পুরস্কার থেকে রাজনৈতিক বার্তা, কী হলো এবারের গ্র্যামিতে
৯টি মনোনয়ন পেয়ে আগেই এগিয়ে ছিলেন কেনড্রিক লামার। বাংলাদেশ সময় গতকাল সকালে অনুষ্ঠিত ৬৮তম গ্র্যামির আসরে সর্বোচ্চ পুরস্কারও জিতেছেন এই র্যাপার। আলো ছড়িয়েছেন তরুণ র্যাপার ব্যাড বানিও। গ্র্যামির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নিয়ে লিখেছেন লতিফুল হক
লামারের রেকর্ড
গ্র্যামিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন মার্কিন র্যাপ তারকা কেনড্রিক লামার। এবারের আসরে পাঁচটি পুরস্কার জিতে ভেঙে দিয়েছেন র্যাপারদের মধ্যে সর্বাধিক গ্র্যামি জয়ের রেকর্ড। এত দিন র্যাপার জে-জেডের দখলে ছিল এই রেকর্ড। জে-জেডের মোট গ্র্যামি ছিল ২৫টি, তাঁকে ছাড়িয়ে গেলেন লামার; তাঁর ঝুলিতে মোট গ্র্যামি এখন ২৭টি। এ বছর রেকর্ডিং একাডেমি মোট ৯৫টি বিভাগে পুরস্কার দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রাক্-সম্প্রচার পর্বে ঘোষণা করা হয় ৮৬টি বিভাগের পুরস্কার। মূল টেলিভিশন সম্প্রচারের জন্য রাখা হয় বাকি ৯টি বড় ও পারফরম্যান্সনির্ভর বিভাগ। প্রাক্-সম্প্রচার পর্বেই তিনটি পুরস্কার জেতেন কেনড্রিক লামার—সেরা র্যাপ পারফরম্যান্স, সেরা মেলোডিক র্যাপ পারফরম্যান্স ও সেরা র্যাপ সং। মূল সম্প্রচার শুরুর পর জেতেন সেরা র্যাপ অ্যালবাম ও (সিজার সঙ্গে যৌথভাবে) রেকর্ড অব দ্য ইয়ার পুরস্কার। মঞ্চে পুরস্কার গ্রহণ করে এই র্যাপার বলেন, ‘আমি আসলে নিজেকে নিয়ে অত ভালো বলতে পারি না। যা বলার সংগীতের মাধ্যমেই প্রকাশ করি।’
ব্যাড বানির ইতিহাস
প্রথম স্প্যানিশ-ভাষী শিল্পী হিসেবে গ্র্যামিতে অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার জিতলেন পুয়ের্তো রিকোর র্যাপার ব্যাড বানি। আলোচিত অ্যালবাম ‘ডেবি তিয়ার মাস ফোতোস’-এর জন্য এ পুরস্কার পেলেন তিনি। পুরস্কার গ্রহণ করে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ইমিগ্রেশন নীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানোর আগে বলব, আইস আউট (মিনেসোটায় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট—আইসের কার্যক্রম এবং ফেডারেল কর্মকর্তাদের সহিংসতার বিরুদ্ধে চলমান প্রতিবাদ)। আমরা পশু নই, এলিয়েন নই; আমরা মানুষ এবং আমেরিকান।’ যাঁরা স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের দেশ ছেড়ে যান, তাঁদের এ পুরস্কার উৎসর্গ করেন বানি। অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার ছাড়া আরও দুটি পুরস্কার জিতেছেন বানি।
রাজনৈতিক বার্তা
কেবল ব্যাড বানিই নন; আরও অনেক শিল্পীই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেন। গ্র্যামিতে উপস্থিত অনেক শিল্পী তাঁদের পোশাকের সঙ্গে ‘আইস আউট’ পিন যুক্ত করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জাস্টিন ও হেইলি বিবার দম্পতি, জনি মিচেল, জর্ডান টিসন, হেলেন জে শেন। কিউবান-আমেরিকান সংগীতশিল্পী গ্লোরিয়া এস্তেফান বলেন, ‘আমি ভীত, আমি খুব চিন্তিত। এটা অপরাধীদের গ্রেপ্তার নয়। এসব মানুষের পরিবার আছে, তারা দশক ধরে এই দেশে অবদান রেখেছে। শিশুদের কথা বলতেই হবে। শত শত শিশু ডিটেনশন সেন্টারে আছে। এটা অমানবিক।’ এবার সেরা নবাগতশিল্পী হয়েছেন ২৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ গায়িকা অলিভিয়া ডিন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি একজন অভিবাসীর নাতনি হিসেবে।’ পুরস্কার জয়ের পর র্যাপার শাবুজি বলেন, ‘অভিবাসীরাই এই দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) বানিয়েছে। এই পুরস্কার সব অভিবাসীর সন্তানদের জন্য। যারা ভালো সুযোগের জন্য এসেছে, তারা দেশকে রঙিন করেছে।’
