নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করে বারবার বিতর্কে, কে এই সিডনি

সিডনি সুইনি। এএফপি

গত বছর ‘ক্রিস্টি’ সিনেমায় সিডনি সুইনি অভিনয় করেছিলেন বক্সারের চরিত্রে। তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে বটে, কিন্তু সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যর্থ। সিনেমাটিতে সিডনি সুইনিকে গ্ল্যামারাস চরিত্রে দেখা যায়নি, ছিল না ঘনিষ্ঠ দৃশ্যও। এর কিছুদিন পরই মুক্তি পায় ‘দ্য হাউসমেইড’। এ সিনেমায় যথারীতি সিডনির অন্তরঙ্গ ও নগ্ন দৃশ্য আছে; ছবি হিট। এরপর চলতি বছর এসেছে এইচবিওর বহুল চর্চিত সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’। এ সিরিজের নগ্ন দৃশ্য নিয়ে হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। কিন্তু সিরিজটি যথারীতি হিট। গত ৩১ মে মুক্তি পাওয়া শেষ পর্বটি মাত্র সাত দিনে ভিউ হয়েছে ৮.৭ মিলিয়ন! কিন্তু বারবার নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করে আলোচনায় থাকা কে এই সিডনি সুইনি?

আলোচনায় নগ্ন দৃশ্য
পর্দায় নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে সিডনি সুইনির পরিচিতি এইচবিওর দুই আলোচিত সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’ ও ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’ দিয়ে। এ দুই সিরিজে, বিশেষ করে ‘ইউফোরিয়া’য় সুইনির নগ্ন দৃশ্য নিয়ে বিস্তর চর্চা হয়েছে।

তবে ডেডলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২৭ বছর বয়সী এই অভিনেত্রী জানিয়েছেন, যত আলোচনা-সমালোচনাই হোক, নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় বন্ধ করবেন না তিনি। ‘ইউফোরিয়া’ সিরিজের স্রষ্টা স্যাম লেভিনসন। সুইনি সাক্ষাৎকারে বলেন, এই নির্মাতার কাজ তাঁর খুবই পছন্দের। তাই তিনি যে চিত্রনাট্যে যা রাখবেন, সে অনুযায়ী অভিনয় করতে তাঁর আপত্তি নেই।

১৯৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের স্পোকেন শহরে জন্ম সিডনি সুইনির। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। পরিবারের সবাই প্রথমে এটিকে গুরুত্ব দেননি। কিংবদন্তির মতো শোনালেও সত্যি, মাত্র ১২ বছর বয়সে অভিনয় শেখার অনুমতি পাওয়ার জন্য তিনি নিজের পরিবারের সামনে একটি পাঁচ বছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। সেখানে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে অভিনয়কে তিনি পেশা হিসেবে নিতে চান। শেষ পর্যন্ত পরিবার রাজি হয়। এরপর শুরু হয় অডিশনের পর অডিশন। হলিউডে সাফল্য তাঁর কাছে সহজে আসেনি। কিশোর বয়সে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন অসংখ্য টেলিভিশন সিরিজে। বড় সুযোগ আসে ২০১৮ সালে। প্রথমে তিনি অভিনয় করেন ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এ। এরপর ‘শার্প অবজেক্ট’-এ অভিনয় করে সমালোচকদের নজরে আসেন। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ‘ইউফোরিয়া’। এই সিরিজে ক্যাসি হাওয়ার্ড চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন সিডনি সুইনি।

