১৯৫৬ সালে সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম, গানে গানে ৭০ বছর পার
বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে ফেরদৌসী রহমান একজন কিংবদন্তি শিল্পী। ‘যার ছায়া পড়েছে মনেরও আয়নাতে’, ‘আমি সাগরেরও নীল’, ‘গান হয়ে এলে’, ‘আমি কার জন্যে পথ চেয়ে রবো’, ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’, ‘পদ্মার ঢেউ রে’, ‘গহিন গাঙের নাইয়া’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা’, ‘ঝরা বকুলের সাথি আমি’, ‘ও কি বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে’ কিংবা ‘পরানে দোলা দিলো এ কোন ভ্রমরা’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানে নিজের কণ্ঠের জাদুতে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছেন ফেরদৌসী রহমান।
আজ ২৮ জুন তাঁর জন্মদিন। ১৯৪১ সালের এই দিনে ভারতের কোচবিহারে জন্ম নেওয়া এই বরেণ্য শিল্পী আজ ৮৫ বছর পূর্ণ করে পা দিলেন ৮৬ বছরে। পল্লিগীতির সম্রাটখ্যাত আব্বাসউদ্দীন আহমদের কন্যা হিসেবে সংগীতের আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তবে তাঁর জীবন শুধু সংগীতের সাফল্যে নয়, শিক্ষাজীবনের কৃতিত্বেও সমানভাবে উজ্জ্বল।
অনেকেই জানেন না, ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ফেরদৌসী রহমান সারা দেশের মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। সে সময় মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আজকের মতো ছিল না। এমন এক সময় তাঁর এই অর্জন ছিল ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণাদায়ক। মজার বিষয় হলো, ওই বছর ২৬ জুন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়, আর ২৮ জুন ছিল তাঁর জন্মদিন। জীবনের প্রথম বড় জন্মদিন উদ্যাপনও হয়েছিল সেই অর্জনকে ঘিরেই।
গানের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও সমান কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ফেরদৌসী রহমান। সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনার সময় তিনি সব সময় মেধাতালিকার প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকতেন। ১৯৫৬ সালে বাংলাবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি সারা দেশের মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সম্মিলিত মেধাতালিকায় সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এই অসাধারণ সাফল্যের জন্য তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এর দুই বছর পর, ১৯৫৮ সালে ইডেন গার্লস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বাদশ স্থান অধিকার করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন এবং যথাক্রমে ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে সম্মান (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।
সংগীতের প্রতি তাঁর অসাধারণ নিষ্ঠা ও সম্ভাবনার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৩ সালে তিনি ইউনেসকোর একটি ফেলোশিপ লাভ করেন। সেই ফেলোশিপের আওতায় তিনি যুক্তরাজ্যের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে ছয় মাসের জন্য স্টাফ নোটেশন বা পাশ্চাত্য সংগীতলিপি বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ফেরদৌসী রহমান বলেন, তাঁদের পরিবারে জন্মদিন উদ্যাপনের তেমন রীতি ছিল না। একমাত্র বড় ভাই, সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রয়াত মোস্তফা কামালের জন্মদিনই ধুমধাম করে উদ্যাপন করা হতো। গান, কবিতা আর খাওয়াদাওয়ায় মুখর থাকত বাড়ি। কিন্তু ম্যাট্রিকে সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হওয়ার পর তাঁর বাবা সিদ্ধান্ত নেন, মেয়ের জন্মদিনও বিশেষভাবে উদ্যাপন করবেন। পুরানা পল্টনের বাসায় সেই আয়োজনে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, শিল্পী-সাহিত্যিক অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। গান গেয়েছিলেন সময়ের খ্যাতিমান শিল্পীরাও। আজও সেই দিনটিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় জন্মদিনগুলোর একটি বলে মনে করেন তিনি।
জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় বাবার প্রভাবের কথা বারবার উল্লেখ করেন ফেরদৌসী রহমান। তাঁর মতে, তিনি নিজে জীবন নিয়ে খুব বেশি স্বপ্ন দেখেননি, বরং তাঁর বাবা তাঁকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। চেয়েছিলেন মেয়ে পড়াশোনায় অসাধারণ করবে, উচ্চশিক্ষা নেবে, বড় কর্মকর্তা হবে। ভালো স্কুলে পড়িয়েছেন, ভালো ওস্তাদের কাছে গান শিখিয়েছেন। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তাঁর বাবার প্রত্যাশা ছিল অনেক।
তবে ভাগ্য ফেরদৌসী রহমানকে নিয়ে গেছে অন্য এক পথে। পড়াশোনায় কৃতিত্বের পাশাপাশি সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই গান গাইতে শুরু করেন। মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথম মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর স্মৃতি আজও তাঁর কাছে জ্বলজ্বলে। বাবার সঙ্গে কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে গিয়ে তিনি গেয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীত ‘শুধু কাঙালের মতো চেয়েছিনু তার মালাখানি’। এরপর ১৯৪৮ সালে ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে গান করেন। সেই শুরু, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
পরবর্তী কয়েক দশকে বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং মঞ্চ—সবখানেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। এমন সময়ও গেছে, যখন দিনরাত গান নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হতো তাঁকে। কখনো রেডিও, কখনো টেলিভিশন, কখনো চলচ্চিত্রের রেকর্ডিং, আবার কখনো মঞ্চানুষ্ঠান। গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি গেছেন করাচি, রাশিয়া, চীনসহ বিশ্বের নানা দেশে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি আধুনিক গান, লোকগান, পল্লিগীতি ও চলচ্চিত্রের গানে নিজের আলাদা স্বাক্ষর রেখেছেন।
তবে ফেরদৌসী রহমানের এই দীর্ঘ পথচলা খুব সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তাঁর কণ্ঠ কিছুটা নাজুক ছিল। তারপরও বছরের পর বছর নিরলসভাবে গান গেয়েছেন। রাতভর চলচ্চিত্রের গানের রেকর্ডিং, নিয়মিত অনুষ্ঠান আর অবিরাম ব্যস্ততা তাঁর কণ্ঠের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
২০০৭-০৮ সালের পর ধীরে ধীরে গান থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন। আজও সেই না-পারা তাঁর মনে কষ্ট জাগায়। তবে সেটি মঞ্চে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়। তাঁর আক্ষেপ, নিজের ঘরে বসে মন খুলে গান গাওয়ার শক্তিটুকুও আর আগের মতো নেই। রবীন্দ্রসংগীত কিংবা নজরুলসংগীত—যেসব গান সব সময় মঞ্চে গাওয়া হয়নি, সেসব গান নিজের জন্য গাইতে ভালোবাসতেন। এখন তা–ও পারেন না আগের মতো।
জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে ফেরদৌসী রহমানের কোনো আক্ষেপ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া কিংবা পিএইচডি করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সংগীতের ব্যস্ততার কারণে সেদিকে আর যাওয়া হয়নি। তবু এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই তাঁর। কারণ, তাঁর বিশ্বাস—সৃষ্টিকর্তা তাঁকে না চাইতেও অনেক কিছু দিয়েছেন।
৮৫ বছর পূর্ণ করে ৮৬ বছরে পা রাখা এই শিল্পী আজও জীবনকে দেখেন ইতিবাচক দৃষ্টিতে। তাঁর মতে, মানুষ যদি নিজেকে সব সময় দুঃখী ভাবতে থাকে, একসময় সত্যিই দুঃখী হয়ে যায়। তাই তিনি সব সময় অল্পের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। না পাওয়ার হিসাবের চেয়ে সামান্য প্রাপ্তিকেও বড় করে দেখেছেন।