গোপন বিয়ে থেকে করুণ পরিণতি, কেনেডি জুনিয়র ও ক্যারোলিন রোমাঞ্চকর গল্প
নির্মাতা রায়ান মার্ফি সত্য ঘটনা অবলম্বনে সিরিজ নির্মাণে বরাবরই পারদর্শী। তাঁর প্রযোজনায় তৈরি ‘আমেরিকান ক্রাইম স্টোরি’, ও. জে. সিম্পসন মামলা, কিংবা ক্লিনটন–লিউইনস্কি কেলেঙ্কারি—সবই ফিরে এসেছে নতুন ব্যাখ্যায়। এবার তিনি প্রযোজকের আসনে থেকে এনেছেন এফএক্সের নতুন সিরিজ ‘লাভ স্টোরি: জন এফ. কেনেডি জুনিয়ার অ্যান্ড ক্যারোলিন বেসেট’। এই সিরিজে উঠে এসেছে জন এফ কেনেডি জুনিয়র ও তাঁর স্ত্রী ক্যারোলিন বেসেট-কেনেডির বহুল আলোচিত প্রেম, বিবাহ এবং করুণ পরিণতির গল্প।
শুরুতেই ট্র্যাজেডি
সিরিজটি শুরু হয় ১৯৯৯ সালের সেই বিমানযাত্রা দিয়ে, যা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়। সেখান থেকে গল্প ফিরে যায় ১৯৯২ সালে—যখন প্রথম দেখা হয় জন এফ কেনেডি জুনিয়র ও ক্যারোলিন বেসেটের। তখন ক্যারোলিন কাজ করতেন ফ্যাশন ব্র্যান্ড ক্যালভিন ক্লেইনের মুখপাত্র হিসেবে। তাঁর স্বাভাবিক আভিজাত্য ও মানুষের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের দক্ষতা তাঁকে দ্রুত পরিচিতি এনে দিচ্ছিল।
অন্যদিকে ১৯৮৮ সালে ‘পিপল’ ম্যাগাজিনের ‘সেক্সিয়েস্ট ম্যান অ্যালাইভ’ খেতাব পাওয়া কেনেডি জুনিয়র ১৯৯২ নাগাদ কর্মজীবনে কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে। সহকারী জেলা অ্যাটর্নি হিসেবে তাঁর অবস্থান নড়বড়ে ছিল আর সংবাদমাধ্যমে তাঁকে অনেক সময় হালকাভাবে উপস্থাপন করা হতো।
শুরুটা সহজ ছিল না। ১৯৯২ সালে ক্যালভিন ক্লেইনের এক পার্টিতে তাঁদের প্রথম দেখা। তবে সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। সিরিজের প্রথম কয়েক পর্বে দেখানো হয়েছে অভিনেত্রী ড্যারিল হানার সঙ্গে কেনেডির সম্পর্ক। কেনেডির মা জ্যাকলিন কেনেডি ওনাসিস নাকি এই সম্পর্ক পছন্দ করতেন না—যদিও বাস্তব জীবনে এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।
তৃতীয় পর্বের শেষে জ্যাকলিন কেনেডি ওনাসিসের মৃত্যু হয়। এর কিছুদিন পর চূড়ান্তভাবে শেষ হয় কেনেডি ও ড্যারিল হানার সম্পর্ক। ১৯৯৪ সালে শুরু হয় কেনেডি ও ক্যারোলিনের প্রেম।
‘নতুন জেএফকে–জ্যাকি’?
আমেরিকার মানুষের কাছে তাঁদের সম্পর্ক ছিল একধরনের আধুনিক রূপকথা। অনেকেই ভাবতেন, ষাটের দশকে যেভাবে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও জ্যাকি ওনাসিস আমেরিকার মন জয় করেছিলেন, তেমনি হয়তো নতুন প্রজন্মের প্রতীক হয়ে উঠবেন জন জুনিয়র ও ক্যারোলিন।
১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে ম্যাসাচুসেটসের মার্থাস ভিনইয়ার্ডে একটি মাছ ধরার নৌকায় কেনেডি ক্যারোলিনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তাঁর সাবেক সহকারী রোজমেরি তেরেনজিওর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই তুমি আমার সঙ্গী হও।’ তবে ক্যারোলিন সঙ্গে সঙ্গে রাজি হননি। তিন সপ্তাহ পর তিনি প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
জনসমক্ষে বিবাদ, খবরের শিরোনামে ১৯৯৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটার সময় তাঁদের একটি তর্কের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী হয়। সেই ঝগড়া জাতীয় সংবাদে পরিণত হয়; একটি দৈনিক তো ৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ হতে থাকে বিভিন্ন মাধ্যমে। ব্যক্তিগত মুহূর্ত পরিণত হয় বহুল চর্চিত বিষয়ে।
কিন্তু সাত মাস পর, ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬—দুজন গোপনে বিয়ে করেন। জর্জিয়ার কাম্বারল্যান্ড দ্বীপের ফার্স্ট আফ্রিকান ব্যাপ্টিস্ট চার্চে অনুষ্ঠিত হয় তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। অতিথিদের প্রবেশের জন্য বিশেষ একটি পুরোনো মুদ্রা দেখাতে হতো। উপস্থিত অতিথির সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও এটি ছিল আধুনিক সময়ের অন্যতম গোপনীয় তারকা বিয়ে।
গোপনীয়তার লড়াই
বিয়ের পর, বিশেষ করে ক্যারোলিন চেয়েছিলেন আরও ব্যক্তিগত জীবন। কিন্তু পাপারাজ্জিদের অবিরাম অনুসরণ থামেনি। তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালে গণমাধ্যমের একাংশ তাঁকে ‘আইস কুইন’ বা নিয়ন্ত্রণপ্রবণ বলে চিহ্নিত করে।
কেনেডি একবার তাঁদের ট্রাইবেকা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘সে নতুন জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। যদি একটু ব্যক্তিগত পরিসর দেন, কৃতজ্ঞ থাকব।’
তাঁদের সম্পর্কেও টানাপোড়েন ছিল। ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্যে, তাঁরা গভীরভাবে ভালোবাসতেন, আবার তীব্রভাবে ঝগড়াও করতেন—যেমন অনেক দম্পতির ক্ষেত্রেই হয়।
শেষযাত্রা
১৯৯৯ সালের ১৬ জুলাই। তাঁরা যাচ্ছিলেন মার্থাস ভিনইয়ার্ডে, কেনেডির চাচাতো বোন ররি কেনেডির বিয়েতে যোগ দিতে। কেনেডি নিজেই একটি পাইপার সারাটোগা বিমান চালাচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ক্যারোলিন ও তাঁর বোন লরেন বেসেট।
উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিমানটি ২ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতা থেকে মাত্র ১৪ সেকেন্ডে ১ হাজার ১০০ ফুটে নেমে আসে এবং আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়। ৩৮ বছর বয়সী জন এফ কেনেডি জুনিয়র, ৩৩ বছর বয়সী ক্যারোলিন বেসেট-কেনেডি এবং ৩৪ বছর বয়সী লরেন বেসেট—তিনজনই নিহত হন।
২২ জুলাই মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস ব্রিসকো জাহাজ থেকে তাঁদের অস্থি সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়। পরদিন নিউইয়র্কের সেন্ট থমাস মোর চার্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণসভা।
কেন এখনো আকর্ষণীয় এই গল্প?
জন এফ কেনেডি জুনিয়র ও ক্যারোলিন বেসেটের গল্প কেবল এক প্রেমকাহিনি নয়—এটি আলো, ক্ষমতা, গণমাধ্যমের নজরদারি এবং ব্যক্তিগত জীবনের লড়াইয়ের গল্প।
এফএক্সের ‘লাভ স্টোরি’ সেই সম্পর্ককে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে। হয়তো এ কারণেই তাঁদের জীবন ও মৃত্যু এখনো আমেরিকার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এতটা শক্তভাবে গেঁথে আছে—এক আধুনিক রাজকীয় প্রেম, যার পরিণতি ছিল করুণ, কিন্তু প্রভাব স্থায়ী।
টাইম অবলম্বনে