এ সময়ের আলোচিত গায়িকা বিলি আইলিশ বলেন, ‘আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, আমাদের কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ।’ গ্র্যামিজয়ী আরেক শিল্পী সিজা বলেন, ‘আজ আমরা গ্র্যামি জয় উদ্যাপন করছি, আর কাউকে রাস্তায় ধরে নিয়ে গিয়েই গুলি করা হচ্ছে, এটা খুব হতাশাজনক। তবে আশা হারানো যাবে না; কারণ, যখন মনোবল হারায়, পরিবর্তন সম্ভব হয় না।’
নাখোশ ট্রাম্প
শেষবারের মতো গ্র্যামি সঞ্চালনা করলেন ট্রেভর নোয়া। এই দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান সাধারণত গ্র্যামিতে রাজনৈতিক মন্তব্য কম করেন, তবে এবার নিজের উদ্বোধনী মনোলগেই সরাসরি গায়িকা নিকি মিনাজের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। তিনি বলেন, ‘নিকি মিনাজ এখানে নেই। তিনি এখনো হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছেন।’
গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড সম্প্রচার শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বার্তা দিয়ে অনুষ্ঠান ও ট্রেভর নোয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, এ অনুষ্ঠান ‘দেখার অযোগ্য’ এবং নোয়া ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সিবিএস খুব সৌভাগ্যবান যে তাদের চ্যানেলে এই বর্জ্য আর প্রচারিত হচ্ছে না। ট্রেভর নোয়া যে–ই হোক না কেন, জিমি কিমেলের মতোই খারাপ। আমি হয়তো তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
আরও পুরস্কার
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে মধ্যে সং অব দ্য ইয়ার জিতেছেন বিলি আইলিশ (‘ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার’), বেস্ট পপ সলো পারফরম্যান্সের পুরস্কার উঠেছে লোলা ইয়ংয়ের হাতে (‘মেসি’)। এ ছাড়া ‘ডিফাইং গ্র্যাভিটি’ গানের জন্য বেস্ট পপ ডুয়ো অথবা গ্রুপ পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেয়েছেন সিনথিয়া আরিভো ও আরিয়ানা গ্রান্দে। ‘মেহ্যাম’ অ্যালবামের জন্য সেরা পপ ভোকাল অ্যালবামের পুরস্কার পেয়েছেন লেডি গাগা। ৯০ বছর বয়সে প্রথমবার গ্র্যামি জিতেছেন তিব্বতি বৌদ্ধদের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা। তাঁর স্পোকেন-ওয়ার্ড অ্যালবাম ‘মেডিটেশনস: দ্য রিফ্লেকশন অব হিজ হলিনেস অব দ্য দালাই লামা’র জন্য এ পুরস্কার পান তিনি। সেরা মিউজিক্যাল ফিল্ম ক্যাটাগরিতে এবার পুরস্কার জিতেছে ‘মিউজিক বাই জন উইলিয়ামস’। তথ্যচিত্রটির প্রযোজকদের মধ্যে আছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ।
এর মাধ্যমে এমি, গ্র্যামি, অস্কার ও টনি পুরস্কার পাওয়া এলিট ক্লাবে ঢুকে গেলেন স্পিলবার্গ। আলোচিত সিনেমা ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’-এর গান ‘গোল্ডেন’ পুরস্কার জিতেছে বেস্ট সং রিটেন ফর ভিজ্যুয়াল মিডিয়া ক্যাটাগরিতে। এবারই প্রথম গ্র্যামি জিতল কোনো কে-পপ গান।
আরও ঘটনা
এবারও লালগালিচায় আলো ছড়িয়েছেন সংগীত তারকারা। তবে সবচেয়ে আলোচিত ছিল চ্যাপেল রোনের উপস্থিতি। লালগালিচায় অর্ধাঙ্গ অনাবৃত রেখে চমকে দেন হালের এই তরুণ গায়িকা। এ ছাড়া গানে গানে মঞ্চ মাতান রোজে, ব্রুনো মার্স, লেডি গাগা, সাবরিনা কার্পেন্টার, জাস্টিন বিবার, টেইলর, দ্য ক্রিয়েটররা। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সাড়া ফেলেছে সাবরিনা ও গাগার পারফরম্যান্স। খাঁচাবন্দী পাখির বেশে হাজির হন গাগা, ‘অ্যাব্রাকাডাব্রা’ গানের তালে ঝড় তোলেন মঞ্চে।
এএফপি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে