শাকিব, সিয়াম, নিশো থেকে রাজ—ঈদের সিনেমা দিয়ে কে এগিয়ে যাবেন

‘প্রিন্স’ সিনেমার টিজারে শাকিব খান। ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল ফিতরে একসঙ্গে ঢালিউডের চার নায়কের সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। শাকিব খানের ‘প্রিন্স’, সিয়ামের ‘রাক্ষস’, নিশোর ‘দম’ ও শরীফুল রাজের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। সিনেমাগুলোর টিজার-ট্রেলার ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জমে উঠেছে ভক্তদের ‘যুদ্ধ’। চলছে তর্কবিতর্ক। পছন্দের তারকাকে এগিয়ে রাখছেন ভক্তরা। অনেকে এমনটাও মন্তব্য করছেন, ঈদের ব্যবসাসফল সিনেমা ঘিরে ঢালিউডে যোগ হতে পারে নতুন সমীকরণ। এমনকি এই ঈদ ঢালিউডে শীর্ষ তারকার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। আদতে সেই সম্ভাবনা কতটা রয়েছে?

মার্চের শুরু থেকেই ঈদের সিনেমা ঘিরে আলোচনা–সমালোচনা তৈরি হয়। এ আলোচনা বাড়িয়ে দেয় ‘প্রিন্স’ সিনেমার টিজার। প্রকাশিত টিজারের বেশ কিছু অংশে অসংগতি দেখা যায়। যা শাকিবের বড় বাজেটের সিনেমার ক্ষেত্রে মেনে নিতে পারেননি অনেক ভক্ত। যে কারণে অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করতে ছাড়েননি। তবে শাকিবের লুক ঘিরে কেউ কেউ প্রশংসাও করেন। সঙ্গে শাকিবের ভুল পথে চলার কথাও সিনেমা-সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোতে জানান ভক্তরা।

ভক্তদের কেউ কেউ মনে করেন, জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে শাকিব ভুল পথে হাঁটছেন। ‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’ সিনেমার পর আবার অ্যাকশন সিনেমা নিয়ে আসাকে তাঁরা অযৌক্তিক মনে করছেন। একই জনরার সিনেমার গল্পে কতটা বৈচিত্র্য হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে তিন বছর আগেও বলিউডে সরব ছিল এই ধারা। গত বছর বলিউডও এ ধারা থেকে সরে এসেছে। ‘অ্যানিমেল’ সিনেমা আলোচনায় আসার আগে ‘কবির সিং’ ভালো ব্যবসা করে। কিন্তু গত বছর একই ধারার ‘বাঘি ৪’-সহ বেশির ভাগই সিনেমাই ব্যর্থ হয়।

‘রাক্ষস’ সিনেমার ট্রেলারে সিয়ামের লুক। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে শাকিবের দুই সিনেমার নির্মাতা রায়হান রাফী নিজেও অ্যাকশন ঘরানার সিনেমা নির্মাণ থেকে সরে এসেছেন। অভিজ্ঞ এই নির্মাতা ‘তুফান’, ‘তাণ্ডব’-এর সিকুয়েল করার ঘোষণা দিলেও সে পথে হাঁটেননি তিনি। এবার নারীদের দিনযাপনের গল্প নিয়ে ভিন্ন ধারার গল্পের সিনেমা ‘প্রেশার কুকার’ নিয়ে ঈদে আসছেন। সেখানে শাকিব খানের একই পথে হাঁটা কতটা যুক্তিসংগত, সেটা ঈদের সিনেমার ভবিষ্যৎ বলে দেবে। এমনকি শাকিব যে ঠিক পথেই রয়েছেন, সেটাই ঈদের প্রমাণ হতে পারে।

শাকিবের ‘প্রিন্স’ সিনেমার টিজার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই প্রকাশ পায় ‘রাক্ষস’ সিনেমার ট্রেলার। ভক্তদের মন্তব্য, চমক দেখিয়েছেন সিয়াম আহমেদ। ট্রেলারে তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ, তাঁর অ্যাকশন দৃশ্যে উপস্থিতি, সংলাপ বলা অনেক দর্শক পছন্দ করেছেন। প্রশংসা করেছেন ওমর সানী, চঞ্চল চৌধুরীসহ অনেকে। যে কারণে অনেক ভক্ত আলোচনায় সিয়ামকেই এগিয়ে রাখছেন। ওয়ালিউল নামের এক দর্শক সিনেমা-সংশ্লিষ্ট একটি গ্রুপে লিখেছেন, ‘অন্তত এটা বলাই যায়, “রাক্ষস” সিনেমার ট্রেলারের কাছে পিছিয়ে পড়ল “প্রিন্স”-এর টিজার। যদি কোনো কারণে সিনেমার গল্প দর্শক টানতে না পারে, তাহলে ঢালিউডের শীর্ষ অবস্থান থেকে ছিটকে পড়তে পারেন শাকিব খান।’

কেউ আবার এটাও মনে করছেন, প্রতিবার যেমন শাকিবের সিনেমা মুক্তির আগে থেকেই আলোচনায় থাকে, একচেটিয়া ব্যবসা করতে হাইপ তৈরি হয়, এবার প্রচারণায় সেটা দৃষ্টিগোচর হয়নি। যে কারণে ‘প্রিন্স’কে ছাপিয়ে ‘রাক্ষস’ যদি বেশি আয় করে, সেটা একদমই অস্বাভাবিক কিছু বলা যাবে না। যদি শাকিবের সিনেমা সফলে ব্যর্থ হয়, তবে কি শাকিবনির্ভর ঢালিউডে হিসাব বদলে যাবে? এই পথের হিসাব আরও কঠিন।

আরও পড়ুন

বেশ কয়েক বছর ধরে সিয়াম একটু করে নিজেকে পরিবর্তন করছেন। গত বছরের ঈদে শাকিবের ‘বরবাদ’–এর সঙ্গে নীরবে প্রতিযোগিতা করে সিয়ামের ‘জংলি’। ব্যবসায়িকভাবে সফলও হয়। পরে শাকিবের ‘তাণ্ডব’ সিনেমায় অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেও প্রশংসিত হন সিয়াম। তাঁর সিনেমার দিকে দর্শকদের আলাদা নজর রয়েছে। ঈদে তাঁর ‘রাক্ষস’ ভালো ব্যবসা করলে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা পরবর্তী সিনেমাগুলো তাঁর ক্যারিয়ারে আরও সুফল বয়ে আনবে। সে ক্ষেত্রে রায়হান রাফীর ‘আন্ধার’ ভালো করলে, সেই সিনেমা দিয়ে সিয়াম প্রশংসিত হলে ঢালিউডে তিনি হতে পারেন আলোচিত নায়ক। সিয়ামকে শীর্ষ নায়ক বলা যাবে না। কারণ, শাকিব পরবর্তী সিনেমা দিয়ে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। সিয়াম যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হন, তাহলে সিয়ামের সংগ্রামের পথ আরও বন্ধুর হবে।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার নানা লুকে শরীফুল রাজ
ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে ‘উৎসব’ দিয়ে আলোচিত তানিম নূর ঈদে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে হাজির হচ্ছেন। সিনেমার ট্রেলারে নজর কেড়েছেন শরীফুল রাজ। মোশাররফ করিম ও চঞ্চল চৌধুরী তাঁদের জায়গায় এমনিতেই এগিয়ে রয়েছেন। তবে সব ছাপিয়ে সিনেমাটি ব্যবসাসফল হলে নায়ক হিসেবে লাভবান হবেন রাজ। তাঁর দিকেই ঢালিউড প্রযোজকদের নজর থাকবে বেশি। ঢালিউডে তাঁর জায়গা শক্ত হবে। কারণ, তিনি একের পর এক সংগ্রাম করে পথ চলেছেন। এর আগে রাজ ‘পরান’, ‘হাওয়া’, কাজলরেখা’ সিনেমা দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করছেন। এদিকে তাঁর হাতেও রয়েছে দুটি বড় বাজেটের সিনেমা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ঢালিউডে তাঁর অবস্থানও অনেক শক্তের হতে পারে। সেটা শীর্ষ কি না, বলা যাবে না। সে পথ আরও অনেক দূর। একের পর এক সফল সিনেমা দিয়ে হাঁটতে হবে এই নায়ককে। আবার রাজ ঘিরে কোনো কারণে আলোচনা তৈরি না হলে তাঁর ক্যারিয়ার পিছিয়ে যাবে।

ঈদের সিনেমা ঘিরে সবার আগে আলোচনায় আসেন আফরান নিশো। শুটিংয়ের আগে লোকেশনে গিয়ে চিত্রনাট্য পড়ার ছবিতে তিনি ভাইরাল হন। জানা যায়, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘দাগি’র পর ঈদে রেদওয়ান রনির ‘দম’ নিয়ে আসছেন তিনি। ঢালিউড সিনেমার দর্শকেরা ভিন্ন এক গল্প আর লোকেশনের সিনেমা দেখতে পাবেন। সিনেমার গল্প, উপস্থাপনা ও পরিচালনা ভালো হলে ঢালিউডে নিশোর নির্ভরতা বাড়বে। গল্পটি ঈদের সিনেমার মধ্যে ব্যবসাসফল হলেই কি নিশোকে ঢালিউড শীর্ষ তারকার জায়গা করে দেবে? সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও পড়ুন
‘দম’ সিনেমায় নিশোর লুক প্রশংসিত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

সিনেমা-সংশ্লিষ্ট একটি গ্রুপে লাবিব নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘“দম” সিনেমাটি ঈদের ভিড়ে প্রশংসিত হলে ঢালিউডে তৃতীয় সিনেমা দিয়ে নায়ক হিসেবে এগিয়ে থাকবেন নিশো। ভাগ্য ভালো হলে শীর্ষেও থাকতে পারেন।’ সেখানে পাল্টা নাজিব বেগ নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘বছরে একটি সিনেমা করে নিশো ঢালিউডে সহজে শীর্ষে আসবে না। তার “সুড়ঙ্গ”কে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি “দাগি” সিনেমা। এবার “দম” কতটা সফল হবে, সেটাও বলা যায় না।’ তাহলে ঢালিউড সিনেমার হাল কার হাতে থাকবে? সমীকরণ কী বলে?

‘ঈদের সিনেমা ঘিরে ঢালিউডে কি শীর্ষ তারকার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে’—এমন প্রশ্নে পরিচালক ও সমালোচক মতিন রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢালিউডে সবারই কমবেশি দর্শক রয়েছে। সেখানে একজনমাত্র নায়কের বিশাল দর্শকশ্রেণি রয়েছে। সেই দর্শকের কাছে যদি একটি সিনেমা ভালো না লাগে, তার মানে এই নয়, সেই নায়কের ক্যারিয়ার চলে যাবে। সে পরের সিনেমা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কারণ, বিশাল ভক্তগোষ্ঠীকে মাইনাস (বিয়োগ) করা যাবে না। আবার একটি সিনেমার টিজার দেখে জাজ করা যাবে না। তারপরও এখন অন্য নায়কেরা যদি এগিয়ে যায়, তাহলে ঢালিউডে শীর্ষ অবস্থানে আসতে তাদের একের পর এক ভালো সিনেমা করে যেতে হবে। দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। আলোচিত একজন বাদে অন্যদের একটি সিনেমা হিট করলেই কোনো হিরো ঢালিউডে শীর্ষ নায়ক হয়ে যাবে, এটা মনে করি না। এটা সময়ের ব্যাপার।’