বিতর্ক মাথায় নিয়েই শীর্ষে
বছরের সবচেয়ে বিতর্কিত ছবির তকমাটা সাধারণত কোনো রাজনৈতিক থ্রিলার বা নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে বানানো হরর সিনেমার ঝুলিতে যায়। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই জায়গা নিয়ে নিয়েছে উনিশ শতকের এক ক্ল্যাসিক উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ—‘ওয়েদারিং হাইটস’। গত শুক্রবার ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এটি মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির আগে থেকেই সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক। অনেকে বলছেন, এটি বছরের সবচেয়ে বিভাজন তৈরি করা ছবি। তবে সব বিতর্ক পাশে সরিয়ে রেখে প্রথম দিনেই ১১ মিলিয়ন ডলার আয় করে বক্স অফিসের শীর্ষে উঠে গেছে ‘ওয়েদারিং হাইটস’।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি ‘প্রমিজিং ইয়ং ওম্যান’ ও ‘সল্টবার্ন’ পরিচালক এমেরাল্ড ফেনেল যখন জানান ‘ওয়েদারিং হাইটস’ সিনেমা বানাচ্ছেন, তখন থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। ফেনেলের আগের ছবিগুলো নিয়ে একদল সমালোচকের আগে থেকেই তীব্র আপত্তি ছিল—তিনি নাকি গুরুতর বিষয় (যেমন যৌন নিপীড়ন, শ্রেণি সংঘাত) নিয়ে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছু হয়ে যায় বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রদর্শনী। তাই অনেকের আশঙ্কা ছিল, এমিলি ব্রন্টির ক্ল্যাসিক উপন্যাসটির ক্ষেত্রেও তিনি মূল আবেগ ও সাহিত্যিক গভীরতা নষ্ট করে ফেলবেন। তাই অভিনয়শিল্পী নির্বাচন থেকে শুরু করে পোশাক, উচ্চারণ, এমনকি ছবির ভিজ্যুয়াল স্টাইল—সবকিছু নিয়েই চলে সমালোচনা।
বিতর্ক আরও তীব্র হয়, যখন ঘোষণা আসে—মার্গো রবি অভিনয় করবেন ক্যাথি আর্নশ চরিত্রে, আর জ্যাকব এলর্ডি হবেন হিথক্লিফ। উপন্যাসে ক্যাথি ও হিথক্লিফের প্রেমের সময় তাঁরা ছিলেন কিশোর বয়সী। সেখানে রবি ও এলর্ডি যথাক্রমে ৩৫ ও ২৮ বছর বয়সী। অনেকেই এটিকে চরিত্রের বয়স ও আবেগের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন।
আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয় হিথক্লিফ চরিত্রকে ঘিরে। উপন্যাসে তাকে ‘ডার্ক-স্কিনড’ আর বহিরাগত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন, চরিত্রটির বিশেষত্ব বোঝাতেই তার গায়ের রং গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে ২০১১ সালে নির্মিত ‘ওয়েদারিং হাইটস’-এ হিথক্লিফ ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা জেমস হাউসন। সেই জায়গায় জ্যাকব এলর্ডিকে নেওয়াটাকে অনেকেই ‘হোয়াইটওয়াশিং’ হিসেবে দেখছেন।
ছবির ট্রেলার মুক্তির পর বিতর্ক আরও বেড়ে যায়। সেখানে দেখা যায়—অতিরিক্ত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য, চার্লি এক্সসিএক্সের আধুনিক পপ মিউজিক। ১৮০০ সালের গল্পে ১৯৮০-এর দশকের মতো দেখতে বিয়ের গাউন। এমন ভিজ্যুয়াল স্টাইল, অনেকের চোখে যা ঝলমলে রিমিক্সের মতো। সমালোচকদের অভিযোগ—ফেনেল মূল উপন্যাসের আবেগ আর গথিক গাম্ভীর্য বাদ দিয়ে এটিকে বানিয়ে তুলেছেন একধরনের গ্ল্যামারাস, শক-ভ্যালুনির্ভর সিনেমা।
অনেক দর্শক ও সমালোচক মনে করেন, ফেনেলের দৃষ্টিভঙ্গি আভিজাত্যকেন্দ্রিক। সে কারণে এই ক্ল্যাসিক উপন্যাসের আবেগপ্রবণ, জটিল গল্প তাঁর হাতে কতটা ন্যায্যতা পাবে, তা নিয়ে অনেকে সন্দিহান। উপন্যাসটিকে ঘিরে ভক্তদের আবেগও জড়িয়ে আছে। এটি শুধু একটি উপন্যাস নয়, অনেক পাঠকের কাছে এটি তাঁদের কৈশোর, প্রেমের ধারণা ও আবেগের অংশ। বহু মানুষ এই বইকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখেন।
মজার বিষয় হলো, এই তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভই হয়তো ছবিটির সবচেয়ে বড় প্রচারণা হয়ে উঠেছে। ফেনেল নিজেও স্বীকার করেছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি ‘ওয়েদারিং হাইটস’-এর প্রতি ভীষণ আবেগপ্রবণ। এমনকি অন্য কেউ এ ছবি বানালে তিনি ক্ষুব্ধ হতেন!
দেখা যাক, এমন প্রবল বিতর্ক মাথায় নিয়ে সিনেমাটি বক্স অফিসে আর কত দূর যায়।
বিবিসি অবলম্বনে