১৫ বছর বয়সে মা-বাবাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা সেই মেয়েটি এখন...

মায়ের কোলে ডুয়া লিপা। গায়িকার ইনস্টাগ্রাম থেকে

গান নিয়ে স্বপ্ন অনেকেরই থাকে; কিন্তু কজন আর নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য মা-বাবাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করতে পারে; কিন্তু ডুয়া লিপা পেরেছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে কসোভো ছেড়ে যুক্তরাজ্যে আসেন, ইউটিউবে মুক্তি দিতে থাকেন কাভার সং। ১৫ বছর পরের গল্পটা তো সবারই জানা, এখন দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়িকাদের একজন তিনি। আজ ২২ আগস্ট, ডুয়া লিপার জন্মদিন।

ডুয়া লিপা সারা দুনিয়ায় পরিচিত নাম। তাঁর ২০২০ সালের অ্যালবাম ‘ফিউচার নস্টালজিয়া’ তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেয়। অ্যালবামটি একযোগে ৩০টির বেশি দেশে টপ ১০-এ জায়গা করে নিয়েছিল। মহামারির শুরুতে প্রকাশিত সে অ্যালবাম যেন আটকে যাওয়া পৃথিবীর জন্য ছিল মুক্তির ডাক।

ডুয়ার জন্ম কিন্তু লন্ডনে, ১৯৯৫ সালে। মা–বাবা আলবেনিয়ান, থাকতেন কসোভোয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চলে আসেন যুক্তরাজ্যে। পরে আবার ফিরে যান নিজের দেশে। ডুয়ার বয়স তখন ১১; কিন্তু ডুয়া গানের স্বপ্নে বিভোর। বড় হয়েছেন বাবা ডুকোজিন লিপার গান শুনে। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মা-বাবাকে রাজি করিয়ে আবার ফিরে আসেন লন্ডনে। বাবা ডুকোজিন এখন মেয়ের ম্যানেজার।

‘আমি সব সময় নতুন’
লন্ডনের আলো আর কসোভোর অচেনা রাস্তায় বেড়ে ওঠা ডুয়া লিপা বারবার নতুন করে শুরু করেছেন জীবন। পপতারকা হওয়ার স্বপ্ন তাঁকে ছোটবেলা থেকেই তাড়িত করেছে; কিন্তু সেটি সম্ভব হবে—এমনটা ভাবতে পারেননি কখনো।

আমি প্রেমে পড়তে পছন্দ করি। প্রেম দুর্বল করে, আবার একই সঙ্গে সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিও দেয়। অনেক দিন নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু এখন ছেড়ে দিয়েছি। যদি আঘাত পাইও, সেটিই নিয়তি।
ডুয়া লিপা

তবে বারবার দেশ বদল করায় শৈশবটা সহজ ছিল না। নাম নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো প্রায়ই। ডুয়ার স্মৃতিচারণা, ‘সবাই জানতে চাইত আমার নাম কোথা থেকে এসেছে। আমি গর্ব করে সব বলতাম।’ স্কুলে খুব একটা মন ছিল না, প্রায়ই কামাই করতেন। ১৭ বছর বয়সেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন শুধু সংগীতেই মন দেবেন। তখন থেকেই লেখালেখির শুরু, প্রযোজকের সঙ্গে কাজ, স্টুডিওর দরজায় কড়া নাড়া।

ডুয়া লিপা। রয়টার্স

‘আমি খুব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। বাবাই বলেন, আমাকে না করা কঠিন’, হেসে বললেন ডুয়া। গায়িকা মনে করেন গায়িকা হওয়ার স্বপ্নই তাঁকে বেপরোয়া করে তোলে। ‘অনেকেই আমাকে বলে মাত্র ১৫ বছর বয়সে নতুন দেশে এসে গায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম—এই সাহস কোথায় পেয়েছি? আসলে আমি আগে থেকেই আত্মবিশ্বাসী, মনে হয় এখনকার চেয়ে কৈশোরেই বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম (হাসি)।’ বলেন তিনি।

আমার প্রথম মিউজিক ভিডিওগুলোতে আমি গিটার বা পিয়ানো নিয়েছিলাম; কিন্তু তখনই মানুষ ভেবেছে, আমি হয়তো আসল শিল্পী নই, নিজে গান লিখি না। অথচ একজন পুরুষ শিল্পী একই কাজ করলে, মানুষ ধরে নেয়—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সে নিজেই গান লিখেছে, সবকিছুই নিজের। অথচ সেটিই সব সময় সত্যি নয়।
ডুয়া লিপা

তবে সবটা ছিল না মসৃণ। কিশোর বয়সে এমন এক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, যেখানে দুজনের কাছে ‘বিশ্বস্ততা’র সংজ্ঞা ছিল ভিন্ন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিখিয়েছে সম্পর্ক আর আত্মসম্মান সম্পর্কে।

গান গাওয়ার বাইরে তিনি দাঁড় করিয়েছেন সার্ভিস৯৫ নামের সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ওয়েবসাইট, নিউজলেটার, বইপড়া ক্লাব আর পডকাস্টের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নানা চিন্তা-ভাবনা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পাঠক-শ্রোতাদের পরিচয় করিয়ে দেন। পডকাস্টে তিনি কথা বলেছেন প্যাটি স্মিথ থেকে শুরু করে অ্যাপলের সিইও টিম কুক পর্যন্ত নানা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে।

ডুয়া লিপা সারা দুনিয়ায় পরিচিত নাম। তাঁর ২০২০ সালের অ্যালবাম ‘ফিউচার নস্টালজিয়া’ তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেয়। অ্যালবামটি একযোগে ৩০টির বেশি দেশে টপ ১০-এ জায়গা করে নিয়েছিল। মহামারির শুরুতে প্রকাশিত সে অ্যালবাম যেন আটকে যাওয়া পৃথিবীর জন্য ছিল মুক্তির ডাক।

মঞ্চের ভেতরে-বাইরে
৩০ বছর বয়সী এই গায়িকা গত কয়েক বছরে বিশ্ব সফরে ব্যস্ত ছিলেন। ‘র‌্যাডিক্যাল অপটিমিজম’ অ্যালবামের গান নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন ৮০টির বেশি শহরে। মঞ্চের বাইরে তিনি একেবারেই শান্ত—তাঁকে দেখে বিশ্বাস করা কঠিন যে কিছুক্ষণ পরই তিনি হাজারো দর্শকের সামনে ঝড় তুলবেন। প্রতিটি শহরে স্থানীয় একটি জনপ্রিয় গান কাভার করেন ডুয়া। চেষ্টা করেন স্থানীয় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে, ক্লাবে যান; স্থানীয় খাবারও চেখে দেখেন। গত বছর যেমন ব্যাংককের খাবার তাঁর খুব ভালো লেগেছিল।

দুই পক্ষেই মানুষ মারা যাচ্ছে, শিশুরা প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে; এসব দেখে আমার পক্ষে চুপ করে থাকা কঠিন। যত সমালোচনাই হোক নিজের মত জানাতে পিছপা হব না আমি।
ডুয়া লিপা

প্রেম, সাফল্য আর বিতর্ক
ডুয়া লিপার গান ও জীবন—সবই সরল অথচ ঝলমলে। ইনস্টাগ্রামে দেখা যায় সমুদ্রসৈকতে ছুটি, খাবার, পরিবারের সঙ্গে ছবি। সম্প্রতি বাগদান করেছেন ব্রিটিশ অভিনেতা ক্যালাম টার্নারের সঙ্গে।

ডুয়া লিপা
রয়টার্স ফাইল ছবি

নিজের প্রেম নিয়ে লিপার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমি প্রেমে পড়তে পছন্দ করি। প্রেম দুর্বল করে, আবার একই সঙ্গে সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিও দেয়। অনেক দিন নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু এখন ছেড়ে দিয়েছি। যদি আঘাত পাইও, সেটিই নিয়তি।’ ডুয়া জানান, বিয়ে নিয়ে এখনই তাঁদের কোনো পরিকল্পনা নেই।

