অস্কারে রেকর্ড ১৬ মনোনয়ন, কী আছে এই সিনেমায়

‘সিনার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

চলতি বছর অস্কারে ২৪ বিভাগের মধ্যে রেকর্ড ১৬ মনোনয়ন পেয়ে চমকে দিয়েছে রায়ান কুগলারের সিনেমা ‘সিনার্স’। গত বছর মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি মুগ্ধ করেছে দর্শক–সমালোচকদের। কী আছে এই সিনেমায়? কেনই–বা অস্কারের ৯৭ বছরের রেকর্ড ভেঙে এতগুলো মনোনয়ন পেল ‘সিনার্স’।

২০২৫ সালে যে সিনেমাটি নাকি হলিউডকেই ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারত—শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠল বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র।
ভ্যাম্পায়ার ঘরানার এই হরর সিনেমার পটভূমি জিম ক্রো যুগের দক্ষিণ আমেরিকা। অভিনয়শিল্পীদের বড় অংশই কৃষ্ণাঙ্গ। আবার পুরো ছবি শুট করা হয়েছে আইম্যাক্স ৭০ এমএম ফরম্যাটে। মার্ভেলের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে খ্যাতি পাওয়া পরিচালক রায়ান কুগলার এই সিনেমার মাধ্যমে এমন এক ঝুঁকি নিয়েছিলেন, যাকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল সংশয়।

হলিউডের প্রভাবশালী মহলের ধারণা ছিল, মাত্র দুই মাসে লেখা একটি চিত্রনাট্য নিয়ে এত বড় বাজেটের ছবি বানাতে গিয়ে কুগলার নিজের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছেন। প্রায় ১০ কোটি ডলার বাজেটের এই সিনেমায় বিনিয়োগ করায় ওয়ার্নার ব্রাদার্সকেও অনেকে ‘পাগল’ বলেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, কুগলারকে ছবির ফাইনাল কাটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া ও ২৫ বছর পর ছবিটির সম্পূর্ণ স্বত্ব তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তিকে অনেকেই স্টুডিও ব্যবস্থার জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত মনে করেছিলেন। এমনকি কেউ কেউ বলেছিলেন, এই ছবি বানানোই হতে পারে স্টুডিও সিস্টেমের শেষ অধ্যায়। কিন্তু ‘সিনার্স’ সেই সংশয়কে পাত্তাই দেয়নি।

‘সিনার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

ইস্টার উইকএন্ডে মুক্তি, বক্স অফিসে রেকর্ড
ইস্টার উইকএন্ডে (২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল) প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে ‘সিনার্স’ যেন নিজের মতো করে এক অলৌকিক পুনর্জন্ম ঘটায়। খুব দ্রুতই ছবিটি বিশ্বজুড়ে ৩৬৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে ফেলে। এর মধ্য দিয়ে এটি হয়ে ওঠে গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল মৌলিক (অরিজিনাল) সিনেমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দশম সর্বোচ্চ আয় করা আর-রেটেড চলচ্চিত্র। মজার ব্যাপার হলো—এই তালিকায় ‘টার্মিনেটর ২’ কিংবা ‘হ্যাংওভারস’-এর মতো ছবিকেও পেছনে ফেলেছে ‘সিনার্স’।

যে সময় কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি আবারও রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, সেই সময় ‘সিনার্স’ নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস, সংস্কৃতি মুছে ফেলা এবং বিনোদন শিল্পের রাজনীতি। অনলাইনে জুক-জয়েন্টের দৃশ্য নিয়ে বানানো মিম যেমন ভাইরাল হয়েছে, তেমনি সমালোচনামূলক লেখাগুলোও বিশ্লেষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংগীত ইতিহাসে এসব জায়গার অবমূল্যায়িত অবদান।

গবেষণা, শিকড় আর লোককথার গভীরতায় ‘সিনার্স’-এর চিত্রনাট্য লিখতে সময় লেগেছে মাত্র দুই মাস। কিন্তু এর পেছনে ছিল বহু বছরের গবেষণা। মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা, দাসপ্রথা-পরবর্তী সংস্কৃতি, ব্লুজ সংগীতের ইতিহাস—সবকিছুরই ছাপ রয়েছে ছবিটিতে। কুগলারের প্রয়াত মামা ছোটবেলায় তাঁকে তাঁর রেকর্ড সংগ্রহের মাধ্যমে ব্লুজ সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই শুরু।

কুগলার ১৯৩০-এর দশকের আলোকচিত্র, নেটিভ আমেরিকান মিথ এবং দক্ষিণ আমেরিকায় বসবাসকারী চীনা অভিবাসীদের ইতিহাস নিয়েও গভীরভাবে কাজ করেন—যাঁরা প্রায়ই এই অঞ্চলের ইতিহাসে উপেক্ষিত। সিনেমায় মুদি দোকানদার দম্পতির চরিত্রে অভিনয় করা মালয়েশীয় অভিনেতা ইয়াও এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা খুব খুশি ছিলাম, কারণ এখানে এশীয় চরিত্রগুলোকে স্টেরিওটাইপিক উচ্চারণ ছাড়াই ইংরেজিতে কথা বলতে দেখানো হয়েছে।’

‘সিনার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

অভিনয়, নকশা ও আবহ—সবকিছুর নিখুঁত সমন্বয়
বরাবরের মতোই কুগলার ইতিহাসের ভার ও ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে ছবির ভেতরে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন, যাতে মূল গল্পের গতি ব্যাহত না হয়। কস্টিউম ডিজাইনার রুথ ই. কার্টার, সেট ডেকোরেটর মনিক শ্যাম্পেন ও প্রযোজক হিসেবে কুগলারের স্ত্রী জিনজি—সবাই মিলে ছবিটির জগৎ নির্মাণে বড় ভূমিকা রেখেছেন।
হেইলি স্টেইনফেল্ড ‘মেরি’ চরিত্রে অভিনয় করে চমকে দিয়েছেন। চরিত্রটি এতটাই গভীর ছিল যে এই অভিনয়ের গবেষণার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জাতিগত শেকড় সম্পর্কেও নতুন কিছু জানতে পারেন।

ডেলরয় লিন্ডো ‘ডেল্টা স্লিম’ চরিত্রে অভিনয় করে অতীতের সঙ্গে একধরনের অনুসন্ধানী সংযোগ তৈরি করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই ছবি এমন সব ইতিহাস উন্মোচন করে, যেগুলো এতদিন হয় মুছে ফেলা হয়েছিল, নয়তো গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছিল।
প্রচলিত সৌন্দর্য ধারণাকে ভেঙে দেওয়া উনমি মোসাকুর উপস্থিতি হলিউডের প্রচলিত ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়—যে ধারণা অনুযায়ী, আকর্ষণীয় নারীপ্রধান চরিত্র মানেই হবে তরুণ, ছিপছিপে ও ফরসা। গাঢ় ত্বকের, পরিণত বয়সী এই অভিনেত্রী প্রমাণ করেছেন, আকর্ষণ একমাত্রিক নয়।

আর মাইকেল বি. জর্ডান? তিনি যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন।
যদিও মাইকেলের ক্যারিয়ার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ, ‘সিনার্স’ ছিল রায়ান কুগলারের সঙ্গে তাঁর তৃতীয় কাজ। তবু এই ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে—স্মোকস্ট্যাক যমজ ভাই—অভিনয় করে তিনি নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। শরীরী ভাষা ও কণ্ঠের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে দুই ভাইকে আলাদা করে তুলেছেন।

গিটারবাদক মাইলস ক্যাটন বলেন, ‘মাইকেল যেভাবে দুই চরিত্রকে আলাদা করে গড়ে তুলেছিলেন, তাতে দুজনের সঙ্গেই আলাদা সম্পর্ক তৈরি করা আমার জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল।’

সিনেমা হলে হোক বা স্ট্রিমিং—আলোচনার কেন্দ্রে ‘সিনার্স’ প্রেক্ষাগৃহে দেখুন বা পরে এইচবিও ম্যাক্সে—‘সিনার্স’ মানুষকে কথা বলিয়েছে। সময়কে ব্যাখ্যা করেছে, আবেগ ছুঁয়েছে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কৌতূহল জাগিয়েছে—যদিও কুগলার এটিকে একক ছবি বলেই দাবি করেছেন।

মুক্তির সময় যত প্রশ্ন ও সন্দেহের মুখে পড়েছিলেন কুগলার, ছবিটির সাফল্যের পর সেই সমালোচকেরাই এখন জানতে চাইছেন—এরপর কী?

কুগলার এক খোলা চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমি সিনেমায় বিশ্বাস করি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করি। এটা সমাজের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাকে এবং এই শিল্পে বিশ্বাস রাখা আরও অনেককে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে।’

যেহেতু ‘সিনার্স’ পূর্বপরিচিত গল্পের ওপর ভর করে বানানো হয়নি, দর্শকেরা জানেন—দ্বিতীয়বার দেখলে নতুন কিছু আবিষ্কার করা যাবে।

‘সিনার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। ‘ক্রিড’ ও ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’–এর মতো ছবির নির্মাতা রায়ান কুগলার বরাবরই পরিচিত হলিউড ঘরানাগুলোকে (স্পোর্টস ড্রামা, সুপারহিরো ব্লকবাস্টার) নিজের স্বতন্ত্র অথচ দর্শকবান্ধব ভঙ্গিতে নতুন করে উপস্থাপন করতে পটু। তবে সিনার্স–এ তিনি আগের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন।

মাইকেল বি. জর্ডান এখানে যমজ ভাই স্মোক ও স্ট্যাকের ভূমিকায়—যাঁরা তাঁদের জুক জয়েন্টকে ভ্যাম্পায়ারদের হাত থেকে রক্ষা করেন। একদিকে এটি হরর সিনেমা, অন্যদিকে ব্লুজ সংগীতনির্ভর মিউজিক্যাল, আবার একই সঙ্গে গ্যাংস্টার থ্রিলার ও ১৯৩০–এর দশকের মিসিসিপিকে কেন্দ্র করে নির্মিত গভীর গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক ড্রামা।

‘সিনার্স’ কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘরানার নিয়ম মেনে চলে না। এটি কোনো পরিচিত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির (আইপি) ওপরও ভিত্তি করে তৈরি নয়। ফলে দর্শকেরা হলে ঢুকেই জানেন না—গল্প কোন দিকে যাবে। উপরন্তু, সচেতনভাবে ধোঁয়াশা রাখা ট্রেলার দর্শকদের নিজে নিজে গল্প আবিষ্কার করার সুযোগ দিয়েছে, যা আজকের দিনে প্রায় বিলাসিতাই বলা যায়।

আরও পড়ুন

ব্যক্তিগত গল্প বলার স্বাধীনতা
এই অপ্রচলিত বৈশিষ্ট্য আসলে কুগলারের নির্মাণস্বাধীনতারই প্রতিফলন। তাঁর আগের সব ছবিই ছিল কোনো না কোনো বিদ্যমান গল্পের রূপান্তর। কিন্তু ‘দ্য আটলান্টিক’–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুগলার বলেন, সিনার্স–এর ক্ষেত্রে তিনি আইপিকে ‘আড়াল হিসেবে’ ব্যবহার করতে চাননি।

কুগলার বানাতে চেয়েছিলেন তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত ছবি—মিসিসিপির এক প্রয়াত মামার প্রতি একধরনের ‘ভালোবাসার চিঠি’। আর সেটি করতে গিয়ে তাঁকে বানাতে হয়েছে এমন এক ছবি, যা প্রচলিত ছকের ধার ধারে না।

এই কারণেই হয়তো অনেক দর্শক ইতিমধ্যে সিনার্স একাধিকবার দেখতে হলে ফিরছেন। যেহেতু এটি কোনো ছাঁচে ঢালা, আইপি-নির্ভর সিনেমা নয়, দর্শকেরা জানেন—দ্বিতীয়বার দেখলে নতুন কিছু ধরা পড়বে। আর সেটি করতে গিয়েও তাঁরা আনন্দই পাবেন।

অস্কারে ১৬ মনোনয়ন পেয়েছে সিনেমাটি, কতগুলো পুরস্কার পাবে সেটা সময়ই বলে দেবে। দেখে না থাকলে, এইচবিও ম্যাক্সে দেখে নিতে পারেন ‘সিনার্স’।

দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি অবলম্বনে