৯ মাস বন্দী করে যৌন নির্যাতন, তথ্যচিত্রে ভয়ংকর সেই ঘটনা

‘কিডন্যাপড: এলিজাবেথ স্মার্ট’ -এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘কিডন্যাপড: এলিজাবেথ স্মার্ট’ ২১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছে, যা দর্শকদের সামনে এনেছে ২০০২ সালে এলিজাবেথ স্মার্টের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। স্মার্ট স্মরণ করছেন সেই রাতের দৃশ্য, যা তাঁর জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল—সল্ট লেক সিটির নিজের শোবার ঘর থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। অপহরণকারী ব্রায়ান ডেভিড মিচেল বিশ্বাস করতেন, তিনি ঈশ্বরের নির্দেশ মেনে চলছেন! স্মার্টকে ৯ মাস বন্দী রাখা হয়। তাঁর ওপর বারবার যৌন নির্যাতন চালানো হয়। এই তথ্যচিত্রে স্মার্টকে খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াটি তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, তাঁর পরিবারের সদস্য ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মরিয়া চেষ্টা। তথ্যচিত্রে হাজির হয়েছেন স্মার্ট নিজেও। বলেছেন, কীভাবে এই ভয়ংকর ঘটনা পেছনে ফেলে নতুনভাবে শুরু করেছেন তিনি।

অপহরণের রাত
তথ্যচিত্রের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশগুলোর মধ্যে একটি হলো, স্মার্টের অপহরণের রাতের বিবরণ। তাঁর ছোট বোন মেরি ক্যাথেরিনও সেই রাতে শোবার ঘরে ছিল। একমাত্র সাক্ষী হিসেবে অভিজ্ঞতা দেখেছে। ‘সেই রাতে এলিজাবেথ ও আমি একসঙ্গে প্রার্থনা করে ঘুমাতে গিয়েছিলাম,’ তথ্যচিত্রে সে বলে। ‘পরবর্তী মুহূর্তে আমাদের শোবার ঘরে একজন লোক এলিজাবেথকে বলছিল, যদি সে চিৎকার করে, তাকে হত্যা করবে। আমি তখন সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে গিয়েছিলাম,’ বলে মেরি।

স্মার্ট মনে করেন, তিনি ঘুম থেকে জেগে দেখেছিলেন, তাঁর ঘাড়ে ছুরি ছিল। ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, সে কি আমাকে আঘাত করবে? আমাকে কি হত্যা করবে? আমি আশা করছিলাম, মা–বাবা জাগবেন, কিন্তু কেউ আসেনি,’ বলেন তিনি।
শেষমেশ মেরি ক্যাথেরিন সাহস জোগাড় করে মা–বাবার ঘরে গিয়ে জানায় যে তার বোনকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রথমে মা–বাবা ভেবেছিলেন, মেরি কেবল একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু পরবর্তী সময় একটি ভাঙা স্ক্রিন দেখে বোঝা যায় যে কেউ বাড়িতে প্রবেশ করেছে।

বন্দি হওয়ার স্মার্টকে মিচেল ও তাঁর স্ত্রী বনাঞ্চলে নিয়ে যান, যেখানে প্রথমে আশ্বস্ত করা হয় যে তাঁকে হত্যা বা ধর্ষণ করা হবে না। এরপর স্মার্টের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। স্মার্ট স্মরণ করেন, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম, ভয়ংকর কিছু নেমে আসছে আমার জীবনে। আমি কাঁদছিলাম, ভয় পেয়েছিলাম। তার কথা ঠিক এই রকম ছিল, “আমি তোমাকে ঈশ্বর ও তাঁর দেবদূতদের সামনে আমার স্ত্রীরূপে গ্রহণ করলাম।” আমি না বলতে চেঁচিয়েছিলাম। তখন সে বলল, “যদি আবার এমন চিৎকার করো, আমি তোমাকে হত্যা করব, মুখ বন্ধ করতে ডাক্ট টেপ ব্যবহার করব।”’

তথ্যচিত্রে স্মার্ট আরও বলেন, ‘মিচেল ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে যা করছিল, সেটি ন্যায়সংগত দেখাত, কিন্তু মূলত সে ক্ষমতা ভালোবাসত। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভালোবাসত।’ স্মার্টকে দিনে কয়েকবার ধর্ষণ করা হতো, তারপর তিনি ৪৫ মিনিট প্রার্থনা করতেন।

‘কিডন্যাপড: এলিজাবেথ স্মার্ট’ -এর পোস্টার। নেটফ্লিক্স

উদ্ধার ও নতুন জীবন
প্রায় চার মাস পরে স্মার্টের বোন মেরি ক্যাথেরিন বুঝতে পারে, তাদের পরিচিতি একজনই তার বোনকে অপহরণ করেছে। পুলিশের সহায়তায় ও পরিবারের প্রচেষ্টায় ২০০৩ সালের ১২ মার্চ স্মার্টকে উদ্ধার করা হয়। তথ্যচিত্রটির পরিচালক বেনেডিক্ট স্যান্ডারসন বলেন, ‘স্মার্টের ১৪ বছর বয়সে তার নিজের মুক্তির প্রক্রিয়ায় যে আত্মনিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।’

মিচেল অপহরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হন এবং এখনো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাঁর স্ত্রী ওয়ান্ডা বারজিরও ১৫ বছরের জেল হয়েছে।

আরও পড়ুন

পুনরুদ্ধার, শিক্ষা ও দাতব্য কার্যক্রম
স্মার্ট উদ্ধার হওয়ার পর কিছুটা শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে জীবন শুরু করেন। ‘আমি পুরুষদের ভয় পেতাম। খুব লজ্জা অনুভব করতাম,’ তিনি স্মরণ করেন।
তবে স্মার্ট হাল ছাড়েননি। হাইস্কুল শেষ করার পর তিনি ব্রিঘাম ইয়াং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে ৩৮ বছর বয়সী স্মার্ট ইউটাহে তাঁর পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। তিনি বিবাহিত, তিন সন্তান আছে।

‘কিডন্যাপড: এলিজাবেথ স্মার্ট’ -এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

এ ছাড়া স্মার্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন এলিজাবেথ স্মার্ট ফাউন্ডেশন, যা যৌন সহিংসতার শিকারদের সহায়তা করে। তিনি দুটি আত্মজীবনী লিখেছেন। এ ছাড়া বক্তা হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অন্যদের সাহস জোগাচ্ছেন। তথ্যচিত্রের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, স্মার্ট নিজের শারীরিক ও মানসিক শক্তি আবার অর্জন করেছেন। তথ্যচিত্রটি শেষ হয় স্মার্টের একটি সংলাপ দিয়ে। তিনি বলেন, ‘যা ভাবছেন, আমি তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।’

টাইম অবলম্বনে