আরও কাজ
গান গাওয়ার বাইরে তিনি দাঁড় করিয়েছেন সার্ভিস৯৫ নামের সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ওয়েবসাইট, নিউজলেটার, বইপড়া ক্লাব আর পডকাস্টের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নানা চিন্তা-ভাবনা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পাঠক-শ্রোতাদের পরিচয় করিয়ে দেন। পডকাস্টে তিনি কথা বলেছেন প্যাটি স্মিথ থেকে শুরু করে অ্যাপলের সিইও টিম কুক পর্যন্ত নানা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে।

আমরা নারী শিল্পীদের বারবার প্রমাণ করতে হয় যে আমরা যা করি, সেটি আমরা নিজেরাই করি—আর সেটি আমরা খুব ভালোভাবেই করি; কিন্তু আমাদের এই জীবনটা এমনই, বারবার সেই প্রমাণ দিয়েই যেতে হয়। তবে আমি আশা করি, একসময় এই ধারণাটা বদলাবে।
ডুয়া লিপা

নতুন যুগের ডুয়া
‘বার্বি’ ছবির হিট গান ‘ডান্স দ্য নাইট’-এ তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন মার্ক রনসন। তাঁর ভাষায়, ‘আট বছর ধরে ডুয়ার সঙ্গে কাজ করছি; কিন্তু এখনকার ডুয়া যেন নতুন রূপ—অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস আর পরিপক্বতায় ভরা এক শিল্পী।’ গায়িকা এখন অ্যালবামের পরিকল্পনায় ব্যস্ত তিনি। বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন কিছু বানাচ্ছি, একেক দিন একেক রকম শোনাচ্ছে। দিক ঠিক করা যেমন আনন্দের, তেমনি কঠিনও। আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হলো কখনো হাল ছেড়ো না। স্থির থাকাটা খুব জরুরি। অনেক সময়ই মনে হয়েছে হয়তো আমি পারব না; কিন্তু আমি কখনোই নিজের জন্য “প্ল্যান বি” রাখিনি। ভেবেছি, যদি বিকল্প রাখি, তাহলে হয়তো পুরোটা দিয়ে চেষ্টা করব না।’

নিজের কথা বলে যাবেন
গত কয়েক বছরে ডুয়া আলোচনায় আসেন গাজায় ইসরায়েলের হামলাকে গণহত্যা বলে। তবে যে যা–ই বলুক ডুয়া জানিয়েছেন, নিজের কথা তিনি বলেই যাবেন। ‘দুই পক্ষেই মানুষ মারা যাচ্ছে, শিশুরা প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে; এসব দেখে আমার পক্ষে চুপ করে থাকা কঠিন। যত সমালোচনাই হোক নিজের মত জানাতে পিছপা হব না আমি।’

ডুয়া লিপা। রয়টার্স

সিক্সটি মিনিটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন ডুয়া লিপা। কেবল এ প্রসঙ্গেই নয়, নারী শিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ারে অনেকবারই নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম মিউজিক ভিডিওগুলোতে আমি গিটার বা পিয়ানো নিয়েছিলাম; কিন্তু তখনই মানুষ ভেবেছে, আমি হয়তো আসল শিল্পী নই, নিজে গান লিখি না। অথচ একজন পুরুষ শিল্পী একই কাজ করলে, মানুষ ধরে নেয়—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সে নিজেই গান লিখেছে, সবকিছুই নিজের। অথচ সেটিই সব সময় সত্যি নয়।’

আরও পড়ুন

নিজেকে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে ডুয়াকে, তবে এ নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস নেই। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমরা নারী শিল্পীদের বারবার প্রমাণ করতে হয় যে আমরা যা করি, সেটি আমরা নিজেরাই করি—আর সেটি আমরা খুব ভালোভাবেই করি; কিন্তু আমাদের এই জীবনটা এমনই, বারবার সেই প্রমাণ দিয়েই যেতে হয়। তবে আমি আশা করি, একসময় এই ধারণাটা বদলাবে।’

তথ্যসূত্র: হারপার বাজার, পিপলডটকম