে রঙের পোশাকের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমাটি এর সাহসী নির্মাণ ও ভিন্নধর্মী গল্পের জন্য প্রশংসিত হলেও, সিনেমারই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। এই সিনেমায় কিছু দৃশ্যে অতিরিক্ত স্ল্যাং বা অশ্লীল ভাষার ব্যবহার, পুলিশের একপেশে নেতিবাচক চিত্রায়ণ, গুমোট ও অন্ধকারাচ্ছন্ন কালার গ্রেডিং ও সেট ডিজাইন, অসম্পূর্ণ বা ধীরগতির ক্লাইম্যাক্স, অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অতৃপ্তিকর সমাপ্তি, অযথা অনেক দৃশ্যে দীর্ঘ করা ইত্যাদি সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক উপগল্পের প্লটগুলোকে মাঝেমধে৵ বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে এবং দৃশ্যগুলোকে এক সুতায় গাঁথার জন্য একটি সুসংহত শৈল্পিক বিন্যাসের কিছুটা ঘাটতি আছে বৈকি। বেশ কয়েকটি দৃশ্য অকারণে টেনে দীর্ঘ করা হয়েছে; যা অনেক দর্শকের কাছে বিরক্তিকর লেগেছে। তা ছাড়া স্পা গার্ল চরিত্রে অভিনয় করা নাজিফা তুষির কিছু দৃশ্যকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ‘কুরুচিপূর্ণ’ বলে মনে হয়েছে। এ ছাড়া নিরপরাধ শান্ত হত্যা পর রাকাকে পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হিসেবে দেখানো হলে এটি কতিপয় অসৎ পুলিশের অপকর্মের বিরুদ্ধে সাহসী একটি উদ্যোগ হতো। তবে এটা সত্যি যে এসব দুর্বল দিকগুলো বাদ দিলে ‘প্রেশার কুকার’ বাংলাদেশের সিনেমা–শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তদুপরি রায়হান রাফী এই সিনেমাকে পরান, সুড়ঙ্গ, তুফান, তাণ্ডব ও প্রেশার কুকার—এই পাঁচটি মূল থিমে বিভক্ত করে চিত্রনাট্যটি নির্মাণ করেছেন। ‘পরান’ সিনেমার ব্যর্থ প্রেম আর প্রতারণা; ‘সুড়ঙ্গ’–এর অর্থলোভ ও বিশ্বাসঘাতকতা; ‘তুফান’–এর ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের লড়াই; ‘তাণ্ডব’ সিনেমার অন্ধকার জগৎ, অপরাধ, সহিংসতা ও প্রতিশোধ এবং সর্বোপরি ‘প্রেশার কুকার’ অংশে নারীদের সংগ্রামী জীবনকে কেন্দ্র করে এ সিনেমাকে বিন্যাস্ত করা হয়েছে। এই প্রথম ঢালিউডের কোন পরিচালকের সিনেমার মূল থিমগুলো নিয়ে কোন চলচ্চিত্র নির্মিত হলো, যা সত্যি অভিনব ও অনুকরণীয়।
এ ছাড়া ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় অভিনেত্রী হিসেবে শবনম বুবলী, নাজিফা তুষি, মারিয়া শান্ত এবং স্নিগ্ধা চৌধুরী তাঁদের অভিনয়ের সেরাটা এখানে সঁপে দিয়েছেন। অনবদ্য অভিনয়শৈলী, ভয়, রহস্য, মায়া, নান্দনিক ভঙ্গি ও আবেগের গভীরতা দিয়ে নাজিফা তুষি ইতিমধ্যে বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি অনন্য উচ্চতায় স্থান করে নিয়েছে। তুষির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চাহনি, বাচনভঙ্গি, রাগ–অনুরাগ, আতঙ্ক, ভয়, মায়া, অস্থিরতা, ছটফটে ভাব ও একাকিত্ব সমকালীন নারীকেন্দ্রিক সিনেমার নায়িকাদের দারুণভাবে পেছনে ফেলে দিয়েছে। তুষির মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, স্পা গার্লের অভিনয়, স্পা গার্ল চরিত্রের ভেতরে থাকা অবদমিত মাতৃত্ববোধের চরম অনুভূতি বাস্তবিক অর্থেই মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো হয়েছে। তুষির অভিনীত ‘আইস্ক্রীম’, ‘হাওয়া’, ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’সহ অন্যান্য সিনেমায় তাঁর উত্তরোত্তর অভিনয়শৈলীর পরিপক্বতা লাভ করছে। আর তুষির চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ও চরিত্রের মধ্যে একদম ঢুকে যাওয়ার সক্ষমতা হলো এই পরিপক্বতার পেছনে সবচেয়ে প্রধান। তবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে ‘হাওয়া’ সিনেমার পর এটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়।
তা ছাড়া নির্মাণশৈলীর দিক থেকে রায়হান রাফীর অন্যান্য বাণিজ্যিক ও ব্লকবাস্টার সিনেমার তুলনায় ‘প্রেশার কুকার’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো সিনেমা। বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণের গণ্ডির বাইরে গিয়ে তিনি এমন একটি সামাজিক সিনেমা নির্মাণে সাহস দেখিয়েছে, সেটি সত্যিই প্রশংসনীয়। বাণিজ্যিক সিনেমার তথাকথিত ‘হিরো’ সংস্কৃতি ভেঙে তিনি এই সিনেমাকে সম্পূর্ণ নারীপ্রধান হিসেবে নির্মাণ করেছেন। গল্পে প্রধান চারটি নারী চরিত্রকে প্রাধান্য দিয়ে বড় একটি ঝুঁকি নিয়েছেন, যা মূলধারার বাণিজ্যিক পরিচালকদের পক্ষে এমন সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া বেশ কঠিন।
গল্পের বৈচিত্র৵ ও অভিনব নির্মাণশৈলীর দিক বিবেচনায় ‘পোড়ামন-২’, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’, ‘দহন’, ‘পরান’, ‘দামাল’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘তুফান’, ‘তাণ্ডব’ থেকে শুরু করে ‘প্রেশার কুকার’ পর্যন্ত প্রতিটি সিনেমায় পরিচালক হিসেবে অনবদ্য দক্ষতা ও পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। বাণিজ্যিক ভাবধারার আবহ পেছনে রেখে ভিন্ন রকমের সিনেমা নির্মাণে অন্য সমসাময়িক নির্মাতাদের থেকে রাফী বরাবরই আলাদা। ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় আমরা এবার অন্য রকম অভিজ্ঞ, প্রখর দূরদর্শী ও পরিণত একজন রায়হান রাফীকে খুঁজে পেলাম। তিনি একই সঙ্গে রোমান্টিক থ্রিলার (পরান), ডার্ক ক্রাইম ড্রামা (সুড়ঙ্গ), হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশন (তুফান) আর এবারের নারীপ্রধান ডার্ক আরবান সিনেমা (প্রেশার কুকার) বানিয়ে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছেন।
পরিশেষে রোমান্টিক ও । অ্যাকশনধর্মী সিনেমার জৌলুশ থেকে বেরিয়ে এসে মনস্তাত্ত্বিক ডার্ক গল্পের এই নিরীক্ষা ঢালিউডকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল। মেগা সিটির ঢাকা শহরকে যেভাবে তিনি ‘প্রেশার কুকার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, তা প্রতিটি দর্শকের কাছেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে উন্নত নির্মাণশৈলী আর কারিগরি উৎকর্ষের এক অনন্য নিদর্শন এই সিনেমা। এই সিনেমা কেবল বিনোদন নয়; বরং আমাদের সমাজের অবদমিত নারীসত্তার এক নিঃশব্দ আর্তচিৎকার। এদিকে ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রমুখী দর্শকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশ পূরণে প্রতিনিয়ত ব্যতিক্রমী সিনেমা উপহারের চাপে রায়হান রাফীদের ভবিষ্যতেও সত্যিকার অর্থেই প্রেশার কুকারের মধ্যেই পড়তে হবে।
শেখ হাফিজুর রহমান সজল, উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়