নাটক বাতিল, জাসাসকে হল বরাদ্দ—বিতর্কের মুখে শিল্পকলার সিদ্ধান্ত বদল
নাট্যদল তাড়ুয়ার ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ নাটকের প্রদর্শনীর জন্য হল বরাদ্দ বাতিল করে হলটি বিএনপির কালচারাল উইং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থাকে (জাসাস) বরাদ্দ দিয়েছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। পরে সেটিও বাতিল করা হয়।
২২,২৩ ও ২৪ এপ্রিল তাড়ুয়াকে জাতীয় নাট্যশালার মূল হল বরাদ্দ দেয় শিল্পকলা একাডেমি। এর মধ্যে ২০ এপ্রিল শিল্পকলা একাডেমি জানিয়েছে, অনিবার্য কারণে ২৩ এপ্রিলের হল বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমির একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, তাড়ুয়ার নাটকের হল বরাদ্দ বাতিল করে সেই দিন হলটিতে জাসাসের একটি অনুষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছিল শিল্পকলা একাডেমি।
হল বরাদ্দ বাতিলের পরদিন আজ মঙ্গলবার বিকেলে শিল্পকলা একাডেমি জানিয়েছে, ২৩ এপ্রিল নাট্যশালার মূল হলে জাসাসের অনুষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে, ফলে এদিন তাড়ুয়া বাতিল হওয়া শোটি করতে পারবে।
হল বরাদ্দ ফিরে পাওয়ার বিষয়ে অবহিত করা হলে তাড়ুয়ার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বাকার বকুল বলছেন, হল বরাদ্দ বাতিলের পর গতকাল সোমবার রাত থেকেই ২৩ এপ্রিলের টিকিটের অর্থ ফেরত দিচ্ছেন তারা। আজও অর্থ ফেরত দিচ্ছেন। ফলে ২৩ এপ্রিলের শো করতে পারছেন না তারা।
তবে ২৪ এপ্রিলের পূর্বনির্ধারিত দুটি শো হবে।
তাড়ুয়ার নাটকের হল বরাদ্দ বাতিল করে সেই দিন হলটিতে জাসাসের একটি অনুষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছিল শিল্পকলা একাডেমি।
তাড়ুয়াকে বাদ দিয়ে জাসাসকে হল দিয়েছিল শিল্পকলা
শিল্পকলা একাডেমিতে হল বরাদ্দ পেতে এক মাস আগে আবেদন করতে হয়। এপ্রিল মাসে হল বরাদ্দ পেতে মার্চ মাসের ৭ তারিখের মধ্যে আবেদন করতে হয়। পরে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেয় শিল্পকলার হল বরাদ্দ কমিটি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করে এপ্রিলে হল বরাদ্দ পেয়েছিল তাড়ুয়া।
এর মধ্যে ৯ এপ্রিল শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়ে ২৩ এপ্রিল হল বরাদ্দ চেয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা। এদিন জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে জাসাসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লোকমান হোসেন ফকিরের স্মরণ অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিল জাসাস।
জাসাসের সদস্য মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘লোকমান হোসেন ফকিরের স্মরণ অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের জন্য আগামী ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হল জাসাসের অনুকূলে বিনা ভাড়ায় বরাদ্দের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।’
৯ এপ্রিল শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়ে ২৩ এপ্রিল হল বরাদ্দ চেয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা।
শিল্পকলা একাডেমির একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় জাসাসকে তড়িঘড়ি করে ২৩ এপ্রিল হল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর জন্য পূর্বনির্ধারিত তাড়ুয়ার নাটকের হল বরাদ্দ বাতিল করা হয়।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাটকপাড়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। নাট্যকর্মী ও দর্শকের কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তকে অস্বচ্ছ ও অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করে। সমালোচনার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত জাসাসকে বাদ দিয়ে তাড়ুয়াকেই ২৩ এপ্রিলের শো করার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
আজ বিকেলে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন প্রথম আলোকে জানান, ২৩ এপ্রিল নাট্যশালায় মূল হলে আয়োজনটি না করার জন্য জাসাসকে রাজি করিয়েছেন তিনি। তারা আয়োজনটি করছে না। সেদিন নাটকের শো হবে।
বাতিলের ব্যাপারে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। হল বরাদ্দ বাতিল করার আগে কিংবা কী কারণে করতে হচ্ছে, আমরা কিছুই জানি না।তপন হাফিজ, হল বরাদ্দ কমিটির সদস্য
অন্ধকারে ছিল বরাদ্দ কমিটি
তাড়ুয়ার হল বরাদ্দ বাতিল নিয়ে অন্ধকারে ছিল শিল্পকলা একাডেমির হল বরাদ্দ কমিটি। হল বরাদ্দ কমিটিতে থাকা বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা মহানগর) তপন হাফিজ আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাতিলের ব্যাপারে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। হল বরাদ্দ বাতিল করার আগে কিংবা কী কারণে করতে হচ্ছে, আমরা কিছুই জানি না।’
হল বরাদ্দ কমিটিকে অন্ধকারে রেখে তাড়ুয়ার হল বরাদ্দ বাতিল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। বিষয়টি নিয়ে তপন হাফিজ বলেন, ‘বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতাবলে মহাপরিচালক যে কারও হল বরাদ্দ বাতিল করতে পারেন। সেটি শিল্পকলা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন হতে পারে। তবে বিশেষ প্রয়োজনটা তো চিঠিতে উল্লেখ করেনি শিল্পকলা।’
জাসাসকে হল বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি শিল্পকলার হল বরাদ্দ কমিটি জানে না। শিল্পকলার সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ ক্ষমতাবলে মহাপরিচালক জাসাসকে ২৩ এপ্রিল হল বরাদ্দ দিয়েছেন। হল বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়টি জাসাসও প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছিল।
শিল্পকলাকে চিঠি
এর আগে হল বরাদ্দ বাতিলের ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে আজ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনকে চিঠি পাঠিয়েছে তাড়ুয়া।
চিঠিতে বলা হয়, ‘২৩ এপ্রিলের প্রদর্শনীর জন্য অনেক দর্শক পূর্বেই অনলাইন ও অফলাইন থেকে টিকিট সংগ্রহ করেছেন। ফলে এ সিদ্ধান্তে আমাদের আর্থিক ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি দর্শকদের সঙ্গে আমাদের বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্কও ক্ষুণ্ন হয়েছে।’