‘ওয়ান ব্যাটল’-এর রাত আর কী হলো

গতকাল ভোরে বসেছিল একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ৯৮তম আসর। লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে এবারের অস্কারে সর্বোচ্চ ছয়টি পুরস্কার জিতেছে পল টমাস অ্যান্ডারসনের ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার। অস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ছয় পুরস্কারের বিস্তারিত জানাচ্ছেন লতিফুল হক

পুরস্কার হাতে টিম ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। রয়টার্স

সেরা ছবি
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’, অর্থাৎ একের পর এক যুদ্ধ। সিনেমাটির প্রথম আধা ঘণ্টার এক বিপ্লবী লড়াইয়ের প্রতিক্রিয়া বাকি সময়জুড়ে চলতে থাকে। অপহরণ, পলায়ন আর ধাওয়া। দিশাহারা এক বাবার মেয়েকে খুঁজে বেড়ানোর গল্পে পুরো সময় বুঁদ হয়ে থাকেন দর্শক। একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে, কিন্তু কোথাও কোনো কিছু বাড়তি মনে হয় না; বরং ডার্ক হিউমারে ভরপুর তিন ঘণ্টার সিনেমার পুরোটাই এক উপভোগ্য জার্নি হয়ে ওঠে। তবে ডার্ক হিউমারের আড়ালে সিনেমাটি আদতে কড়া রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত টমাস পিনচনের উপন্যাস ভাইনল্যান্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি বানিয়েছেন পল টমাস অ্যান্ডারসন। যার সঙ্গে এ সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়। বিপ্লব, অভিবাসন, দুর্নীতি, সংঘর্ষ, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য—এসবই এখানে উঠে এসেছে। সিনেমাটির জন্য সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্যের পুরস্কারও পেয়েছেন অ্যান্ডারসন। এ পুরস্কার গ্রহণ করে তিনি বলেন, মূলত নিজের সন্তানদের উদ্দেশেই এটি লিখেছেন। তাঁর কথায়, ‘যে বিশৃঙ্খল পৃথিবী আমরা রেখে যাচ্ছি, তার জন্য ছবিটি যেন তাদের কাছে একধরনের ক্ষমা চাওয়া। আবার সেই সঙ্গে আশার বাণীও—পরবর্তী প্রজন্মই হয়তো আমাদের সমাজে নতুন করে বোধ ও মানবিকতা ফিরিয়ে আনবে।’

‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায় লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। আইএমডিবি

সেরা পরিচালক
পল টমাস অ্যান্ডারসন
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম অস্কার পেলেন ৫৫ বছর বয়সী এই নির্মাতা। পুরস্কার গ্রহণ করে রসিকতার সুরে বলেন, ‘একটা অস্কার জিততে গিয়ে মানুষকে বেশ কষ্ট করতেই হয়।’ নব্বইয়ের দশকে ক্যারিয়ার শুরু করা অ্যান্ডারসনের সিনেমাগুলো মেজাজে গুরুগম্ভীর, দীর্ঘ টেক থাকে। ‘ওয়ান ব্যাটল’ই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে সহজবোধ্য সিনেমা। এর আগে ‘বুগি নাইটস’, ‘ম্যাগনোলিয়া’, ‘পাঞ্চড্রাংক লাভ’, ‘দেয়ার উইল বি ব্লাড’, ‘ইনহেরেন্ট ভাইস’, ‘ফ্যান্টম থ্রেড’ বানিয়ে খ্যাতি পাওয়া অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারে বড় আক্ষেপ হয়ে ছিল অস্কার; এবার সেটাও পূর্ণ হলো।

পল টমাস অ্যান্ডারসন

সেরা অভিনেত্রী
জেসি বাকলি
অস্কারে সেরা অভিনেত্রী হয়ে ইতিহাস গড়লেন জেসি বাকলি। তিনি হয়ে প্রথম আইরিশ অভিনেত্রী, যিনি এই বিভাগে পুরস্কার জিতলেন। এটি ছিল জেসির দ্বিতীয় মনোনয়ন। ‘দ্য লস্ট ডটার’ সিনেমার জন্য এর আগে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে মনোনীত হয়েছিলেন। অস্কারের আগে থেকেই পুরস্কার-দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন বাকলি। বাফটা, গোল্ডেন গ্লোবস, ক্রিটিক চয়েস ও অ্যাক্টরস অ্যাওয়ার্ডসে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারসহ জিতেছেন বড় বড় সম্মাননা। ফলে অস্কারের মঞ্চেও তাঁর জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলেই মনে করা হচ্ছিল। তবু নিজের নাম ঘোষণার মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। এবারের সম্মাননার একটি বিশেষ তাৎপর্যও ছিল। কারণ, যুক্তরাজ্যে দিনটি ছিল মাদার্স ডে। তাই পুরস্কারটি তিনি মায়েদের উৎসর্গ করেন। হ্যামনেট-এর জন্য পুরস্কার পেয়েছেন জেসি; ক্লোয়ি ঝাওয়ের ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন অ্যাগনেস চরিত্রে, যিনি দরিদ্র লাতিন শিক্ষক উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। পরে যিনি নাট্যকার হিসেবে বিশ্বখ্যাত হন। গল্পে দেখা যায়, তাঁদের একমাত্র ছেলে হ্যামনেট প্লেগে মারা যায়। সেই শোক ও পারিবারিক ট্র্যাজেডিই পরে শেক্‌সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক হ্যামলেট রচনার প্রেরণা হয়ে ওঠে।

অস্কার হাতে জেসি বাকলি। এএফপি

সেরা অভিনেতা
মাইকেল বি জর্ডান
টিমোথি শ্যালামে বা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও নন, সেরা অভিনেতা হয়েছেন মাইকেল বি জর্ডান। রায়ান কুগলারের আলোচিত হরর সিনেমা ‘সিনার্স’-এ দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে এ পুরস্কার জিতেছেন তিনি। ক্যারিয়ারের প্রথম মনোনয়নেই পুরস্কার জিতলেন মাইকেল বি জর্ডার। অস্কার জিতে আবেগঘন বক্তব্যে তাঁর আগের প্রজন্মের কিংবদন্তি শিল্পীদের স্মরণ করলেন। অস্কারের ইতিহাসে এই বিভাগে পুরস্কারজয়ী ষষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা তিনি। মঞ্চে উঠে জর্ডান বলেন, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি তাঁদের জন্যই, যাঁরা আমার আগে পথ তৈরি করেছেন।’ এরপর তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সিডনি পয়টিয়ার, ডেনজেল ওয়াশিংটন, জেমি ফক্স, ফরেস্ট হুইটেকার ও উইল স্মিথকে। উল্লেখ করেন অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারজয়ী প্রথম ও একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী হ্যালি বেরির নামও। তিনি বলেন, ‘এই কিংবদন্তিদের পাশে নিজের নাম দেখতে পাওয়া আমার জন্য বিরাট সম্মানের।’

আরও পড়ুন

১৯৩০-এর দশকের পটভূমিতে নির্মিত ‘সিনার্স’ ছবিতে যমজ দুই ভাই—স্মোক ও স্ট্যাক চরিত্রে অভিনয় করেছেন জর্ডান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁরা নিজ শহরে ফিরে একটি সঙ্গীত ক্লাব খোলেন। এক রাত্রে ক্লাবটি আক্রমণ করে একদল ভ্যাম্পায়ার। ছবিটি শুধু সমালোচকদের প্রশংসাই পায়নি, বক্স অফিসেও বড় সাফল্য পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৭ কোটি ডলার আয় করেছে। এ বছর অস্কারে ছবিটি রেকর্ড ১৬টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল; জিতেছে চারটি পুরস্কার।

অস্কার হাতে মাইকেল বি জর্ডান। এএফপি

সেরা আন্তর্জাতিক ছবি
সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু
একটি বাড়ি, ইতিহাস, স্মৃতি, শিল্প আর ট্রমা মিলিয়েই ইয়েকিম ত্রিয়েরের শ্বাসরুদ্ধকর ড্রামা ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’। বাড়িটিকে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। পুরোনো বাড়িতে ফাটলের অভাব নেই। মনে হয়, এই ভেঙে পড়বে। ছবিটি ইঙ্গিত দেয়, যদি ভেঙেই পড়ে, হয়তো সেটাই ভালো। শিল্পচর্চা কীভাবে অনুশোচনা, প্রায়শ্চিত্ত আর সম্পর্কের ফাটল জোড়া লাগায়, সেটাই দেখায় সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু। গত বছর কান উৎসবে প্রিমিয়ারের পর থেকেই সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয় নরওয়ের সিনেমাটি। পুরস্কার জয়ের পর সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ত্রিয়ের বলেন, ‘সিনেমাটি ভেঙে যাওয়া পরিবারের গল্প বটে কিন্তু এই সিনেমায় আমরা যারা কাজ করেছি, সবাই একটা শক্তিশালী পরিবার।’

সেরা অ্যানিমেশন ছবি
‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’
কে-পপ নিয়ে দুনিয়াজড়ে মাতামাতি, তবে কাল্পনিক দুই ব্যান্ডের গল্প যে এভাবে ঝড় তুলবে, কে জানত। গত বছর মুক্তির পর নেটফ্লিক্স আর বিলবোর্ডের অনেক রেকর্ড ভেঙে দেয় কে-পপ ডেমন হান্টার্স। নেটফ্লিক্সের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দেখা সিনেমা এটি। এবার জিতল অস্কার। সেরা অ্যানিমেশন সিনেমা ছাড়াও এটি জিতেছে সেরা গানের পুরস্কারও (‘গোল্ডেন’)। এরই মধ্যে সিনেমাটির সিকুয়েলের ঘোষণা দিয়েছে নেটফ্লিক্স।

ভ্যারাইটি ও বিবিসি অবলম্বনে