স্পিলবার্গ বললেন, ‘জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে’
কয়েক দশক ধরে স্টিভেন স্পিলবার্গ যেমন দর্শকদের কল্পনার জগতে ভ্রমণ করিয়েছেন, তেমনি চলচ্চিত্রকে একটি বাণিজ্যিক শিল্প হিসেবেও নতুন মাত্রা দিয়েছেন। অথচ সেই স্পিলবার্গই এখন হলিউডের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৫ এপ্রিল সিনেমাকন উৎসবে হাজির হয়ে স্পিলবার্গ উদ্বেগের সুরে বলছেন, যদি চলচ্চিত্রশিল্প কেবল পুরোনো পরিচিত গল্পের ওপর নির্ভর করে এগোতে থাকে, তাহলে একসময় এই শিল্পের সৃজনশীল জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে।
সিনেমাকনে স্পিলবার্গ তাঁর নতুন ছবি ‘ডিসক্লোজার ডে’র ঝলক দেখান। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন এক আলোচনা উসকে দেন, যা কেবল হলিউড নয়, বিশ্বের সব চলচ্চিত্রশিল্পের জন্যই প্রাসঙ্গিক। দীর্ঘদিন ধরে স্পিলবার্গ তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল গল্পে মন দিয়েছেন। দ্য ফ্যাবেলম্যানস-এ তিনি নিজের বেড়ে ওঠার গল্প বলেছেন আর ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’তে ক্ল্যাসিক মিউজিককে নতুনভাবে হাজির করেছেন। এবার তিনি ফিরে এসেছেন তাঁর সেই পুরোনো পরিচিত ময়দানে, যেখানে রহস্য, প্রযুক্তি, বিস্ময় আর অজানার আকর্ষণ একসঙ্গে কাজ করে।
‘ডিসক্লোজার ডে’র কাহিনি এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা যাচ্ছে, এটি ভিনগ্রহের প্রাণী, তাদের পৃথিবীতে আগমন এবং সেই সত্যকে আড়াল করার এক বিশাল সরকারি ষড়যন্ত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এ ধরনের কাহিনি স্পিলবার্গের জন্য নতুন নয়; বরং তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম শক্তিশালী অধ্যায়ই গড়ে উঠেছে এই ধারার ওপর। ‘ই.টি. দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল’, ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব থার্ড কাইন্ড’ বা ‘ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস’-এ তিনি অজানা জগৎকে মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তবে সময় বদলেছে। আজকের দর্শক শুধু গল্প শুনতে চায় না, তারা অভিজ্ঞতা চায়। প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি, বড় বাজেট এবং ধারাবাহিকভাবে নির্মিত জনপ্রিয় ধারার ছবিগুলো দর্শকের প্রত্যাশাকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে স্পিলবার্গের নতুন ছবিটি একধরনের পরীক্ষা। তিনি কি আবারও সেই পুরোনো জাদু ফিরিয়ে আনতে পারবেন, নাকি দর্শক এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে।
এ ছবিতে এমিলি ব্লান্ট অভিনয় করছেন এক আবহাওয়া সংবাদকর্মীর ভূমিকায়, যাঁর সঙ্গে ভিনগ্রহের আগন্তুকদের রহস্যময় যোগাযোগ রয়েছে। জশ ও’কনরকে দেখা যাবে এমন এক চরিত্রে, যিনি প্রমাণ হাতে পেয়েছেন যে মানুষের সঙ্গে অন্য জগতের যোগাযোগ ইতিমধ্যে ঘটেছে। অন্যদিকে কলিন ফার্থ ক্ষমতাধর এক প্রশাসনিক ব্যক্তি, যিনি এই সত্য গোপন রাখতে যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন ডেভিড কোয়েপ, যিনি আগে স্পিলবার্গের সঙ্গে ‘জুরাসিক পার্ক’-এ কাজ করেছেন।
সিনেমাকনে প্রদর্শিত ঝলকে স্পিলবার্গীয় নির্মাণশৈলীর পরিচিত ছাপ স্পষ্ট। দ্রুতগতি, অজানা শক্তির উপস্থিতি, মানুষের ভয়ের সঙ্গে কৌতূহলের সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একধরনের আবহ, যা দর্শককে একই সঙ্গে আকৃষ্ট ও উদ্বিগ্ন করে। অন্ধকার আকাশে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠা অজানা যান, মানুষের মুখে অমানবিক স্পর্শ আর এর মধ্য দিয়ে ভেসে ওঠা প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই একা—এই সবকিছু ছবির কেন্দ্রীয় ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে।
তবে এ ছবির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে স্পিলবার্গের বক্তব্য। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রশিল্প অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে পরিচিত কাহিনি ও প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের ওপর। একই চরিত্র, একই জগৎ, একই ধাঁচের গল্প বারবার ফিরে আসছে। এতে ঝুঁকি কম, বিনিয়োগ নিরাপদ, কিন্তু সৃজনশীলতার জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য বিপজ্জনক।
স্পিলবার্গ মনে করেন, দর্শককে অবাক করার ক্ষমতাই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই অবাক করার ক্ষমতা আসে নতুন গল্প, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন নির্মাণশৈলী থেকে। যদি সেই জায়গা হারিয়ে যায়, তাহলে সিনেমা ধীরে ধীরে একঘেয়ে হয়ে উঠবে। তাঁর ভাষায়, তখন এই শিল্পের জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে।
স্পিলবার্গ শুধু গল্পের বিষয়েই কথা বলেননি, তিনি প্রদর্শনব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সিনেমা হলেই চলচ্চিত্রের প্রকৃত অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। বড় পর্দা, সম্মিলিত দর্শক প্রতিক্রিয়া, শব্দ ও আলোর সমন্বয়—এই সবকিছু মিলে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, তা ঘরে বসে দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমানে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছবিগুলো ওটিটিতে চলে আসছে, ফলে হলের প্রতি দর্শকের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্পিলবার্গ প্রযোজনা সংস্থা ইউনিভার্সাল পিকচার্সের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন, যারা তাদের ছবির প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের সময়সীমা বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগই চলচ্চিত্রশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে