ক্ষমতার অন্ধকার দিক উঠে এল যে সিরিজে, বিশ্বজুড়ে আলোচনা

‘মেড ইন কোরিয়া’র দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি

ডিজনি প্লাসের নতুন সিরিজ ‘মেড ইন কোরিয়া’ দর্শককে নিয়ে যায় ১৯৭০–এর দশকের দক্ষিণ কোরিয়ার অন্ধকার অধ্যায়ে—যে সময়টিকে পরিচালক উ মিন–হো নিজেই আখ্যা দিয়েছেন ‘বর্বরতার যুগ’ হিসেবে। মুক্তির পর থেকেই সিরিজটি নিয়ে চলছে বিশ্বজুড়ে আলোচনা।

বাস্তব ঘটনা ও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছায়ায় নির্মিত ছয় পর্বের এই ড্রামা সিরিজে মুখোমুখি করা হয়েছে দুই বিপরীত মেরুর মানুষকে। একদিকে আছেন বেক কি–তাই (হিউন বিন), যিনি অর্থ ও ক্ষমতার লোভে কোনো কিছুতেই থামতে চান না। অন্যদিকে জাং গন–ইয়ং (জং উ–সুং), একগুঁয়ে ও আদর্শবাদী কৌঁসুলি, যিনি যে করেই হোক বেক কি–তাইকে আইনের আওতায় আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

পরিচালক উ মিন–হোর উদ্দেশ্য ছিল দেখানো—ক্ষমতার প্রতি অন্ধ লালসা ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা কীভাবে একজন মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধীরে ধীরে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক দানবে রূপ দেয়। সিউলে দ্য কোরিয়া টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার প্রকৃত অর্থ কী এবং মানুষ ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর এত দ্রুত কেন বদলে যায়—এই প্রশ্নটাই আমি বারবার তুলতে চেয়েছি। নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেওয়ার চেয়ে চরিত্রগুলোর মাধ্যমে ইতিহাস কীভাবে বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে, সেটাই দেখাতে চেয়েছি।’

‘মেড ইন কোরিয়া’র দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি

গত ডিসেম্বরে প্রচার শুরু হওয়ার সিরিজটির প্রথম মৌসুম শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে। কোরিয়ার দ্রুত রূপান্তরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরতে কোনো রাখঢাক করেননি নির্মাতা। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, মাদক পাচার, সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায় গল্প—একটি অশান্ত সময়ের বিশৃঙ্খলা দর্শকের সামনে স্পষ্ট করে তোলে।

‘ইনসাইড মেন’ (২০১৫), ‘দ্য ম্যান স্ট্যান্ডিং নেক্সট’ (২০২০) ও ‘হারবিন’ (২০২৪)–এর মতো আলোচিত ছবির পরিচালক উ মিন–হোর জন্য এটি প্রথম সিরিজ নির্মাণ। তাঁর মতে, গল্পের ব্যাপ্তির কারণেই সিরিজ ফরম্যাট বেছে নিতে হয়েছে। ‘একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ পৃষ্ঠার হয়। কিন্তু এখানে ছিল ছয়টি পূর্ণাঙ্গ স্ক্রিপ্ট। দুই ঘণ্টার ছবিতে এই গল্প বলা সম্ভব ছিল না,’ বলেন তিনি।

১৯৭০–এর দশককে পটভূমি হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উ মিন–হো বলেন, এই সময়টাই আধুনিক কোরিয়ার গতিশীল অথচ বিশৃঙ্খল শক্তির উৎস। তিনি ১৯৭০ সালের ইয়োদোগো বিমান ছিনতাইয়ের মতো বাস্তব ঘটনাও গল্পে ব্যবহার করেছেন। সে সময়কার একটি অপরাধস্থলের ছবি—যেখানে মা–বাবার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশু—তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
পরিচালক বলেন, ‘এই ছবিটাই বর্বরতার যুগের প্রতীক। তখন ক্ষমতাবানেরা যা খুশি করতে পারত, আর সাধারণ মানুষকে তার মূল্য দিতে হতো।’

‘মেড ইন কোরিয়া’র দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি

সিরিজের নাম ‘মেড ইন কোরিয়া’–তেও আছে গভীর প্রতীকী অর্থ। উ মিন–হোর ব্যাখ্যায়, এই নামটি আসলে সেই ‘দানবদের’ ইঙ্গিত করে, যাদের জন্ম দিয়েছে ওই সময়ের সামাজিক–রাজনৈতিক বাস্তবতা।

উ মিন-হো বলেন, ‘আমি চেয়েছি দর্শক বেক কি–তাইয়ের আকাঙ্ক্ষার ট্রেনে চড়ুক—ঠিক যেমন মানুষ দ্য গডফাদার–এ আল পাচিনোর চরিত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। এই চরিত্রের জন্য হিউন বিন নিজ উদ্যোগে ১৫ কেজি ওজন বাড়িয়েছেন। আমার আগের ছবিতে জাতীয় নায়ক থেকে এখানে তাঁর লোভী খলনায়কে রূপান্তর আমাকে ভীষণ তৃপ্তি দিয়েছে।’

জাং গন–ইয়ং চরিত্রে জং উ–সুংয়ের অভিনয় নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। কেউ কেউ তাঁর অতিরঞ্জিত হাসি ও চরিত্রায়নকে অস্বস্তিকর মনে করেছেন। তবে পরিচালক জানান, এই সিদ্ধান্ত ছিল সচেতনভাবেই নেওয়া।

আরও পড়ুন

‘ওই জোরে হাসি আসলে তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা—একজন মানুষের, যার পরিবার ভেঙে গেছে এক ভয়াবহ অতীতের কারণে,’ বলেন উ মিন–হো। ‘দর্শকের প্রতিক্রিয়াকে আমি সম্মান করি। নির্মাতা হিসেবে আমাদের শুনতে হয়, অজুহাত দেওয়া নয়,’ বলেন এই নির্মাতা।

‘মেড ইন কোরিয়া’র দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি

পরিচালক নিশ্চিত করেছেন, তিনি ইতিমধ্যে দ্বিতীয় মৌসুমের কাজ শুরু করেছেন। চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে নতুন এই মৌসুমের, যার গল্প এগোবে ১৯৭৯ সালে—প্রথম মৌসুমের ঘটনাপ্রবাহের নয় বছর পর।

উ মিন–হোর ভাষায়, ‘দ্বিতীয় মৌসুমে দেখানো হবে, এই চরিত্রগুলো শেষ পর্যন্ত কীভাবে ভেঙে পড়ে। দর্শক বেক কি–তাইয়ের আকাঙ্ক্ষার উন্মত্ততা অনুভব করবে, আর দেখবে সেই ট্রেন কীভাবে শেষ পর্যন্ত লাইনচ্যুত হয়—এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত মূল্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে।’

কোরিয়া টাইমস অবলম্বনে