বোয়িংয়ের পতনের নেপথ্যে কি মুনাফার লোভ? তথ্যচিত্রে উঠে এল অনেক প্রশ্নের উত্তর
লায়ন এয়ার ও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে হুইসেলব্লোয়ার জন বার্নেটের মৃত্যু—বোয়িংয়ের নিরাপত্তা সংকটের অন্ধকার দিক নতুন করে সামনে এনেছে নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘ফ্রিফল: আ রেকনিং ফর বোয়িং’।
একসময় বোয়িং ছিল আকাশপথের নিরাপত্তা, প্রকৌশল দক্ষতা ও মার্কিন শিল্পসাফল্যের অন্যতম প্রতীক। বিমান বানানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ছিল এমন যে যাত্রীরা বিমানে ওঠার আগে বোয়িংয়ের নামটিই যেন একধরনের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ছবিতে ফাটল ধরেছে। মুনাফা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং শেয়ারহোল্ডারদের সন্তুষ্ট রাখার চাপ—এসব কি ধীরে ধীরে নিরাপত্তাকে পেছনে ঠেলে দিয়েছিল? নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘ফ্রিফল: আ রেকনিং ফর বোয়িং’ সেই প্রশ্নেরই অনুসন্ধান করেছে।
অস্কার মনোনীত নির্মাতা ররি কেনেডির পরিচালনায় তৈরি ৯৩ মিনিটের তথ্যচিত্রটি ১৯ আগস্ট নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে। এটি ২০২২ সালের ‘ডাউনফল: দ্য কেস এগেইনস্ট বোয়িং’–এর পরবর্তী কিস্তি। প্রথম ছবিতে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং সেগুলোর নেপথ্যে থাকা নিরাপত্তা ও করপোরেট সংস্কৃতির সংকট বিশ্লেষণ করেছিলেন কেনেডি। নতুন ছবিতে তিনি আরও বিস্তৃত পরিসরে বোয়িংয়ের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি, হুইসেলব্লোয়ারদের অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থার সংকট খতিয়ে দেখেছেন।
শুরু হয়েছিল দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা দিয়ে
২০১৮ সালের অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে বিধ্বস্ত হয় লায়ন এয়ারের ফ্লাইট ৬১০। এর মাত্র পাঁচ মাস পর ২০১৯ সালের মার্চে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩০২ বিধ্বস্ত হয়। দুটি বিমানই ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স। দুই দুর্ঘটনায় মোট ৩৪৬ জন নিহত হন। এরপর বিশ্বজুড়ে ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠে এবং বহরটি সাময়িকভাবে গ্রাউন্ডেড করা হয়।
এই দুর্ঘটনার পর বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে—নতুন মডেল বাজারে দ্রুত আনার প্রতিযোগিতা এবং খরচ কমানোর চাপে নিরাপত্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ‘ডাউনফল’ সেই অভিযোগগুলোরই অনুসন্ধান করেছিল।
কিন্তু প্রথম তথ্যচিত্র তৈরির পরও কেনেডির মনে হয়েছিল, গল্পটি শেষ হয়নি।
বরং ৭৩৭ ম্যাক্স আবার আকাশে ফেরার কিছুদিন পর বোয়িং নিয়ে নতুন নতুন নেতিবাচক খবর আসতে শুরু করে। কোম্পানিটি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেটিই তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। একই সময়ে বোয়িংয়ের ভেতর থেকে হুইসেলব্লোয়াররা কেনেডির সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন। তাঁদের দাবি, পরিস্থিতি ভালো হওয়ার বদলে কিছু ক্ষেত্রে আরও খারাপ হয়েছে।
তখনই দ্বিতীয়বারের মতো বোয়িংয়ের গল্পে ফিরলেন কেনেডি।
কেন আবার বোয়িং?
কেনেডির জন্য ‘ফ্রিফল’ নিছক একটি সিক্যুয়েল নয়। এটি তাঁর কাছে একটি অসমাপ্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা।
প্রথম ছবিটি শেষ করার সময় তাঁর ধারণা ছিল, বোয়িং হয়তো নিজের ভুল বুঝেছে এবং পরিবর্তনের পথে হাঁটবে। কিন্তু পরে বাস্তবতা তাঁকে সেই বিশ্বাস থেকে সরিয়ে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জন বার্নেটের মৃত্যু।
বার্নেট ছিলেন বোয়িংয়ের সাবেক কোয়ালিটি কন্ট্রোল কর্মকর্তা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন। ‘ডাউনফল’-এও তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। ফলে কেনেডির কাছে তিনি শুধু একজন সাক্ষাৎকারদাতা ছিলেন না, ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত পরিচিত ও বন্ধুও হয়ে উঠেছিলেন।
২০২৪ সালের মার্চে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে একটি মামলায় জবানবন্দি দেওয়ার সময় বার্নেটের মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ একটি গাড়ির ভেতর পাওয়া যায়। করোনারের সিদ্ধান্ত ছিল, তিনি আত্মঘাতী গুলিতে মারা গেছেন। তবে তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। কেনেডির কাছে ঘটনাটি এতটাই নাড়া দেয় যে তিনি আবার ক্যামেরা নিয়ে বোয়িংয়ের দিকে ফিরে তাকান।
কেনেডি জানিয়েছেন, বার্নেটের মৃত্যুই তাঁর জন্য নতুন ছবিটি করার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জন বার্নেট: এক হুইসেলব্লোয়ারের গল্প
‘ফ্রিফল’ আবেগের কেন্দ্রবিন্দু জন বার্নেট। তিনি বোয়িংয়ের দক্ষিণ ক্যারোলাইনার চার্লসটন কারখানায় কাজ করার সময় উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের নানা সমস্যা সামনে আনেন।
তাঁর অভিযোগ ছিল, বিমানের যন্ত্রাংশ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় এমন কিছু সমস্যা ছিল, যা উড়োজাহাজের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। কিন্তু এসব বিষয় কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার পর তিনি সমাধানের বদলে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন—এমনটাই ছবিতে উঠে এসেছে।
বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগের পর তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হয়েছিল বলে তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে। কেনেডির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হলেও এর ফলে বরং তিনি প্রতিষ্ঠানের আরও নানা অংশের ত্রুটি দেখতে পান।
শেষ পর্যন্ত অবসরের পর বার্নেট বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও করেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর ঘটনাই ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। কারণ, একজন হুইসেলব্লোয়ার যখন বছরের পর বছর নিজের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তারপর আইনি লড়াইয়ের মাঝপথে তাঁর মৃত্যু হয়—তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, একটি প্রতিষ্ঠান তার সমালোচকদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে?
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বার্নেটের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে সরকারি তদন্তে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনলাইনে নানা সন্দেহ ও ষড়যন্ত্র–তত্ত্ব ছড়ালেও সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। তাঁর মৃত্যু ঘিরে প্রশ্নগুলোর পাশাপাশি তথ্যচিত্রটি মূলত বোয়িংয়ের করপোরেট সংস্কৃতি ও হুইসেলব্লোয়ারদের অভিজ্ঞতার দিকে নজর দেয়।
বদলে গেল বোয়িংয়ের সংস্কৃতি?
একসময় বোয়িংয়ে প্রকৌশলী ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব ছিল অনেক। প্রতিষ্ঠানের পুরোনো সংস্কৃতিতে নিরাপত্তা ও নিখুঁত প্রকৌশলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া হুইসেলব্লোয়ারদের বক্তব্য অনুযায়ী, আধুনিক যুগে সেই সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
তাঁদের অভিযোগ—মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের গুরুত্ব কমতে থাকে, কর্মীদের ওপর চাপ বাড়ে, অভিজ্ঞতার বদলে দ্রুত উৎপাদন এবং খরচ কমানোর বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে বিমানের বিভিন্ন অংশ বাইরে থেকে কম খরচে তৈরি করানোর প্রবণতাও বাড়ে।
এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে ছবিতে বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনার প্রকল্পের কথা এসেছে।
২০০৯ সালে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার চার্লসটনে বোয়িং একটি কারখানা চালু করে। সেখানে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে ৭৮৭ তৈরি করার লক্ষ্য ছিল। বিমানের বড় একটি অংশ বিভিন্ন সরবরাহকারীর কাছ থেকে এনে সেখানে সংযোজন করা হতো। কিন্তু ছবিতে হুইসেলব্লোয়ারদের বক্তব্যের মাধ্যমে এমন কিছু ত্রুটির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা দেখে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
পাইপ ঠিকমতো না মেলা, বিমানের কাঠামোর অংশে ত্রুটি এবং এমনকি ছোট ধাতব কণার উপস্থিতির মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়—যাঁরা এসব বিমান তৈরি করছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ নিজেরাই সেই বিমানে উঠতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কেনেডির কাছে এটাই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী সতর্কসংকেত।
৭৮৭ ড্রিমলাইনারের ঘটনাও কি সতর্কবার্তা ছিল?
