তাসরিফের অপমানের প্রতিশোধ...

ভক্তকে গিটার উপহার দিচ্ছেন তাসরিফ খান। ছবি: ফেসবুক থেকে

ক্যারিয়ার তখন শুরু হচ্ছিল। সময়টা ২০১৬ সাল। সেই সময়েই একের পর এক বাধা পেয়েছিলেন তরুণ গায়ক তাসরিফ খান। একবার রবীন্দ্র সরোবরের একটি গানের আয়োজনের সময় গিটার ঘিরে হু হু কান্না করতে হয়েছিল এই গায়ককে। ১০ বছর পর সেই একই মঞ্চে উঠে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন এই গায়ক। আজ আর কান্না নয়, পছন্দের গিটার ভক্তকে উপহার দিলেন। এর পেছনে রয়েছে তাসরিফের জীবনের কষ্টের এক স্মৃতি। যে স্মৃতি তিনি ক্যারিয়ারজুড়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন। কী ঘটেছিল ১০ বছর আগে?

এই গায়ক জানান, সেই সময়ে রবীন্দ্র সরোবরে ঘুরতে গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখতে পান, সেখানে শীতার্ত মানুষদের সহায়তার জন্য গান হচ্ছে। সেদিন যাঁরা গান গাইছিলেন, তাঁদের পাশে ভয়ে ভয়ে গিয়ে বসেন তাসরিফ। তাঁদের গানের সঙ্গে তাল মেলাতে থাকেন। একসময় সেই গায়কেরা কিছুটা বিরতি নেন। সেই সুযোগে অনুমতি নিয়ে একটি গান করেন তাসরিফ। গানটি ছিল ‘সাত রাজার ধন...’

তাসরিফ খান। ছবি: ফেসবুক থেকে

চোখ বন্ধ করে গান গাইছিলেন তাসরিফ। গান শেষে চোখ খুলে দেখেন, অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছেন। গান শুনছেন। পরে আরেকটা গান করতে যাবেন, এমন সময় তাঁর গিটারের তার ছিঁড়ে যায়। পাশেই যাঁরা গিটার বাজাচ্ছিলেন, তাঁদের কাছে গিয়ে অনুরোধ করে গিটার নিতে যান। কিন্তু যাঁর গিটার, তিনি হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘এটা অনেক দামি গিটার। ধরার মতো যোগ্যতা এখনো তোমার হয়নি।’ এমন অপমানজনক কথা শুনে সেদিন মনটা একেবারেই ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন আর গান গাননি। সেই ঘটনার পর সেদিন ধানমন্ডি লেকের এক পাশে বসে অঝোরে কান্না করেছিলেন এই গায়ক।

তাসরিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০ বছর আগে এই একই জায়গায় নিজের গিটারের তার ছিঁড়ে যায়। পাশের একজনের গিটারটা নেওয়ার জন্য অনুমতি নিতে হাত বাড়াই। সেদিন গিটার না দিয়ে আমার হাত পা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল। আর মুখের ওপর বলেছিল, “এই গিটারে হাত দেওয়া যাবে না। অনেক দামি।” অপমান করেছিল আমাকে। সেদিন কষ্ট পেয়েছি ভীষণ, কিন্তু কেন যেন আমার মধ্যে একটা বিরাট জেদ চেপে গিয়েছিল। একদিন না একদিন এখানে আমি পারফর্ম করবই করব আর সে জন্য যত পরিশ্রমই করা লাগে, আমি করব।’

তাসরিফ খান। ছবি: ফেসবুক থেকে

তারপর নিজের চেষ্টায় তাসরিফ দাঁড় করান কুঁড়েঘর নামে একটি গানের দল। তাসরিফের গাওয়া প্রথম ‘মধ্যবিত্ত...’ গানটি রাতারাতি তাঁকে শ্রোতাদের কাছে নিয়ে যায়। অল্প সময়ে গানটি আড়াই লাখবার শেয়ার হয়। গানটিতে মধ্যবিত্তদের মনের কথা ফুটে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ‘তুমি মানে আমি...’, ‘ময়না রে...’, ‘তাই তো আইলাম সাগরে...’, ‘ব্যাচেলর...’ গানগুলো তাঁকে আলোচনায় আনে।

ক্যারিয়ার এগিয়ে গেলেও মন থেকে সেই অপমানের কথা মুছে যায় না। এই গায়ক বলেন, ‘আমার মধ্যে ভালো করার জেদ ছিল। সেই জেদ থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যদি ভাগ্যে কখনো আসে এবং রবীন্দ্র সরোবরে পারফর্ম করতেই পারি, তবে যেদিন প্রথম পারফর্ম করব, সেদিন আমার বাজানো গিটার সবার সামনে একজনকে উপহার দেব।’

আরও পড়ুন
তাসরিফ খান। ছবি: ফেসবুক থেকে

গত ১০ বছর পরে বৈশাখ উপলক্ষে এবার সেই সুযোগ হাতে আসে। ‘দেশ–বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় গান করলেও এই ভেন্যু আমার জন্য খুবই বিশেষ। এবার সেখানে পারফর্ম করার সময় প্রথম গানে যখন হাজার হাজার দর্শক গলা মেলাচ্ছিলেন, তখন আমার সেই স্মৃতি মনে পড়ে যায়। আর মনে পড়ে, নিজেকে করা প্রতিজ্ঞার কথা। গান গাইতে গাইতে আমি একসময় থেমে যাই। প্রথম গান শেষ করেই আমি আমার নিজেকে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা করেছি। এক ভক্তকে আমার গিটারটি উপহার দিয়েছি।’

এই গায়ক মনে করেন, দেশের তরুণেরা নানা বাধার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল কাজে আসেন। এখানে কাউকে একটু সহযোগিতা করলে তাঁর কাছে যাত্রাটা সহজ হয়। কিন্তু অনেকেই একটু ওপরে উঠলেই অতীত ভুলে যান। তাসরিফ খান বলেন, ‘সেদিন আমি স্টেজে দাঁড়িয়ে আমার গল্পটাও বলেছি। বললাম কারণ, আমার মতো বিভিন্ন সেক্টরের হোঁচট খাওয়া মানুষেরা যেন বুঝতে পারেন, হোঁচট খেলে থেমে যাওয়া যাবে না; বরং পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে আরও শক্ত করে তৈরি করতে হবে।’

মঞ্চে তাসরিফ খান। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে