আট সিনেমার পাঁচটিই হয়নি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘রিমেম্বারিং মনসুন রেভোল্যুশন’ কার্যক্রমের আওতায় আটটি সিনেমা তৈরির কথা ছিল। তার মধ্যে মাত্র তিনটি জমা পড়েছে, বাকি পাঁচটি নির্মাণই হয়নি। খোঁজখবর করলেন মকফুল হোসেন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনকে পর্দায় তুলে ধরতে গত বছরের ৭ জানুয়ারি আটটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘রিমেম্বারিং মনসুন রেভোল্যুশন’ কার্যক্রমের আওতায় ছবিগুলো নির্মাণের দায়িত্ব পান আট নির্মাতা। দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেন—অনম বিশ্বাস, হুমায়রা বিলকিস, নুহাশ হুমায়ূন, শঙ্খ দাশগুপ্ত, শাহীন দিল–রিয়াজ, রবিউল আলম রবি, তাসমিয়াহ্ আফরিন মৌ ও মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আট বিভাগীয় শহরে নির্মাণে আগ্রহী তরুণদের নিয়ে কর্মশালা করাবেন এই আট নির্মাতা। কর্মশালা থেকে নির্বাচিত তরুণদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে একটি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন নির্মাতা। গত জুলাইয়ে এসব চলচ্চিত্র মুক্তিরও কথা ছিল। তবে কোনোটিই মুক্তি দিতে পারেনি বিগত সরকার।
গত জুলাইয়ে এসব চলচ্চিত্র মুক্তিরও কথা ছিল। তবে কোনোটিই মুক্তি দিতে পারেনি বিগত সরকার।
তিনটি কাজ হয়েছে
সরকারি অর্থায়নে ছবিগুলো নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আটটির মধ্যে শেষ পর্যন্ত তিনটি সিনেমায় অর্থায়ন করেছে সরকার।
শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক দীপক কুমার গোস্বামী প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা তিনটি চলচ্চিত্র পেয়েছেন। এগুলো হলো রবিউল আলম রবির ‘কিল মি লাইক আ ডগ’, হুমায়রা বিলকিসের ‘গুম গল্প নয়’ আর শাহীন দিল-রিয়াজের ‘মুখোমুখি’।
রবিউল আলম রবির ‘কিল মি লাইক আ ডগ’, হুমায়রা বিলকিসের ‘গুম গল্প নয়’ ও শাহীন দিল-রিয়াজের ‘মুখোমুখি’ জমা পড়েছে।
‘কিল মি লাইক আ ডগ’ সিনেমায় ফ্রানৎস কাফকার উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’-কে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন রবিউল আলম রবি। এতে মীর নওফেল আশরাফীসহ অনেকে অভিনয় করেছেন। নির্মাণ শেষ করে জানুয়ারিতে এটি শিল্পকলা একাডেমিতে জমা দেন তিনি।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ‘গুম গল্প নয়’ তৈরি করেছেন হুমায়রা বিলকিস। প্রামাণ্যচিত্রটি জানুয়ারির শেষভাগে জমা দেন তিনি।
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শাহীন দিল-রিয়াজ নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র ‘মুখোমুখি’, এটি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জমা পড়েছে।
শাহীন দিল-রিয়াজ প্রথম আলোকে জানান, এতে জুলাই আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শীদের পার্সপেক্টিভ (দৃষ্টিভঙ্গি) তুলে ধরা হয়েছে। দৃশ্যধারণের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের ফুটেজও ব্যবহার করা হয়েছে।
পাঁচটি নির্মাণই হয়নি
বাকি পাঁচটি চলচ্চিত্র আলোর মুখ দেখেনি। শুটিং শুরুর আগেই প্রতিটি চলচ্চিত্রের বাজেটের ৫০ শতাংশ অর্থ সরকারকে দেওয়ার কথা ছিল। তবে পাঁচটি চলচ্চিত্রকে সেই অর্থ দেওয়া হয়নি।
অভ্যুত্থান নিয়ে ‘কতটা গুলি থাকলে তবে মানুষ মরে যায়’–এর চিত্রনাট্য জমা দেন শঙ্খ দাশগুপ্ত। সেই চিত্রনাট্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও পেয়েছে। তবে আট মাসেও অর্থ না পাওয়ায় সিনেমার কাজ শুরু করতে পারেনি বলে জানান নির্মাতা।
অনম বিশ্বাসও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে গল্প ভেবেছিলেন। নাম চূড়ান্ত না হওয়া সেই চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে খেটে খাওয়া মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে গল্প লিখেছিলেন।
অনম বিশ্বাস বলেন, ‘গল্প জমা দিয়েছি, তবে ফান্ড পাইনি। ফলে সিনেমাটির কাজ শুরু করতে পারিনি।’
গল্প জমা দিয়েছি, তবে ফান্ড পাইনি। ফলে সিনেমাটির কাজ শুরু করতে পারিনি।অনম বিশ্বাস, নির্মাতা
গ্রামের এক পুকুর চুরির গল্প নিয়ে চিত্রনাট্য লিখে জমা দেন মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে কোনো অর্থ পাননি তিনি।
মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, প্রথম ইনস্টলমেন্টের (৫০ শতাংশ) অর্থ পেলে সিনেমাটির কাজ শুরু করতেন। না পাওয়ায় কাজটা আর করা হয়নি।
তাওকীর বললেন, মাস চারেক ধরে পরিশ্রম করে গল্পটি লিখেছিলেন। সহলেখকসহ অনেকের শ্রম ছিল। তবে গল্পটা কোনো কাজে লাগল না।
পরিচালকের তালিকায় নুহাশ হুমায়ূনের নাম থাকলেও তিনি পরিচালনায় নিজেকে যুক্ত করতে চাননি। নুহাশ হুমায়ূন প্রথম আলোকে জানান, আগেই তিনি বলে রেখেছিলেন, কোনো সিনেমা পরিকল্পনা করবেন না। শুধু কর্মশালার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মাতা আরিফুর রহমানের একটি প্রামাণ্যচিত্রে তাঁর যুক্ত থাকার কথা ছিল। প্রামাণ্যচিত্রের সারসংক্ষেপ জমা দিলেও কাজটা আর হয়নি। এটি নির্মিত হলে তিনি সুপারভাইজ করতেন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পাঁচটি ঝুলে আছে। এসব চলচ্চিত্র না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আরেক নির্মাতা তাসমিয়াহ্ আফরিন মৌ জুলাই নিয়ে ‘লাল’ নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য জমা দেন। তবে অর্থ না পাওয়ায় তিনিও কাজটি শুরু করতে পারেননি।
‘রিমেম্বারিং মনসুন রেভোল্যুশন’–এর সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের সাবেক উপপরিচালক জসীমউদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা দুই দফায় আটটি চিত্রনাট্য সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কারিগরি কমিটিকে পাঠিয়েছেন।
আটটির মধ্যে পাঁচটির কাজ কেন হলো না?—জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারিগরি কমিটির এক সদস্য জানান, আটটি চিত্রনাট্যেরই অনুমোদন দিয়েছেন তাঁরা। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পাঁচটি ঝুলে আছে। এসব চলচ্চিত্র না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁর কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই।
সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গেও যোগাযোগ করে প্রথম আলো। বক্তব্য জানতে চাইলে সুনির্দিষ্টভাবে আট সিনেমা নিয়ে তাঁর কাছ থেকে উত্তর মেলেনি।
প্রতিটি চলচ্চিত্রের জন্য ৪০ লাখ টাকা বাজেট ধরেছে সরকার। শুটিং শুরুর আগে নিয়ম অনুযায়ী তিন নির্মাতাকে ২০ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র জমা দেওয়ার পর বাকি অর্থ প্রদানের কথা রয়েছে।
সামনে কী
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিল্পকলা একাডেমির এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, প্রতিটি চলচ্চিত্রের জন্য ৪০ লাখ টাকা বাজেট ধরেছে সরকার। শুটিং শুরুর আগে নিয়ম অনুযায়ী তিন নির্মাতাকে ২০ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র জমা দেওয়ার পর বাকি অর্থ প্রদানের কথা রয়েছে। পাশাপাশি এসব চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার কথাও রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের যাবতীয় কাজের তালিকা চেয়েছি। এর মধ্যে এই (সিনেমা) বিষয়টিও রয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর আমরা করণীয় নির্ধারণ করব।আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের সহকারী পরিচালক (প্রোগ্রাম প্রডাকশন, সিনেমাটোগ্রাফি) ইকরামুল ইসলাম জানান, মন্ত্রণালয়ের কারিগরি কমিটি সিনেমাগুলো দেখে মতামত জানাবে। কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা কাজ করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সঙ্গেও কথা বলেছে প্রথম আলো।
গত রোববার তিনি বলেন, ‘মাত্র কয়েক দিন আগে আমরা বসেছি। মন্ত্রণালয়ের যাবতীয় কাজের তালিকা চেয়েছি। এর মধ্যে এই (সিনেমা) বিষয়টিও রয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর আমরা করণীয় নির্ধারণ করব।’