ড্রিমলাইনারকে বোয়িংয়ের আধুনিক প্রকৌশলের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু এর উৎপাদন ঘিরে যে সমস্যাগুলো সামনে আসে, সেগুলোও তথ্যচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০১৩ সালে ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের পুরো বহর সাময়িকভাবে গ্রাউন্ডেড করা হয়েছিল। বিমানের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে আগুন লাগার দুটি ঘটনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তথ্যচিত্রে পুরোনো ফুটেজ ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বোয়িংয়ের ভেতরের পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। এসব ফুটেজে কর্মীদের মধ্যে বিমানের নির্মাণমান নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এখানেই ছবিটির মূল প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়—যে প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থার জন্য বিমান তৈরি করে, তার ভেতরে যদি কর্মীরাই নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত থাকেন, তাহলে সমস্যাটি কি শুধু একটি যন্ত্রাংশের, নাকি পুরো ব্যবস্থার?
২০২৪ সালের দরজা খুলে যাওয়ার ঘটনা
বোয়িংয়ের সংকট শুধু পুরোনো গল্প নয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইনসের একটি ৭৩৭ ম্যাক্স ৯ উড্ডয়নের পর মাঝ আকাশে বিমানের পেছনের অংশের একটি দরজার প্লাগ খুলে যায়। ১৭১ জন যাত্রী তখন বিমানের ভেতরে ছিলেন। বিমানটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করলেও ঘটনাটি আবারও বোয়িংয়ের উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন তোলে।
ঘটনার তদন্তে দরজা ও ফিউজলাজের কিছু অংশ ঠিকভাবে সংযোজন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। তথ্যচিত্রটি দেখাতে চায়, ৭৩৭ ম্যাক্স দুর্ঘটনার পরও কেন একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ বারবার সামনে আসছে।
অর্থাৎ সমস্যা যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট বিমানের নকশায় সীমাবদ্ধ হতো, তাহলে হয়তো সেটি সংশোধন করেই সমাধান করা যেত। কিন্তু যখন একের পর এক ভিন্ন ঘটনায় উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন উঠে আসে, তখন বিষয়টি আর কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকে না। এটি হয়ে ওঠে করপোরেট সংস্কৃতির প্রশ্ন।
মুনাফা বনাম নিরাপত্তা
বোয়িং কি নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে? ছবিটি সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। হুইসেলব্লোয়ারদের বক্তব্যে উঠে আসে, উৎপাদন ব্যয় কমানো, দ্রুত বিমান বাজারে আনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের মূল্য বাড়ানোর চাপ কীভাবে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।
‘ফ্রিফল: আ রেকনিং ফর বোয়িং’–এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স‘ফ্রিফল: আ রেকনিং ফর বোয়িং’–এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স১৯৯৭ সালে ম্যাকডোনেল ডগলাসের সঙ্গে বোয়িংয়ের ১৪ বিলিয়ন ডলারের একীভবনকেও ছবিতে প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি বদলের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা হয়েছে। এরপর ব্যবস্থাপনায় এমন একটি ধারা শক্তিশালী হয়, যেখানে ব্যবসায়িক দক্ষতা ও আর্থিক ফলাফল ক্রমশ বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—তথ্যচিত্রের এসব অভিযোগ মূলত হুইসেলব্লোয়ার, সাবেক কর্মী ও নির্মাতার অনুসন্ধানের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। বোয়িং সব অভিযোগ স্বীকার করেনি।
বোয়িং কী বলছে?
তথ্যচিত্রে উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে বোয়িং জানিয়েছে, ছবিতে আলোচিত অনেক অভিযোগ আগেও প্রকাশ্যে এসেছে। কোম্পানির বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং কিছু বিষয়ে তারা ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে বা উন্নতির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
নতুন নেতৃত্বের অধীনে প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি বদলানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও বোয়িং দাবি করেছে।
এই বক্তব্যটিও তথ্যচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ Freefall শুধু বোয়িংকে অভিযুক্ত করে থেমে যায়নি; প্রতিষ্ঠানটি নিজের পক্ষে কী বলছে, সেটিও সামনে এনেছে।
দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর লড়াই
বোয়িংয়ের গল্পের সবচেয়ে মানবিক দিকটি এসেছে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর মাধ্যমে। একটি বিমান দুর্ঘটনার পর খবরের শিরোনাম কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ থাকে। কিন্তু যাঁরা প্রিয়জন হারান, তাঁদের জন্য সেই দুর্ঘটনা কখনো শেষ হয় না।
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের দুর্ঘটনায় স্বামী মাইক রায়ানকে হারানো নওয়াইসে কনোলি রায়ান তথ্যচিত্রে এমনই এক মুখ। তিনি শুধু ক্ষতিপূরণের জন্য নয়, দায়বদ্ধতার দাবিতেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তথ্যচিত্রে তাঁকে অন্য স্বজন ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মার্কিন সিনেটের শুনানিতে দেখা যায়।
তাঁর লড়াইয়ের একটি বড় প্রশ্ন—কোনো কোম্পানি যদি নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য মানুষের জীবন হারানোর পরও কেবল অর্থনৈতিক জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায়?
শুধু বোয়িংয়ের গল্প নয়
ররি কেনেডির তথ্যচিত্রটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তথ্যচিত্র নয়। এটি বড় করপোরেশন কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজের মূল মূল্যবোধ হারাতে পারে, তারও একটি অনুসন্ধান।
একসময় যে প্রতিষ্ঠান প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত, সেটিই যদি উৎপাদনের গতি, খরচ কমানো ও শেয়ারমূল্যের দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে—বোয়িংয়ের ঘটনাগুলো সেই প্রশ্ন সামনে আনে।
আর এ কারণেই ছবিতে হুইসেলব্লোয়ারদের গুরুত্ব এত বেশি। তাঁরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের মানুষ। বাইরে থেকে কোনো দুর্ঘটনা দেখা যায়, কিন্তু ভেতরে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কীভাবে অভিযোগ চাপা পড়ে বা কোনো কর্মীকে চুপ করানোর চেষ্টা হয়—সেসব জানার সুযোগ তাঁদেরই বেশি।
‘ফ্রিফল’ নামের তাৎপর্য
ছবিটির নাম ‘ফ্রিফল’—অর্থাৎ মুক্তপতন। নামটি শুধু আকাশ থেকে একটি বিমানের পতনকে বোঝায় না; এটি বোয়িংয়ের দীর্ঘদিনের সুনাম, নিরাপত্তার সংস্কৃতি এবং জনআস্থার পতনের প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।
বোয়িং একসময় ছিল আমেরিকান শিল্পসাফল্যের প্রতীক। কিন্তু ৭৩৭ ম্যাক্সের দুটি দুর্ঘটনা, ড্রিমলাইনারের নানা সমস্যা, ২০২৪ সালের আলাস্কা এয়ারলাইনসের ঘটনা এবং হুইসেলব্লোয়ারদের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সেই ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত এসেছে।
আর ররি কেনেডির প্রশ্নটি খুব সরল: এত কিছুর পরও কি যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে?
ছবিটির নির্মাতা মনে করেন, উত্তর এখনো পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। নতুন তথ্যচিত্রের উদ্দেশ্য তাই বোয়িংকে অতীতের জন্য শুধু কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়; বরং ভবিষ্যতে বিমানশিল্পে নিরাপত্তা কীভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপরে রাখা যায়, সেই আলোচনাকে সামনে আনা।
শেষ পর্যন্ত দায় কার?
তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হয়তো এটিই—একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দায় কি শুধু একজন-দুজন কর্মকর্তার?
কেনেডির অনুসন্ধান বলছে, সমস্যাটি আরও গভীরে। ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সংস্কৃতি, উৎপাদনব্যবস্থা, খরচ কমানোর নীতি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং হুইসেলব্লোয়ারদের সঙ্গে আচরণ—সবকিছু মিলেই একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি হয়।
তাই একজনকে সরিয়ে বা একজন নতুন প্রধান নির্বাহী নিয়োগ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না।
কারণ, বিমানশিল্পে ভুলের মূল্য অন্য অনেক ব্যবসার চেয়ে আলাদা। একটি সফটওয়্যারের ভুলে অ্যাপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, একটি গাড়ির ত্রুটিতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে; কিন্তু একটি বিমানের নিরাপত্তা ব্যর্থতা এক মুহূর্তে শত শত মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
এ কারণেই তথ্যচিত্রটি শুধু বোয়িংয়ের অতীত নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নয়। এটি এমন এক সতর্কবার্তা, যেখানে প্রশ্ন করা হয়েছে—ব্যবসায়িক সাফল্যের দৌড়ে নিরাপত্তাকে যদি একবার দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই পতন কোথায় গিয়ে থামবে?
ররি কেনেডির ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। তিনি বোয়িংয়ের গল্পকে কেবল একটি কোম্পানির সংকট হিসেবে দেখেননি; দেখিয়েছেন, করপোরেট জগতে মুনাফা আর জনস্বার্থের সংঘাত কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
টাইম অবলম্বনে