‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। এই অর্জনের অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাই।
মোহাম্মদ লিখন: যখন ঘোষণা করা হলো, চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কুষ্টিয়ার মোহাম্মদ লিখন—আমি স্পিচলেস হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল—সত্যি আমি চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, নাকি স্বপ্ন দেখছি। সেই মুহূর্তেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। আল্লাহর রহমত ছাড়া এ সাফল্য কখনোই সম্ভব ছিল না।
প্রথম আলো :
সারা দেশের অসংখ্য প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে সেরা তিনে স্থান করে নিয়েছিলেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কি আত্মবিশ্বাস ছিল—আপনিই চ্যাম্পিয়ন হবেন?
মোহাম্মদ লিখন: নির্বাচিত সেরা ৬০ অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে আয়োজিত সিলেকশন রাউন্ড শেষে ‘সেরা ১০’–এ জায়গা পেয়েই খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম। তাই প্রতিনিয়তই নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। আর ‘টপ থ্রি’তে সিলেক্ট হওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস এবং আল্লাহর ওপর ভরসা আরও বেড়ে গেল। যেহেতু ফাইনালে এসেছি, চেষ্টা করলে চ্যাম্পিয়নও হতে পারব—এ আত্মবিশ্বাসই আমার শীর্ষস্থান অর্জনে ভূমিকা রেখেছে।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগে এবং পরের লিখনের মধ্যে কী কী পরিবর্তন লক্ষ করছেন? আশপাশের মানুষ আপনার এ অর্জনকে কীভাবে দেখছে?
মোহাম্মদ লিখন: আগে আমি ছিলাম একজন সাধারণ মানুষ—লিখন। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে সবাই আমাকে ‘শেফ লিখন’ হিসেবে চিনতে শুরু করেছে। আমার এলাকার মানুষ এবং আত্মীয়স্বজনেরা এই অর্জনে খুব আনন্দিত। তারা আমাকে নিয়ে গর্ব করছে। পাশাপাশি যেন দেশের জন্যও কিছু করতে পারি—আমার ওপর তাদের এ প্রত্যাশা বেড়েছে।
প্রথম আলো :
কোন ভাবনা থেকে এবং কীভাবে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন?
মোহাম্মদ লিখন: আমি ছোটবেলা থেকেই রান্না করতে ভালোবাসি। রান্নার প্রতি সব সময় আগ্রহ কাজ করে। যখন ‘স্টার শিপ ফিউশন কিচেন’–এর পর্বগুলোতে দর্শকদের রেসিপি পাঠানোর আহ্বান জানানো হলো, আমার বন্ধু দিনার আমাকে অংশ নিতে বলল। নিজস্ব ভাবনার ফিউশন রেসিপি পাঠালাম। তারপর প্রথম আলোর মাধ্যমে জানতে পারি, এ প্রতিযোগিতার সিলেকশন রাউন্ডের জন্য আমি নির্বাচিত হয়েছি।
প্রথম আলো :
একজন ভালো কুক আর একজন ফিউশন শেফ—দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য কোথায়? নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলেন।
মোহাম্মদ লিখন: এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে খুব কাছ থেকে দেখলাম, একজন দক্ষ কুক সব ধরনের দেশি-বিদেশি খাবার চমৎকারভাবে রান্না ও পরিবেশন করতে পারেন। আর একজন ফিউশন শেফ জানেন, কীভাবে দেশি খাবারকে বিদেশি স্টাইলে সাজিয়ে তোলা যায় কিংবা বিদেশি কোনো ডিশে দেশি স্বাদ ফুটিয়ে তুলে তা উপস্থাপন করা যায়। সহজ কথায়, একজন খাবার তৈরি করেন নিখুঁতভাবে, অন্যজন উদ্ভাবন করেন নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে।
প্রথম আলো :
প্রতিযোগিতা চলাকালীন এমন কোনো মুহূর্ত কি ছিল, যখন সত্যিই মনে হয়েছে—এবার হয়তো আর এগোনো হবে না। সেই পরিস্থিতি কীভাবে সামলেছেন?
মোহাম্মদ লিখন: প্রতিযোগিতার প্রতিটি পর্বই ছিল খুব চ্যালেঞ্জিং। এর মধ্যে একদিন আমি ‘ডেঞ্জার জোনে’ চলে যাই। আমার মতো ডেঞ্জার জোনে থাকা সবাইকে আরও একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়। তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যা–ই হোক, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। এরপর যে ডিশটা তৈরি করি, সেটি বিচারকেরা অনেক পছন্দ করেন এবং আমি পরবর্তী রাউন্ডের জন্য সিলেক্ট হই।
ফিউশন রান্নার মূল চ্যালেঞ্জ দুটি ভিন্ন স্বাদের ভারসাম্য রক্ষা করা। ট্র্যাডিশনাল বাংলাদেশি খাবারের সঙ্গে গ্লোবাল ফিউশনের এই বৈচিত্র্যময় আইডিয়াগুলো আপনি কীভাবে তৈরি করতেন?
মোহাম্মদ লিখন: আমি মূলত হোম কুক থেকেই উঠে এসেছি। স্টার শিপ ফিউশন শেফ প্রতিযোগিতায় সিলেক্ট হওয়ার পর থেকেই ফিউশন নিয়ে গবেষণা শুরু করি। গুগলে সার্চ করে বিভিন্ন দেশের কুইজিন নিয়ে পড়েছি। আমার তৈরি করা খাবার কীভাবে পরিবেশন করব—তার উপাদান সিলেক্ট করার মতো সূক্ষ্ম বিষয় নোট করে রাখতাম। এভাবেই ফিউশন নিয়ে আমার আইডিয়ার দ্বার খুলে যায়।
প্রথম আলো :
চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আপনি ২৫ লাখ টাকার পাশাপাশি পেয়েছেন ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে তিন মাসের ইন্টার্নশিপের সুযোগ। এটিকে নিজের ক্যারিয়ারে কীভাবে কাজে লাগাতে চান?
মোহাম্মদ লিখন: টাকাটা অবশ্যই আমি আমার ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করব। আর ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে যে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েছি, সেখান থেকে চেষ্টা করব খুঁটিনাটি নানা বিষয় শেখার। পরবর্তী সময়ে এটিকে পুঁজি করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।
প্রথম আলো :
আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান পেশা সম্পর্কে জানতে চাই।
মোহাম্মদ লিখন: আমার জন্ম কুষ্টিয়া জেলার লাহিনি গ্রামে। বেড়ে ওঠা আর লেখাপড়া কুষ্টিয়া জেলাতেই। বর্তমানে আমি আমার ভাইয়ের বিজনেসের সঙ্গে যুক্ত। এখন ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে ইন্টার্নশিপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।
আপনার এই সাফল্যের যাত্রায় পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা কেমন ছিল?
মোহাম্মদ লিখন: আগেই বলেছি, ছোটবেলা থেকে রান্নার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে ২০১৫ সাল থেকে সেই আগ্রহ বাড়তে থাকে। তখন আমার বাবা অসুস্থ ছিলেন। বাবাকে নিয়ে মা হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে যেতেন। আমি বাড়িতে থাকতাম। বাবার জন্য বিশেষ কিছু খাবার রান্না করতাম। এভাবেই রান্নার প্রতি একধরনের ভালো লাগা ও ভালোবাসা বাড়তে থাকে।
প্রথম আলো :
ফিউশন রান্না নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা স্বপ্ন কী? বাংলাদেশের কোন ঐতিহ্যবাহী খাবারটিকে আপনি আগামী দিনে নতুনভাবে ফিউশন করতে চান?
মোহাম্মদ লিখন: আমার মূল লক্ষ্য, দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোকে ফিউশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের রূপ দিয়ে বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। ভবিষ্যতে নিজের একটি ফিউশন রেস্তোরাঁ দেওয়ার স্বপ্ন দেখি, যেখানে আমার নিজস্ব উদ্ভাবনী রেসিপির ফিউশন খাবারগুলো মানুষকে খাওয়াতে পারব।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারকে ফিউশনরূপে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ কেমন ভূমিকা রাখছে বলে আপনি মনে করেন?
মোহাম্মদ লিখন: স্টার শিপ ফিউশন শেফের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কারণ, এটি এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে খাবারকে কীভাবে ফিউশন করে তৈরি করা যায়—সেটা আমাদের শেখানো হয়েছে। বিভিন্ন রন্ধনশৈলী সম্পর্কে আমাদের চিন্তার দুয়ার উন্মোচন করা হয়েছে। আমি ভাগ্যবান এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে।
প্রথম আলো :
আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ লিখন: আপনাকেও ধন্যবাদ।