ইসরায়েলের গণহত্যা নিয়ে কথা বলে সিনেমা থেকে বাদ পড়েন এই অভিনেত্রী

মেলিসা বারেরা। এএফপি

‘স্ক্রিম’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে অভিনয় করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন মেলিসা বারেরা। কিন্তু ২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার পর তাঁর ক্যারিয়ার যেন আচমকাই থমকে যায়। সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ভ্যারাইটিকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সেই কঠিন সময়, হলিউডে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং নতুন করে ফিরে আসার লড়াই নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী।

গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর প্রতিবাদে নিয়মিত ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করতেন বারেরা। তিনি যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান, ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহের লিংক শেয়ার করেন এবং ইসরায়েলি সরকারের সমালোচনা করেন। এরপরেই প্রযোজনা সংস্থা স্পাইগ্লাস মিডিয়া গ্রুপ তাঁকে স্ক্রিম ৭ থেকে বাদ দেয় এবং ট্যালেন্ট এজেন্সি ডব্লিউএমই চুক্তি বাতিল করে। কাজ থেকে বাদ পড়ার পর প্রায় এক বছর তাঁর কাছে কোনো কাজের প্রস্তাব আসেনি।

তখন স্পাইগ্লাস এক বিবৃতিতে বলেছিল যে তারা ‘যেকোনো ধরনের ইহুদিবিদ্বেষ বা ঘৃণাত্মক বক্তব্যের বিরুদ্ধে।’ তবে মেলিসা সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর ভাষায়, ‘কোনো জনগোষ্ঠী আর তাদের সরকার এক বিষয় নয়। আমি শান্তি, মানবাধিকার ও নিরাপত্তার পক্ষে কথা বলেছি এবং ভবিষ্যতেও বলব। আমার জন্য নীরব থাকা সম্ভব নয়।’

সিনেমার দৃশ্যে মেলিসা বারেরা। আইএমডিবি

সাক্ষাৎকারে মেলিসা বলেন, বরখাস্ত হওয়ার পর প্রায় এক বছর তাঁর কাছে কোনো কাজের প্রস্তাব আসেনি। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। মেক্সিকোতে বেড়ে ওঠা এই অভিনেত্রী ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্নই যেন হঠাৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। তবে এখন তিনি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি ব্রডওয়ের জনপ্রিয় মিউজিক্যাল ‘টাইটানিক’–এ অভিনয় করছেন। সেখানে তিনি ‘রোজ’ চরিত্রে অভিনয় করছেন, যা জেমস ক্যামেরনের অস্কারজয়ী সিনেমা ‘টাইটানিক’–এর বিখ্যাত চরিত্রের ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ। বারেরা বলেন, ‘আমি এখন অনেক বেশি শান্তিতে আছি। ব্রডওয়েতে কাজ করা ছিল আমার বহুদিনের স্বপ্ন।’

মেলিসা আরও বলেন, ‘আমি সব সময় বিশ্বাস করি, আমি যেকোনো কিছু করতে পারি। এটা যেমন আমার শক্তি, তেমনি দুর্বলতাও।’

সাক্ষাৎকারে মেলিসা দাবি করেন, হলিউডে এখনো অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভ পুষে রেখেছেন। তাঁর মতে, তিনি তখন ‘সহজ টার্গেট’ ছিলেন। কারণ, তিনি ছিলেন একজন নারী, লাতিন আমেরিকান বংশোদ্ভূত অভিনেত্রী এবং তখন ক্যারিয়ারের উত্থানের পথে—কিন্তু এত বড় তারকা নন যে তাঁকে ছোঁয়া যাবে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমি যথেষ্ট পরিচিত ছিলাম যাতে আমাকে নিয়ে খবর বানানো যায়, কিন্তু এত বড় তারকা ছিলাম না যে ইন্ডাস্ট্রি আমার পাশে দাঁড়াবে।’

মেলিসা অভিযোগ করেন, ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই সমর্থনের বার্তা দিলেও প্রকাশ্যে খুব কম মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘শুধু ব্যক্তিগত মেসেজ পাঠিয়ে লাভ নেই, যদি কেউ প্রকাশ্যে কিছু না বলে।’

সিনেমার দৃশ্যে মেলিসা বারেরা। আইএমডিবি

এই প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান নির্মাতা বুটস রাইলিকে। বারেরার দাবি, তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি তাঁকে কাজের প্রস্তাব দেন। এরপর ধীরে ধীরে আবার নতুন কাজের দরজা খুলতে শুরু করে।

সাক্ষাৎকারে মেলিসা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। কিন্তু অনেক সময় কেটে গিয়েছিল। পরে বুটস রাইলি আমাকে মেসেজ করে বললেন, তাঁর সিনেমায় একটা চরিত্র আছে। ওটাই যেন সবকিছু বদলে দেয়।’
ইসরায়েল–ফিলিস্তিন ইস্যুতে কথা বলার কারণে নারীরাই বেশি প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ছেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে বারেরা বলেন, তাঁরও এমনটাই মনে হয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে অভিনেত্রী সুসান সারান্ডনের নাম উল্লেখ করেন, যিনি প্রকাশ্যে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

একই সঙ্গে মেলিসা বলেন, ব্রডওয়ের পরিবেশ তাঁকে নতুনভাবে বাঁচার শক্তি দিয়েছে। ‘এখানে অনেক ‘সত্যিকারের শিল্পী’ আছেন। যাঁরা শুধু অর্থ বা খ্যাতির জন্য কাজ করেন না,’ বলেন তিনি।

এই কঠিন সময় মেলিসাকে নিজের পরিচয় নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই ভাবতাম। হঠাৎ মনে হলো, যদি আর কখনো অভিনয়ই করতে না পারি, তাহলে আমি কে?’
পরিবারের সমর্থন তাঁকে সেই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। এখন তিনি নিজের প্রযোজনা সংস্থা গঠনের কাজ করছেন। পাশাপাশি একটি প্রেমের গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

ভবিষ্যতে কাদের সঙ্গে কাজ করতে চান—এমন প্রশ্নে বারেরা বলেন, তিনি এমন মানুষদের নিয়ে কাজ করতে চান, যাঁরা ফিলিস্তিনের পক্ষে সরব হয়েছেন। তালিকায় তিনি তাতিয়ানা মাসলানি, হানা এলিনবিন্ডার ও হাভিয়ের বারদেমের নাম উল্লেখ করেন।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে