আবির্ভাবেই বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে যায়, কে এই রিচার
তাঁর নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। আজ এ শহর তো কাল অন্য শহর। একটি ছোট ব্যাগ, কয়েকটি পোশাক আর সামান্য কিছু টাকা নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়ান। তবে তিনি ঠিক হিমু নন। আগে ছিলেন মিলিটারি পুলিশের মেজর। অবসর নিয়ে বেছে নিয়েছেন ভবঘুরে জীবন। নিজের গাড়ি-বাড়ি নেই, ফোনও সেভাবে ব্যবহার করেন না। এ শহর, ও শহর ঘুরে বেড়ান। মন না টিকলে চড়ে বসেন বাসে, গন্তব্য নতুন শহর। কখনো হিচহাইকিং করেন। তবে তাঁর জীবন নির্বিবাদ নয়, মাঝেমধ্যেই জড়িয়ে পড়েন বড়সড় ঝামেলায়। এসব ঝামেলার পেছনে কখনো থাকে তাঁর ‘অতীত জীবন’। তিনি রিচার, মেজর জ্যাক রিচার। তাঁকে নিয়ে নির্মিত সিরিজ ‘রিচার’-এর চতুর্থ মৌসুমের প্রথম তিন পর্ব মুক্তি পেয়েছে ১২ আগস্ট। মুক্তির পরই অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর সিরিজটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। প্রথম মৌসুম এসেছিল ২০২২ সালে, চার বছরেই চার মৌসুম; সিরিজটির জনপ্রিয়তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু কে এই রিচার? কেন সিরিজটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত আলোচনা?
টম ক্রুজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অন্যতম বড় ব্যর্থতা চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে না পারা। লেখক লি চাইল্ড অবশ্য মনে করেন, এ চরিত্রে তাঁকে নির্বাচনই ছিল বড় ভুল। কারণ, প্রায় সাড়ে ছয় ফুটের দীর্ঘদেহী রিচারের সঙ্গে টমের কোনো মিলই নেই। তাই টম ক্রুজ অভিনীত ‘জ্যাক রিচার’ ও ‘রিচার নেভার গো ব্যাক’ যখন ডাহা ফ্লপ হয়, তখন এ চরিত্র অবলম্বনে সিনেমা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখনই এগিয়ে আসে অ্যামাজন।
বইয়ের পাতা থেকে
ব্রিটিশ লেখক লি চাইল্ডের উপন্যাসের চরিত্র জ্যাক রিচার। জনপ্রিয় এ চরিত্র নিয়ে এ পর্যন্ত ৩০টির মতো উপন্যাস লিখেছেন চাইল্ড। এ সিরিজ উপন্যাস অবলম্বনেই নির্মিত হয়েছে অ্যামাজনের সিরিজটি।
লি চাইল্ড ১৯৯৭ সালে প্রকাশ করেন ‘কিলিং ফ্লোর’। সেটিই জ্যাক রিচারকে নিয়ে প্রথম উপন্যাস। সাবেক এই মার্কিন সেনা কর্মকর্তাকে চাকরি ছাড়ার পর দেখা যায় এক ভবঘুরে মানুষের জীবনে। তিনি কোনো বাড়ি কিনতে চান না, গাড়ি রাখেন না, স্থায়ী চাকরি করেন না। শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়ান। কিন্তু যেখানে যান, সেখানেই কোনো না কোনো রহস্য তাঁকে জড়িয়ে ফেলে।
এ চরিত্রের মধ্যে প্রচলিত গোয়েন্দা চরিত্রের সঙ্গে অ্যাকশন নায়কের মিশেল ছিল। রিচার যেমন মাথা খাটিয়ে রহস্যের সমাধান করেন, তেমনি প্রয়োজন হলে নিজের বিশাল শারীরিক শক্তি ব্যবহার করতেও পিছপা হন না। চাইল্ডের বইয়ের রিচার ছিলেন পাঠকের কল্পনায় প্রায় পৌরাণিক এক চরিত্র—লম্বা, শক্তিশালী, ভয়ংকর বুদ্ধিমান এবং নিজের ন্যায়বোধে অটল।
অ্যামাজনও পরে জানিয়েছে, সিরিজটির প্রতিটি মৌসুম মূলত লি চাইল্ডের একটি উপন্যাসকে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। ফলে প্রতিটি মৌসুমে রিচারের সামনে নতুন শহর, নতুন রহস্য, নতুন চরিত্র এবং নতুন বিপদ আসে।
টম ক্রুজ এলেন, বিতর্কও এল
বইয়ের জনপ্রিয়তার পর বড় পর্দায় রিচারকে আনার উদ্যোগ নেয় হলিউড। ২০১২ সালে টম ক্রুজ অভিনীত ‘জ্যাক রিচার’ মুক্তি পায়। পরে ২০১৬ সালে আসে ‘জ্যাক রিচার: নেভার গো ব্যাক’।
ক্রুজের তারকাখ্যাতি ও অ্যাকশনের দক্ষতা থাকলেও একটি জায়গায় আপত্তি ছিল বইয়ের ভক্তদের। রিচার চরিত্রটি লি চাইল্ডের বইয়ে বিশালদেহী মানুষ। অথচ ক্রুজ তুলনামূলকভাবে ছোটখাটো গড়নের অভিনেতা। অর্থাৎ চরিত্রের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অভিনেতার বড় পার্থক্য ছিল।
টম ক্রুজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অন্যতম বড় ব্যর্থতা চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে না পারা। লেখক লি চাইল্ড অবশ্য মনে করেন, এ চরিত্রে তাঁকে নির্বাচনই ছিল বড় ভুল। কারণ, প্রায় সাড়ে ছয় ফুটের দীর্ঘদেহী রিচারের সঙ্গে টমের কোনো মিলই নেই। তাই টম ক্রুজ অভিনীত ‘জ্যাক রিচার’ ও ‘রিচার নেভার গো ব্যাক’ যখন ডাহা ফ্লপ হয়, তখন এ চরিত্র অবলম্বনে সিনেমা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখনই এগিয়ে আসে অ্যামাজন।
প্রথম মৌসুম মুক্তির পর বোঝা গেল, অ্যামাজন বড় কিছু পেয়ে গেছে। নিলসেনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির প্রথম তিন দিনে ‘রিচার’ দেখা হয়েছিল প্রায় ১ দশমিক ৮৪৩ বিলিয়ন মিনিট। আট পর্বের পুরো মৌসুম একসঙ্গে মুক্তি পেয়েছিল তখন। প্রথম পূর্ণ সপ্তাহেও সিরিজটি প্রায় ১ দশমিক ৫১৯ বিলিয়ন মিনিট দেখা হয়। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে দর্শকসংখ্যা বোঝার পদ্ধতি সিনেমা হলের মতো নয়। তাই ‘কতজন মানুষ দেখেছেন’-এর বদলে নিলসেনের মিনিট-ভিত্তিক হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সে হিসাবেই ‘রিচার’ দ্রুত অ্যামাজনের সবচেয়ে বড় হিটগুলোর একটি হয়ে যায়।
অ্যালান রিচসনের হাতে বদলে গেল সব
২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পায় ‘রিচার’-এর প্রথম মৌসুম। প্রথম মৌসুমের গল্প নেওয়া হয়েছিল চাইল্ডের প্রথম উপন্যাস ‘কিলিং ফ্লোর’ থেকে। জর্জিয়ার ছোট শহর মারগ্রেভে গিয়ে রিচার হঠাৎ খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি হয়, কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, শহরের ভেতর লুকিয়ে আছে বড় ধরনের দুর্নীতির জাল। পুলিশ, রাজনীতি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত লোকজন এই ষড়যন্ত্রের অংশ।
সিরিজটির নির্মাতা নিক স্যান্টোরার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল, তিনি রিচারকে শুধু ‘মারধর করা মানুষ’ হিসেবে দেখাননি। তাঁর রিচার পর্যবেক্ষণ করেন, হিসাব করেন, প্রশ্ন করেন এবং তারপর আঘাত করেন। আর অ্যালান রিচসন চরিত্রটির শারীরিক দিকটি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তুললেন যে বইয়ের অনেক পাঠক মনে করলেন, এই তো সেই রিচার, যাঁকে তাঁরা এত দিন কল্পনা করেছেন।
অ্যামাজনের তথ্য অনুযায়ী, রিচসনের উচ্চতা ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ২৪০ পাউন্ড। তবে শুধু শরীর দিয়ে তো একটি সিরিজ টেকে না। ‘রিচার’-এর সাফল্যের বড় রহস্য ছিল—বুদ্ধি ও পেশিশক্তির সমন্বয়।
প্রথম মৌসুমেই রেকর্ড
প্রথম মৌসুম মুক্তির পর বোঝা গেল, অ্যামাজন বড় কিছু পেয়ে গেছে। নিলসেনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির প্রথম তিন দিনে ‘রিচার’ দেখা হয়েছিল প্রায় ১ দশমিক ৮৪৩ বিলিয়ন মিনিট। আট পর্বের পুরো মৌসুম একসঙ্গে মুক্তি পেয়েছিল তখন। প্রথম পূর্ণ সপ্তাহেও সিরিজটি প্রায় ১ দশমিক ৫১৯ বিলিয়ন মিনিট দেখা হয়। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে দর্শকসংখ্যা বোঝার পদ্ধতি সিনেমা হলের মতো নয়। তাই ‘কতজন মানুষ দেখেছেন’-এর বদলে নিলসেনের মিনিট-ভিত্তিক হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সে হিসাবেই ‘রিচার’ দ্রুত অ্যামাজনের সবচেয়ে বড় হিটগুলোর একটি হয়ে যায়।
দ্বিতীয় মৌসুমে আরও বড় বিস্ফোরণ
প্রথম মৌসুমের সাফল্যের পর ২০২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর আসে দ্বিতীয় মৌসুম। এবার গল্প ‘ব্যাড লাক অ্যান্ড ট্রাবল’ উপন্যাস থেকে। রিচারের সাবেক সামরিক ইউনিট ১১০তম স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের সদস্যরা একে একে খুন হতে থাকেন। রহস্যের সমাধানে রিচার আবারও নিজের পুরোনো সহযোদ্ধাদের কাছে ফিরে যান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফ্রান্সেস নিগলি, যিনি পরবর্তী সময়ে রিচার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠেন।
দ্বিতীয় মৌসুমের প্রথম তিন পর্ব মুক্তির পর অ্যামাজনের জন্য আরও বড় সুখবর আসে। ওই তিন পর্ব প্রথম তিন দিনে প্রথম মৌসুমের পুরো দর্শকসংখ্যাকে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে ‘রিচার’ বিশ্বব্যাপী প্রাইম ভিডিওর ২০২৩ সালের সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজ ও চলচ্চিত্রের শিরোপা পায়। এখান থেকেই ‘রিচার’ আর শুধু সফল সিরিজ নয়; অ্যামাজনের গুরুত্বপূর্ণ ফ্র্যাঞ্চাইজি হয়ে ওঠে।
তৃতীয় মৌসুমে আরও বড় সংখ্যা
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আসে তৃতীয় মৌসুম। এবার ভিত্তি লি চাইল্ডের সপ্তম রিচার উপন্যাস ‘পার্সুয়েডার’। গল্পে রিচারকে একটি অপরাধী চক্রের ভেতরে ঢুকে এক গোপন ডিইএ তথ্যদাতাকে উদ্ধার করতে হয়। পাশাপাশি তাঁর নিজের অতীতও ফিরে আসে।
এই মৌসুমের সাফল্যের পর অ্যামাজন জানায়, প্রথম ১৯ দিনে বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি ৪৬ লাখ দর্শক তৃতীয় মৌসুম দেখেছেন। এর ৫৬ শতাংশ দর্শক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের। যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ব্রাজিলে সিরিজটির বিশেষ সাফল্য দেখা যায়। একই সময়ে এটি ‘ফলআউট’-এর পর প্রথম মৌসুমের পর ওই সময়সীমায় প্রাইম ভিডিওর সবচেয়ে বেশি দেখা টেলিভিশন মৌসুম হয়ে ওঠে।
এমনকি চতুর্থ মৌসুম মুক্তির আগেই পঞ্চম মৌসুমের অনুমোদন দিয়ে দেয় অ্যামাজন। অর্থাৎ ‘রিচার’ এখন আর এক মৌসুমের পর ভাগ্য পরীক্ষার সিরিজ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি ফ্র্যাঞ্চাইজি।
কেন এত জনপ্রিয় ‘রিচার’
এর উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি কারণ সামনে আসে। রিচার জটিল মানুষ নন। তিনি জানেন অন্যায় হলে কী করতে হবে। তাঁর নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার। বাস্তব জীবনে যেখানে ভালো-মন্দের সীমারেখা অনেক সময় ধূসর, রিচারের জগতে তা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। ফলে দর্শক তাঁর সঙ্গে সহজেই একাত্ম হতে পারেন।
প্রতিটি মৌসুমে রিচারের অতীত সম্পর্কে নতুন কিছু জানা যায়। কিন্তু পুরোপুরি জানা যায় না। তিনি কোথা থেকে এসেছেন? কেন এমন জীবন বেছে নিয়েছেন? কেন মানুষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করেন না? কেন সব সময় একা থাকতে চান? এ প্রশ্নগুলো চরিত্রটির প্রতি কৌতূহল ধরে রাখে।
‘রিচার’-এ মারামারি আছে। গুলি আছে। ধাওয়া আছে। খুন আছে। কিন্তু প্রতিটি অ্যাকশন দৃশ্যের আগে সাধারণত একটি তদন্ত থাকে। রিচার আগে প্রতিপক্ষকে বোঝেন, তারপর আঘাত করেন। এ কারণে সিরিজটি একই সঙ্গে গোয়েন্দা গল্প ও অ্যাকশন সিরিজের দর্শককে ধরে রাখতে পারে।
‘রিচার’-এর আরেকটি সুবিধা হলো, দর্শককে আগের মৌসুমের সব চরিত্র মনে রাখার চাপ নেই।
এক মৌসুমে ছোট শহর, পরের মৌসুমে সাবেক সেনাসদস্যদের হত্যার রহস্য, তৃতীয় মৌসুমে অপরাধী চক্র—প্রতিবারই নতুন গল্প।
ফলে সিরিজটি অনেকটা অ্যানথোলজি সিরিজের মতো নতুন করে শুরু হতে পারে। অ্যামাজনও জানিয়েছে, প্রতিটি মৌসুমে একটি করে বই অবলম্বন করা হয়।
এবার চতুর্থ মৌসুম
এবারের মৌসুমটি লি চাইল্ডের ২০০৯ সালের ‘গন টুমরো’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি। এটি ‘রিচার’ সিরিজের ১৩তম বই। তবে টেলিভিশন সংস্করণে কাহিনির পটভূমিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বইয়ের গল্প নিউইয়র্ককে কেন্দ্র করে হলেও সিরিজে ঘটনাস্থল হয়েছে ফিলাডেলফিয়া।
গল্প শুরু হয় পাতালরেলে। রিচার এক বিপর্যস্ত নারীকে দেখতে পান। আচরণে মনে হয়, তিনি হয়তো আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন কিংবা বড় কোনো বিপদের সঙ্গে যুক্ত। রিচার তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এরপর ঘটে ভয়ংকর ঘটনা; ওই নারী আত্মহত্যা করেন। ঘটনাটির শেষ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই তদন্তকারীদের নজরে আসেন রিচার। কিন্তু বিষয়টি নিছক আত্মহত্যা নয়। নারীর কাছে থাকা তথ্য, একটি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ এবং তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো ধীরে ধীরে একটি বড় ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করতে থাকে।
চতুর্থ মৌসুমে অ্যালান রিচসনের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন সিডেল নোয়েল, ক্রিস্টোফার রদ্রিগেজ-মারকেট, কেভিন করিগ্যান, মার্ক ব্লুকাস, ক্যাথলিন রবার্টসন এবং ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় গায়িকা-অভিনেত্রী অ্যাগনেজ মো। অ্যাগনেজ মো অভিনয় করছেন লিলা হথ চরিত্রে। ইন্দোনেশিয়ায় সংগীতশিল্পী হিসেবে বিপুল পরিচিতি থাকলেও ‘রিচার’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে তাঁর অভিনয় নতুন করে নজর কেড়েছে।
এবারের মৌসুমের আরেকটি আকর্ষণ হলো সাংবাদিক রাসেল প্লাম চরিত্র। তিনি তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খুলে দেন। আর পুলিশি তদন্তের ভেতর দিয়ে তামারা গ্রিনের চরিত্রটিও ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ আগের কয়েকটি মৌসুমের মতো এবারও রিচারের চারপাশে একদল নতুন মানুষ। তবে পার্থক্য হলো—কেউই পুরোপুরি বন্ধু নয়, আবার সবাই শত্রুও নয়।
এবার কি আরও বেশি অ্যাকশন
অ্যালান রিচসন জানিয়েছেন, চতুর্থ মৌসুমে লড়াইয়ের দৃশ্যের পরিমাণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে দর্শকের জন্য পরিচিত ‘রিচার-ফর্মুলা’ এবার আরও বড় পরিসরে ফিরেছে। তবে প্রথম তিন পর্বে একটি বিষয় স্পষ্ট—এবার গল্পের রহস্যের অংশটি বেশ ঘন।
সরকারি গোপন তথ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতা, পরিচয় গোপন করা, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা এবং একটি মৃত নারীর রেখে যাওয়া সূত্র—সব মিলিয়ে চতুর্থ মৌসুমের গল্প আগের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক ও ষড়যন্ত্রনির্ভর। আর রিচারকে এবার শুধু পেশিশক্তি দিয়ে নয়, তথ্যের লড়াইয়েও জিততে হবে।
চতুর্থ মৌসুম মোট আটটি পর্বের। ১২ আগস্ট প্রথম ৩টি পর্ব একসঙ্গে মুক্তি পেয়েছে। এরপর প্রতি বুধবার একটি পর্ব আসবে। শেষ পর্ব মুক্তি পাওয়ার কথা ১৬ সেপ্টেম্বর।
শেষ পর্যন্ত কেন রিচার এত আলাদা
অ্যাকশন সিরিজের অভাব নেই। গোয়েন্দা সিরিজও কম নেই। কিন্তু ‘রিচার’-এর সাফল্য এসেছে দুটির মাঝামাঝি জায়গা থেকে। এখানে নায়ক একই সঙ্গে গোয়েন্দা, সৈনিক, ভবঘুরে এবং প্রতিশোধপরায়ণ ন্যায়বিচারক। তাঁর কোনো স্থায়ী ঘর নেই, তাই হারানোর ভয়ও কম। তিনি কারও কাছে জবাবদিহি করেন না। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার।
এ চরিত্রের মধ্যেই দর্শকের একধরনের কল্পিত স্বাধীনতা আছে, যে স্বাধীনতা বাস্তব জীবনে খুব সহজে পাওয়া যায় না। রিচার যেখানে যান, সেখানেই সমস্যা খুঁজে পান। তারপর সমস্যার মূল খুঁজে বের করেন। আর শেষে নিজের মতো করে বিচার করেন। সূত্রটি সহজ। কিন্তু ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে অত্যন্ত কার্যকর। প্রথম মৌসুমের ১ দশমিক ৮৪৩ বিলিয়ন মিনিট থেকে তৃতীয় মৌসুমের ৫ কোটি ৪৬ লাখ বৈশ্বিক দর্শক—সংখ্যাগুলোই বলে দেয়, সেই সূত্র কাজ করেছে।
এখন চতুর্থ মৌসুমের প্রথম তিন পর্ব মুক্তির পর নতুন প্রশ্ন—রিচার কি আবারও আগের সাফল্য ধরে রাখতে পারবেন?
রিচারের ছায়া থেকে নিজের গল্পে নেগলি
‘রিচার’ সিরিজে জ্যাক রিচারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষদের একজন ফ্রান্সেস নেগলি। বিপদে পড়লেই রিচার যাঁর ওপর ভরসা করেন, সেই নেগলিকে এবার দেখা যাবে নিজের সিরিজে। মারিয়া স্টেন অভিনীত ‘নেগলি’ মুক্তি পাচ্ছে ১৬ সেপ্টেম্বর।
একজন মানুষকে আপনি যতই একা ভাবুন, তাঁর জীবনে এমন একজন মানুষ থাকতেই পারেন, যাঁর কাছে প্রয়োজনে ফিরে যাওয়া যায়। জ্যাক রিচারের জীবনে সেই মানুষ ফ্রান্সেস নেগলি। রিচারকে সাধারণত একা চলা মানুষ হিসেবেই দেখা যায়। কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, সংসার নেই, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বও খুব বেশি নেই। শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়ান। অন্যায় দেখলে জড়িয়ে পড়েন, রহস্যের সমাধান করেন, অপরাধীদের শাস্তি দেন, তারপর আবার চলে যান।
কিন্তু নেগলির ক্ষেত্রে গল্পটা আলাদা। তিনি রিচারের পুরোনো সহযোদ্ধা। দুজনই মার্কিন সেনাবাহিনীর ১১০তম স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন ইউনিটে কাজ করেছেন। তাঁদের সম্পর্কের ভিত্তি রোমান্স নয়, বন্ধুত্বের প্রচলিত আবেগও নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা। রিচার জানেন, নিগলি তাঁকে বুঝতে পারেন। আর নিগলি জানেন, রিচারকে যখন সত্যিই প্রয়োজন হবে, তখন তাঁকে পাওয়া যাবে।
‘রিচার’ সিরিজের এই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটিই এবার নিজের গল্পের নায়ক। তাঁর নামেই অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর নতুন স্পিন-অফ সিরিজ—‘নেগলি’। সিরিজটির প্রধান চরিত্রে থাকছেন মারিয়া স্টেন। মুক্তি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। প্রথম মৌসুমে থাকছে আটটি পর্ব।
ফ্রান্সেস নেগলির সঙ্গে ‘রিচার’–এর দর্শকের পরিচয় প্রথম মৌসুমেই। মারিয়া স্টেন অভিনীত চরিত্রটি তখনই বোঝা যায়—এই নারী রিচারের মতোই নিজের জগতে চলতে অভ্যস্ত। শুধু পার্থক্য হলো, রিচার ভবঘুরে। নিগলি নিজের জীবনকে একটু বেশি গোছানো রেখেছেন।
‘রিচার’-এর প্রথম মৌসুমে নেগলি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সহকারী চরিত্র। দ্বিতীয় মৌসুমে তাঁর গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। কারণ, গল্পে রিচারের পুরোনো সামরিক ইউনিটের সদস্যরা একে একে খুন হতে থাকেন। নেগলিই রিচারকে খবর দেন। এরপর পুরোনো দলের সদস্যদের একত্র করে রহস্যের জট খুলতে শুরু করেন তাঁরা।
অ্যামাজন ও স্কাইড্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মৌসুমের মূল গল্পই রিচারের পুরোনো ১১০তম ইউনিটের সদস্যদের ঘিরে। সেখানে নেগলি অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র।
ফ্রান্সেস নিগলি শুধু টেলিভিশনের চরিত্র নন। তিনি লি চাইল্ডের ‘রিচার’ উপন্যাসেও আছেন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। বইয়ে নেগলির উপস্থিতি টেলিভিশন সংস্করণের তুলনায় অনেক বেশি সীমিত। কিন্তু ‘রিচার’ সিরিজের নির্মাতারা চরিত্রটিকে এমনভাবে সম্প্রসারিত করেছেন যে তিনি এখন মূল সিরিজের সবচেয়ে পরিচিত পার্শ্বচরিত্রগুলোর একজন।
টিভি সংস্করণে এ পরিবর্তনের পেছনে মারিয়া স্টেনের অভিনয়ও বড় কারণ। নেগলির মধ্যে তিনি এমন এক ধরনের দৃঢ়তা এনেছেন, যেখানে চরিত্রটি কখনো রিচারের নারী সংস্করণ হয়ে ওঠে না; বরং নিজের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়ায়।
নতুন সিরিজে নেগলি আর রিচারের সহযাত্রী নন। এবার তিনি নিজেই একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। অ্যামাজনের আনুষ্ঠানিক বিবরণ অনুযায়ী, নেগলি শিকাগোতে ব্যক্তিগত তদন্তকারী হিসেবে কাজ করেন। হঠাৎ খবর পান, তাঁর অতীতের এক প্রিয় বন্ধু সন্দেহজনক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। কিন্তু নেগলি ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। সেখান থেকেই শুরু হয় তদন্ত।
আর তদন্ত যত এগোয়, ততই তিনি আবিষ্কার করেন—বন্ধুর মৃত্যুর পেছনে এমন কিছু আছে, যা শুধু ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, আরও বড় একটি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত।
আইএমডিবি, ভ্যারাইটি ও কোলাইডার অবলম্বনে