মাইকেল জ্যাকসনের বিতর্কিত সেই সাক্ষাৎকার
১৯৯৫ সালের ১৪ জুন মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবিসি নিউজের প্রাইম টাইম লাইভ অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত হয় পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন ও তাঁর তৎকালীন স্ত্রী লিসা মেরি প্রেসলির বহুল আলোচিত একটি সাক্ষাৎকার। সাংবাদিক ডায়ান সয়ারের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রচারিত হয় এবং প্রায় ৬ কোটি দর্শক তা দেখেন। ১৯৯৩ সালে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর এটিই ছিল জ্যাকসনের প্রথম বড় টেলিভিশন সাক্ষাৎকার। ফলে অনুষ্ঠানটি নিয়ে আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।
সাক্ষাৎকারে জ্যাকসন তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, তদন্তকারীরা তাঁর বাড়ি তল্লাশি করেও অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাননি। এমনকি অভিযোগকারী কিশোর যে শারীরিক বর্ণনা দিয়েছিল, তার সঙ্গে মিলে যায়—এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। জ্যাকসনের ভাষ্য ছিল, তাঁকে অন্যায়ভাবে অপমানিত করা হয়েছে এবং সংবাদমাধ্যম তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে। লিসা মেরি প্রেসলিও সাক্ষাৎকারে স্বামীর পক্ষে অবস্থান নেন।
তবে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচারের পরপরই ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে ভ্যানিটি ফেয়ারে প্রকাশিত এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাংবাদিক মরিন অর্থ অভিযোগ করেন, অনুষ্ঠানটিতে জ্যাকসনের বক্তব্যকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ করা হয়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিবেদনে সান্তা বারবারা কাউন্টির তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি টম স্নেডনের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, জ্যাকসনের কিছু দাবি তদন্তে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
আরও বিতর্ক তৈরি হয় যখন ডায়ান সয়ার সাক্ষাৎকারে বলেন, জ্যাকসন অভিযোগ থেকে ‘মুক্তি’ পেয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরে স্পষ্ট করেন, তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়নি; বরং অভিযোগকারী পক্ষ আদালতের বাইরে সমঝোতায় যাওয়ার পর মামলাটি এগোয়নি। তদন্তকারীরা তখনো বলেছিলেন, নতুন তথ্য বা সাক্ষ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখা সম্ভব।
সমালোচকদের আরেকটি অভিযোগ ছিল, অনুষ্ঠানে অভিযোগকারী পরিবার, তদন্তকারী কর্মকর্তা বা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি। ফলে সাক্ষাৎকারটি অনেকের কাছে সাংবাদিকতামূলক জিজ্ঞাসাবাদের চেয়ে জ্যাকসনের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবেই বেশি মনে হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারটি প্রচারের সময় জ্যাকসনের নতুন ডাবল অ্যালবাম ‘হিস্টোরি’ বাজারে আসছিল। প্রায় ৩ কোটি ডলারের বিপুল প্রচারণা কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই টেলিভিশন উপস্থিতিকে দেখা হয়। পরে জানা যায়, সাক্ষাৎকার ঘিরে এবিসি ও জ্যাকসনের পক্ষের মধ্যে কিছু প্রচারণামূলক সমঝোতা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি সাক্ষাৎকারের একটি রেকর্ড করা অংশে জ্যাকসনের চেহারা আরও আকর্ষণীয় দেখানোর জন্য প্রযুক্তিগতভাবে পরিবর্তন আনার অভিযোগও সামনে আসে।
আজও ১৪ জুনের সেই সাক্ষাৎকারকে টেলিভিশন ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত সেলিব্রিটি সাক্ষাৎকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একদিকে এটি ছিল মাইকেল জ্যাকসনের জনসমক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরার বড় সুযোগ, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, সেলিব্রিটি প্রভাব ও জনসংযোগ কৌশল নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কেরও জন্ম দেয়।
ভ্যানিটি ফেয়ার অবলম্বনে