আবেদনময়ী তারকা, বিতর্ক থেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা! শ্যারনের আশ্চর্য জীবন
হলিউডে এমন কিছু অভিনেত্রী আছেন, যাঁরা শুধু অভিনয় দিয়ে নয়, ব্যক্তিত্ব, সাহসী সিদ্ধান্ত আর জীবনসংগ্রাম দিয়েও স্মরণীয় হয়ে থাকেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শ্যারন স্টোন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ও আবেদনময়ী অভিনেত্রীদের একজন। বিশেষ করে ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় ও উপস্থিতি তাঁকে বিশ্বজুড়ে তারকা বানিয়ে দেয়। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান, স্বাস্থ্যসংকট ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঝড়। আজ ১০ মার্চ অভিনেত্রীর জন্মদিন; এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক শ্যারন স্টোনের জীবন ও ক্যারিয়ার।
ছোট শহরের মেধাবী মেয়ে
১৯৫৮ সালের ১০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ছোট শহর মিডভিলে জন্মগ্রহণ করেন শ্যারন স্টোন। তাঁর শৈশব মোটেও সুখের ছিল না। তিনি জানান, তাঁর মাতামহ ছিলেন একজন সহিংস ব্যক্তি এবং পরিবারের মেয়েদের ওপর অত্যাচার চালাতেন।
স্টোনের দাবি, তাঁর মা ছোটবেলা থেকেই মারধরের শিকার ছিলেন। পরে স্টোন ও তাঁর বোনও সেই নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এই অভিজ্ঞতা তিনি বিস্তারিত লিখেছেন তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্য বিউটি অব লিভিং টোয়াইস’-এ। তাঁর মতে, পরিবারের গোপন সহিংসতার কথা প্রকাশ করা সহজ ছিল না। কারণ, পরিবারের ভেতরের সত্য প্রকাশ করলে অনেক সময় মানুষই আপনাকে দোষারোপ করে।
শিক্ষার্থী হিসেবে স্টোন ছিলেন মেধাবী। স্কুলজীবনে শ্যারন স্টোনের বুদ্ধিমত্তা এতটাই নজর কেড়েছিল যে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর আগ্রহ ছিল অভিনয় ও মডেলিংয়ে।
সত্তরের দশকের শেষ দিকে একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পর শ্যারন স্টোনের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। বিচারকদের একজন তাঁকে পরামর্শ দেন নিউইয়র্কে গিয়ে মডেলিং করার জন্য। সেই পরামর্শই তাঁকে নিয়ে যায় বড় স্বপ্নের শহরে।
মডেলিং থেকে হলিউডে
নিউইয়র্কে এসে শ্যারন স্টোন দ্রুতই ফ্যাশন জগতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক মডেলিং এজেন্সি ফোর্ড মডেলসের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তিনি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফ্যাশন ম্যাগাজিনে তাঁর ছবি ছাপা হতে থাকে। তবে মডেলিংয়ে সফল হলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল অভিনয়। সেই স্বপ্ন নিয়ে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান।
১৯৮০ সালে উডি অ্যালেনের সিনেমা ‘স্টারডাস্ট মেমোরিজ’-এ ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে শ্যারন স্টোনের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। যদিও চরিত্রটি ছিল ছোট, তবু এটিই ছিল তাঁর জন্য দরজা খুলে দেওয়ার প্রথম ধাপ।
১৯৯২ সালে শ্যারন স্টোনের জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে। পরিচালক পল ভারহোভেন তাঁকে নেন ইরোটিক থ্রিলার সিনেমা ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’-এ। এই সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন রহস্যময় লেখক ক্যাথরিন ট্রামেলের চরিত্রে। তাঁর বিপরীতে ছিলেন মাইকেল ডগলাস। সিনেমাটি মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে একটি জেরা দৃশ্য এতটাই আলোচিত হয় যে তা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। স্টোন পরে দাবি করেন, ওই দৃশ্যের ব্যাপারে তাঁকে পুরো সত্য জানানো হয়নি। পরিচালক তাঁকে বলেছিলেন অন্তর্বাস খুলতে, যাতে আলো প্রতিফলিত না হয়। কিন্তু পরে সেই মুহূর্তটি ছবিতে ব্যবহৃত হয়। এই একটি দৃশ্যই অনেক বছর ধরে তাঁর ক্যারিয়ারের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘ সংগ্রামের বছর
হলিউডে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। আশির দশকের বেশির ভাগ সময় শ্যারন স্টোন ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি অভিনয় করেন ‘কিংস সলোমনস মাইনস’, ‘পোলিস একাডেমি ৪’ ইত্যাদি সিনেমায়। কিন্তু এসব সিনেমা তাঁকে বড় তারকা বানাতে পারেনি।
অনেক প্রযোজক তখন শ্যারন স্টোনকে শুধু ‘সুন্দরী মডেল’ হিসেবে দেখতেন, দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে নয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পাওয়া ছিল কঠিন। এই সময়টাতে তিনি বহুবার হতাশ হয়েছেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন—হলিউডে টিকে থাকার জন্য শুধু সৌন্দর্য নয়, প্রচণ্ড ধৈর্যও দরকার।
‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’—এক রাতেই বিশ্বখ্যাতি
১৯৯২ সালে শ্যারন স্টোনের জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে। পরিচালক পল ভারহোভেন তাঁকে নেন ইরোটিক থ্রিলার সিনেমা ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’-এ। এই সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন রহস্যময় লেখক ক্যাথরিন ট্রামেলের চরিত্রে। তাঁর বিপরীতে ছিলেন মাইকেল ডগলাস। সিনেমাটি মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে একটি জেরা দৃশ্য এতটাই আলোচিত হয় যে তা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। স্টোন পরে দাবি করেন, ওই দৃশ্যের ব্যাপারে তাঁকে পুরো সত্য জানানো হয়নি। পরিচালক তাঁকে বলেছিলেন অন্তর্বাস খুলতে, যাতে আলো প্রতিফলিত না হয়। কিন্তু পরে সেই মুহূর্তটি ছবিতে ব্যবহৃত হয়। এই একটি দৃশ্যই অনেক বছর ধরে তাঁর ক্যারিয়ারের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
এই সিনেমার পর শ্যারন স্টোন রাতারাতি হলিউডের শীর্ষ তারকাদের একজন হয়ে ওঠেন। তাঁর আবেদনময় উপস্থিতি, আত্মবিশ্বাসী অভিনয় ও রহস্যময় ব্যক্তিত্ব দর্শকদের মুগ্ধ করে।
অভিনয়ের স্বীকৃতি
‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’-এর সাফল্যের পর শ্যারন স্টোন একের পর এক বড় সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় মার্টিন স্করসেজির ‘ক্যাসিনো’, এই সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন জিঞ্জার ম্যাককেনা চরিত্রে এবং তাঁর বিপরীতে ছিলেন রবার্ট ডি নিরো। এই ছবিতে তাঁর অভিনয়ের জন্য তিনি অস্কার মনোনয়ন পান। অনেক সমালোচকের মতে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয়।
আবেদনময়তার প্রতীক
নব্বইয়ের দশকে শ্যারন স্টোনকে হলিউডের অন্যতম আবেদনময়ী অভিনেত্রী হিসেবে দেখা হতো। ‘সিলভার’, ‘দ্য স্পেশালিস্ট’ ও ‘টোটাল রিকল’ সিনেমায় শ্যারন স্টোন একাধারে শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে তিনি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে থাকতে চাননি। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে তিনি একজন শক্তিশালী অভিনেত্রীও।
জীবন-মরণ স্বাস্থ্যসংকট
২০০১ সালে শ্যারন স্টোনের জীবনে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। হঠাৎ করে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। এই অবস্থায় তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম ছিল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, তাঁর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র এক শতাংশ। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই সময় তাঁর ক্যারিয়ার প্রায় থেমে গিয়েছিল।
পরে শ্যারন স্টোন বলেছেন, সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এই ঘটনার পর তাঁর ক্যারিয়ার প্রায় থেমে যায়। স্টোন বলেন, সে সময় হলিউডে যদি কোনো নারী অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তাহলে তাঁকে প্রায় ‘শেষ হয়ে যাওয়া’ শিল্পী হিসেবেই দেখা হতো।
অভিনয়ের পাশাপাশি শ্যারন স্টোন মানবিক কাজেও সক্রিয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এইডস গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বিশ্বজুড়ে নানা মানবিক উদ্যোগেও তাঁকে দেখা যায়। অভিনেত্রীর পাশাপাশি পাশাপাশি স্টোন এখন একজন চিত্রশিল্পীও। তার আঁকা ছবিগুলো আন্তর্জাতিক গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে এবং অনেক চিত্রকর্ম চড়া মূল্যে বিক্রি হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়
শ্যারন স্টোনের ব্যক্তিগত জীবনও কম নাটকীয় নয়। তিনি প্রথম বিয়ে করেন টেলিভিশন প্রযোজক মাইকেল গ্রিনবার্গকে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই বিয়ে ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি বিয়ে করেন সাংবাদিক পিল ব্রনস্টিনকে। এই দম্পতি একটি সন্তান দত্তক নেন। তবে ২০০৪ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়। পরে তিনি আরও দুই সন্তান দত্তক নেন এবং তাঁদের নিয়েই জীবন গুছিয়ে নেন।
হার্ভি ওয়েনস্টিন–বিতর্ক
যৌন নির্যাতনের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত কুখ্যাত প্রযোজক হার্ভি ওয়েন্টিনের সঙ্গেও শ্যারন স্টোনের তিক্ত অতীত আছে। স্টোন জানান, ওয়াইনস্টাইন তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছিলেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে অপমান করতেন। তবে তিনি বলেন, ওয়েনস্টিনের যৌন প্রস্তাব তিনি কখনোই মেনে নেননি।
মানবিক কাজ ও নতুন পরিচয়
অভিনয়ের পাশাপাশি শ্যারন স্টোন মানবিক কাজেও সক্রিয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এইডস গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বিশ্বজুড়ে নানা মানবিক উদ্যোগেও তাঁকে দেখা যায়। অভিনেত্রীর পাশাপাশি পাশাপাশি স্টোন এখন একজন চিত্রশিল্পীও। তার আঁকা ছবিগুলো আন্তর্জাতিক গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে এবং অনেক চিত্রকর্ম চড়া মূল্যে বিক্রি হয়েছে।
৬৭ বছর বয়সে এসে স্টোন আবার চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান। তাঁর কথায়—‘কখনো কখনো খালি গ্লাসও ভালো। কারণ, সেটি আবার ভরা যায়।’
আইএমডিবি, পিপলডটকম ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে