অড্রে হয়ে ওঠেন আধুনিক নারীর নতুন সংজ্ঞা

অড্রে হেপবার্ন। ছবি: আইএমডিবি

আজ অড্রে হেপবার্নের প্রয়াণ দিবস। হলিউডের স্বর্ণযুগের এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী শুধু রুপালি পর্দার আইকনই নন, মানবিকতা, সৌন্দর্য আর সংবেদনশীলতার এক অনন্য প্রতীক। ১৯৯৩ সালের এই দিনে সুইজারল্যান্ডে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু তিন দশক পেরিয়ে গেলেও অড্রে হেপবার্ন এখনো সমসাময়িক। এখনো তিনি বহু তারকার অনুপ্রেরণা।      

১৯২৯ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে জন্ম অড্রের। শৈশব কেটেছে যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি অধিকৃত নেদারল্যান্ডসে অনাহার, ভয় ও অনিশ্চয়তা তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখিয়েছিল মানুষের কষ্ট। পরবর্তী জীবনে তাঁর মানবিক কাজের পেছনে এই অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা ছিল। কোনো কোনো গল্পেও সেসব চিত্র উঠে এসেছে, যা ছিল তাঁর কাছ থেকে দেখা।

রংচঙে ভালেন্তিনো লুক স্মরণীয় অড্রে হেপবার্ন

ছোট চরিত্র দিয়ে যাত্রা  
অভিনয়ে অড্রের যাত্রা শুরু হয় ছোট চরিত্র দিয়ে। প্রথম তিনি ১৯৪৯ সালে টেলিভিশন সিনেমায় নাম লেখান। পরে ১৯৫৩ সালে ‘রোমান হলিডে’ সিনেমায় রাজকুমারী অ্যান চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি হলিউড ছাড়িয়ে বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে তারকা হয়ে ওঠেন। এই সিনেমার জন্যই মাত্র ২৪ বছর বয়সে জিতে নেন অস্কার। এরপর সাবরিনা, ফ্যানি ফেস, ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানি’স, মাই ফেয়ার লেডিস সিনেমাগুলো তাঁকে স্থায়ীভাবে দর্শকদের মনে জায়গা করে দেয়। একটির পর একটি সিনেমায় অড্রে হয়ে ওঠেন আধুনিক নারীর নতুন সংজ্ঞা।  

অড্রের সৌন্দর্য ছিল ভিন্ন রকম। প্রচলিত গ্ল্যামারের বাইরে তাঁর ছিল সরলতা, স্বাভাবিকতা ও গভীর অভিব্যক্তি, যা আলাদা করে দর্শকদের নজর কাড়ে। এ ছাড়া ফ্যাশনের জগতেও তিনি বিপ্লব এনেছিলেন। বিভিন্ন সময় সিনেমায় তাঁকে দেখা গেছে বৈচিত্র্যপূর্ণ সব চরিত্রে। কখনো কালো গাউন, কখনো ছোট চুল, বড় চোখ—সব মিলিয়ে অড্রে হেপবার্ন হয়ে ওঠেন স্টাইল আইকন।

রোমান হলিডে ছবিতে গ্রেগরি পেক ও অড্রে হেপবার্ন
ছবি: আইএমডিবি

ক্যারিয়ারের টানাপোড়েন
ক্যারিয়ারের শীর্ষে থেকেও অড্রে ধীরে ধীরে একসময় অভিনয় থেকে দূরে সরে যান। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনের অর্থ খোঁজার তাগিদ তাঁকে ভিন্ন এক পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যায়। সামাজিক কাজের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল। আশির দশক থেকে তিনি যুক্ত হন ইউনিসেফের সঙ্গে। যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের জন্য কাজ করতে গিয়ে আবারও ফিরে যান নিজের শৈশবের স্মৃতিতে। বাংলাদেশে এসেও শিশুদের সে কথা বলেছিলেন তিনি।

আলোর ঝলকানি থেকে দূরে
সেলিব্রিটি মানেই তাঁকে হতে হবে সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। হতে হবে আলোচনার মধ্যমণি। তিনি যেখানে, স্পটলাইটও সেখানে। ভক্ত ও পরিষদ দিয়ে ঘেরা। কিন্তু অড্রে হেপবার্ন ছিলেন ব্যতিক্রম। একা থাকতে ভালোবাসতেন। ‘অন্তর্মুখী’ হওয়ার দুর্নামও লাগিয়েছেন গায়ে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমাকে প্রায়ই একা থাকতে হবে। আমি খুব খুশি হব, যদি শনিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বাসায় একা থাকি। এভাবেই আমি উজ্জীবিত হই।’

আরও পড়ুন
অড্রে হেপবার্ন
ছবি: আইএমডিবি

তাঁর নামে তিন ফুল ও এক রাস্তা
তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাঁর নামে রয়েছে তিনটি ফুল এ এক রাস্তার নাম। টিউলিপ, লিলি ও গোলাপের নামকরণ হয় অড্রে হেপবার্নের নামে। তাঁর নামে ১৯৫৯ সালে হলিউডের খুব কাছে লাস ভেগাসে একটি রাস্তার নাম রাখা হয়। তখন পর্যন্ত কোনো অভিনেত্রীর নামে রাস্তার নামকরণ এই প্রথম।

হেপবার্নের স্বীকৃতি
অড্রে হেপবার্ন সেই সৌভাগ্যবান তালিকার একজন, যিনি একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সম্মানজনক চারটি পুরস্কার-এ্যামি, গ্র্যামি, অস্কার ও টনি জিতেছেন। ‘রোমান হলিডে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য অস্কার পেয়েছিলেন অড্রে। ‘গার্ডেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড উইথ অড্রে হেপবার্ন’ টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য পেয়েছিলেন এ্যামি পুরস্কার। ‘অড্রে হেপবার্ন এনচ্যানটেড টেলস’ অ্যালবামে শিশুদের জন্য গল্প বলেছিলেন অড্রে, এটি দিয়েই পেলেন গ্র্যামি পুরস্কার। ফরাসি নাটক ‘অনজিনা’তে অভিনয় করে পেয়েছেন টনি পুরস্কার। এই অভিনেত্রীর জন্ম ১৯২৯ সালের ৪ মে, ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি মারা যান।

অড্রে হেপবার্ন ১৯৮৯ সালের বাংলাদেশ সফরে এসে মিশে গিয়েছিলেন এ দেশের বাচ্চাদের সঙ্গে। এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন তাঁর আশপাশের সবাইকে
ছবি: ইউনিসেফের ফেসবুক পেজ থেকে