পর্দায় নগ্ন দৃশ্য নিয়ে সমালোচনা প্রসঙ্গে সিডনি বলেন, ‘এটা তো অদ্ভুত একটা কথা। আমি একজন অভিনয়শিল্পী, যাকে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়।’ ক্রাইম ড্রামা ঘরানার সিনেমা ‘রিয়েলিটি’তে একেবারে গ্ল্যামারহীন চরিত্রে অভিনয় করেন সুইনি। এ ছবিতে কোনো অন্তরঙ্গ দৃশ্যও নেই। তবে সিডনি সুইনি জানেন, তিনি যত ভালোই অভিনয় করেন না কেন, মানুষ কেবল তাঁর শরীর নিয়েই কথা বলে। এ জন্য কৈশোর থেকেই চেষ্টা করেছেন এমন কিছু করতে, যাতে মানুষ তাঁর কাজ নিয়েই কেবল কথা বলে। তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলে যত বেশি সম্ভব খেলায় অংশ নিতাম, পড়াশোনায় মনোযোগ দিতাম, যাতে মানুষ ভাবতে না পারে যে আমি শরীরসর্বস্ব।’
সাক্ষাৎকারে সুইনি আরও বলেন, আলোচনা-সমালোচনা যা-ই হোক, চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি পর্দায় নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করা বন্ধ করবেন না।

‘দ্য হাউসমেইড’ সিনেমার প্রিমিয়ারে সিডনি সুইনি। এএফপি

‘ইউফোরিয়া’–বিতর্ক
‘ইউফোরিয়া’র নতুন মৌসুমে ক্যাসির (সিডনি সুইনি) চরিত্র নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। অনেক দর্শক মনে করছেন, তার উপস্থাপনাটি অতিরিক্ত যৌন আবেদনময় ও অবমাননাকর। ক্যাসির চরিত্র শুরু থেকেই একধরনের মানসিক শূন্যতা ও স্বীকৃতির চাহিদার মধ্যে আবদ্ধ। তার শৈশব, বিশেষ করে বাবার অনুপস্থিতি তাকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে সে সম্পর্কের মাধ্যমে নিজের মূল্য খুঁজতে চায়।
তৃতীয় মৌসুমে সে নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, প্রথম দর্শনে এমনটাই মনে হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে বন্ধু ম্যাডির (অ্যালেক্সা ডেমি) সঙ্গে কথোপকথনে স্পষ্ট হয়, তার এই যাত্রা আসলে আত্মপ্রতিষ্ঠার নয়; বরং স্বীকৃতির জন্য মরিয়া এক প্রচেষ্টা। এ জায়গাতেই সিরিজটি সমালোচিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কারণ, যেখানে এই গল্প যৌনকর্ম বা অনলাইন কনটেন্ট তৈরির ক্ষমতায়নের দিকটি তুলে ধরতে পারত, সেখানে তা বরং একধরনের নির্ভরশীলতা ও আত্ম–অবমূল্যায়নের গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘ইউফোরিয়া ৩’–তে সিডনি সুইনি
ছবি: এইচবিও

নগ্ন দৃশ্য বাদ দিতে চেয়েছিলেন নির্মাতা
গত ৩১ মে শেষ হয়েছে এইচবিওর আলোচিত সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’। এদিন প্রচারিত হয় সিরিজটির তৃতীয় ও শেষ মৌসুমের শেষ পর্ব। এবারের কিস্তি মুক্তির পর আগেরগুলোর মতোই আলোচিত হয়েছে, নগ্নতা ও যৌনতার উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। তবে নির্মাতা স্যাম লেভিনসন জানান, তিনি তৃতীয় মৌসুমে অভিনেত্রী সিডনি সুইনির চরিত্র ক্যাসিকে নিয়ে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এবার হয়তো চরিত্রটির কোনো নগ্ন দৃশ্য না রাখাই ভালো। কিন্তু সেই প্রস্তাব শুনে অবাক হয়ে যান সুইনি নিজেই। তাঁর সোজাসাপটা জবাব ছিল, ‘মজা করছেন নাকি?’

সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্মাতা স্যাম লেভিনসন এ তথ্য জানান। তিনি জানান, ক্যাসি চরিত্রটি দীর্ঘদিন ধরেই দর্শকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেক সময় চরিত্রটির অতিরিক্ত যৌনায়ন নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। তাই নতুন মৌসুমে তিনি ভিন্নভাবে বিষয়টি উপস্থাপনের কথা ভেবেছিলেন।
লেভিনসনের ভাষায়, ‘আমি প্রথমে ভাবছিলাম, হয়তো পুরো মৌসুমই এমনভাবে ধারণ করব, যেখানে কোনো নগ্নতা থাকবে না। কিছু দৃশ্য অন্যভাবে দেখানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।’

কিন্তু সিডনি সুইনি এ ধারণার সঙ্গে একমত হননি। লেভিনসন বলেন, ‘সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি সিরিয়াস? আমি তো একজন অনলিফ্যানসের (প্রাপ্তবয়স্কদের ওয়েবসাইট) মডেলের চরিত্রে অভিনয় করছি। আর আপনি বলছেন এসব বিষয় এড়িয়ে যাবেন?” তখন আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমার কথায় যুক্তি আছে।’

সিডনি সুইনি। রয়টার্স

সিডনি সম্পর্কে
১৯৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের স্পোকেন শহরে জন্ম সিডনি সুইনির। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। পরিবারের সবাই প্রথমে এটিকে গুরুত্ব দেননি। কিংবদন্তির মতো শোনালেও সত্যি, মাত্র ১২ বছর বয়সে অভিনয় শেখার অনুমতি পাওয়ার জন্য তিনি নিজের পরিবারের সামনে একটি পাঁচ বছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। সেখানে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে অভিনয়কে তিনি পেশা হিসেবে নিতে চান। শেষ পর্যন্ত পরিবার রাজি হয়। এরপর শুরু হয় অডিশনের পর অডিশন। হলিউডে সাফল্য তাঁর কাছে সহজে আসেনি। কিশোর বয়সে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন অসংখ্য টেলিভিশন সিরিজে। বড় সুযোগ আসে ২০১৮ সালে। প্রথমে তিনি অভিনয় করেন ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এ। এরপর ‘শার্প অবজেক্ট’-এ অভিনয় করে সমালোচকদের নজরে আসেন। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ‘ইউফোরিয়া’। এই সিরিজে ক্যাসি হাওয়ার্ড চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন সিডনি সুইনি।

আরও পড়ুন

কিশোরদের সম্পর্ক, মানসিক সংকট, প্রেম, যৌনতা ও আত্মপরিচয়ের জটিল গল্প নিয়ে নির্মিত সিরিজটি শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল। এতে অসংখ্য সাহসী দৃশ্য ছিল, যার মধ্যে সিডনি সুইনির বেশ কয়েকটি নগ্ন দৃশ্যও ছিল। অনেক দর্শক অভিযোগ করেন, সিরিজটিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নগ্নতা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে সিডনি সুইনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্যাসি চরিত্রটির মানসিক ভাঙন ও আত্মসম্মানহীনতার দিক তুলে ধরতে এসব দৃশ্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর মতে, একজন অভিনেত্রীর শরীরকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আলোচনা হয়, কিন্তু অভিনয় নিয়ে তুলনামূলক কম কথা বলা হয়।

সিডনি সুইনির ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা হলেই একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—তিনি কি খুব বেশি নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করেন?

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুবার বিতর্ক হয়েছে। কেউ বলেন, তিনি সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী। আবার কেউ মনে করেন, হলিউড তাঁকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে যৌন আবেদনময় চরিত্রে ব্যবহার করছে। সিডনি বরাবরই নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি বলেছেন, পুরুষ অভিনেতারা যখন শরীর প্রদর্শন করেন, তখন তা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বড় বিতর্ক হয়ে দাঁড়ায়।
সিডনি আরও দাবি করেন, অভিনয়ের সময় তাঁর সীমারেখা স্পষ্ট থাকে এবং কোন দৃশ্যে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন, সে সিদ্ধান্ত তিনিই নেন।

দ্য হলিউড রিপোর্টার, আইএমডিবি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে