কিউবার ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা এই গায়িকা এখন ২০০ কোটি টাকার মালিক
৩ মার্চ জন্ম নেওয়া কামিলা কাবেলো আজ বিশ্ব পপ সংগীতের এক পরিচিত নাম। তাঁর কণ্ঠে লাতিন আবহ, গানের কথায় ভঙ্গুরতা আর মঞ্চে আগুনঝরা উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তিনি সমকালীন পপ সংগীতের এক অনন্য মুখ। কিন্তু এই ঝলমলে সাফল্যের পেছনে রয়েছে দেশান্তর, অনিশ্চয়তা, মানসিক সংগ্রাম আর নিজের শিকড়কে আঁকড়ে থাকার এক কঠিন লড়াই। গতকাল ছিল এ গায়িকার জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
দেশান্তরের গল্প
১৯৯৭ সালে কিউবার কোহিমারে জন্ম কামিলার। বাবা মেক্সিকান, মা কিউবান। শৈশব কেটেছে কিউবা ও মেক্সিকোর মধ্যে যাতায়াত করতে করতে। মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি—সবকিছুই ছিল অচেনা। ইংরেজি ভাষা শেখা থেকে শুরু করে স্কুলে মানিয়ে নেওয়া—প্রতিটি ধাপ ছিল কঠিন।
পরে বহু সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, অভিবাসী হিসেবে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁকে সংবেদনশীল ও আত্মবিশ্বাসী করেছে। নিজের লাতিন পরিচয় নিয়ে তিনি কখনো লজ্জিত হননি; বরং সেটিকেই শক্তিতে রূপ দিয়েছেন।
রিয়েলিটি শো থেকে তারকাখ্যাতি
কামিলার জীবনের মোড় ঘোরে ২০১২ সালে, যখন তিনি অংশ নেন মার্কিন সংগীত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান ‘দ্য এক্স ফ্যাক্টর’–এ। একক প্রতিযোগী হিসেবে অডিশন দিলেও বিচারকেরা তাঁকে অন্য কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে মিলিয়ে একটি গার্ল গ্রুপ গঠন করেন—ফিফথ হারমনি। এই ব্যান্ড দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। ‘ওরথ ইট’, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’–এর মতো গান চার্টে শীর্ষে ওঠে। কিশোরী কামিলা হঠাৎই আন্তর্জাতিক মঞ্চে। ট্যুর, অ্যালবাম, প্রচার—সব মিলিয়ে এক ব্যস্ত জীবন।
তবে ব্যান্ডের ভেতরে মতপার্থক্য ও সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রশ্নে ২০১৬ সালে তিনি গ্রুপ ছাড়েন। সিদ্ধান্তটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই ভেবেছিলেন, একক শিল্পী হিসেবে তিনি টিকতে পারবেন না। কিন্তু কামিলা সেই সংশয়কেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন।
‘হাভানা’—এক বিস্ফোরক উত্থান
২০১৭ সালে একক অ্যালবাম প্রকাশের আগে মুক্তি পায় গান ‘হাভানা’। গানটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, বরং তাঁর কিউবান শিকড়কে বিশ্ব পপের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। লাতিন বিট, স্মরণীয় হুক আর ব্যক্তিগত আবেগ—সব মিলিয়ে ‘হাভানা’ হয়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী হিট।
এই গানের মাধ্যমে কামিলা প্রমাণ করেন, তিনি শুধু গার্ল গ্রুপের সাবেক সদস্য নন; তিনি নিজেই এক স্বতন্ত্র শিল্পী। বিলবোর্ড চার্টে শীর্ষস্থান, অসংখ্য পুরস্কার, স্ট্রিমিং রেকর্ড—সব মিলিয়ে তাঁর একক ক্যারিয়ারের ভিত্তি মজবুত হয়।
অ্যালবাম ও শিল্পীসত্তার বিবর্তন
প্রথম অ্যালবাম ‘কামিলা’ তাঁকে প্রতিষ্ঠা দেয়। পরের অ্যালবাম ‘রোমান্স’–এ তিনি আরও ব্যক্তিগত; প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ—সবকিছু উঠে আসে গানের কথায়। তাঁর কণ্ঠে ভঙ্গুরতা এবং আত্মস্বীকারোক্তির সুর ভক্তদের কাছে তাঁকে আরও কাছের করে তোলে। ২০২২ সালে প্রকাশিত কামিলা কাবেলোর ‘ফ্যামিলিয়া’ অ্যালবামে পারিবারিক শিকড়, লাতিন ঐতিহ্য ও নাচের ছন্দ আরও স্পষ্ট। তিনি বারবার বলেছেন, তাঁর সংগীতের ভেতর দিয়ে তিনি নিজের পরিবার ও সংস্কৃতিকে উদ্যাপন করতে চান।
প্রেম, আলোচনায় থাকা সম্পর্ক
কামিলার ব্যক্তিগত জীবনও বরাবর আলোচনায়। বিশেষ করে কানাডীয় সংগীতশিল্পী শন মেন্ডেসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিশ্বমিডিয়ায় শিরোনাম হয়। তাঁদের যুগল গান ‘সেনোরিটা’ মুক্তির পর প্রেমের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়।
দুজনের সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং পরবর্তী সময়ে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান—সবকিছুই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত। তবে কামিলা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খোলামেলা হলেও সীমারেখা বজায় রাখতে চান। তিনি জানিয়েছেন, জনসমক্ষে থাকা সম্পর্ক মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মসংগ্রাম
কামিলা খোলাখুলি বলেছেন, উদ্বেগ ও মানসিক চাপে তিনি ভুগেছেন। ট্যুরের ব্যস্ততা, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা, শরীর নিয়ে মন্তব্য—এসব তাঁকে আঘাত করেছে। বিশেষ করে শরীর নিয়ে ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে তিনি সরব হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার শরীর বদলাবে, কিন্তু আমার আত্মসম্মান বদলাবে না।’ মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে তাঁর এই খোলামেলা বক্তব্য তরুণ প্রজন্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। খ্যাতি থাকা মানেই নিখুঁত জীবন নয়—এ কথা তিনি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখিয়েছেন।
লাতিন পরিচয়ের গর্ব
কামিলা বারবার বলেছেন, অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব। তিনি স্প্যানিশ ভাষায় গান গাইতে দ্বিধা করেন না। লাতিন সংগীতের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তায় তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। গ্র্যামি মঞ্চে বা আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিতরণীতে তিনি যখন কিউবার কথা বলেন, তখন সেটি শুধু নস্টালজিয়া নয়—একধরনের সাংস্কৃতিক অবস্থান।
সামাজিক অবস্থান ও মানবিক কাজ
কামিলা অভিবাসী অধিকার ও শিক্ষাবিষয়ক উদ্যোগে যুক্ত। শিশুদের শিক্ষা সহায়তায় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন। কোভিডের সময়েও তিনি ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নেন। নিজের খ্যাতিকে তিনি কেবল বিনোদনের সীমানায় রাখেননি; বরং সামাজিক বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
সমালোচনা ও বিতর্ক
ক্যারিয়ারের শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে তাঁর কিছু পুরোনো পোস্ট নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, যেখানে বর্ণবৈষম্যমূলক ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। কামিলা প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এবং জানান, অজ্ঞতা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মানসিকতা থেকে তিনি ভুল করেছিলেন। এই স্বীকারোক্তি ও দায় স্বীকার তাঁর পরিণত মানসিকতারই পরিচয় দেয়।
সম্পদের পরিমাণ ও আর্থিক সাফল্য
বিশ্বসংগীতের বাজারে কামিলার অবস্থান শুধু শিল্পীসত্তায় নয়, আর্থিক দিক থেকেও দৃঢ়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও বিনোদনভিত্তিক প্রকাশনার অনুমান অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০০ কোটির বেশি, ডলার বিনিময় হারের ওপর নির্ভরশীল)। এই সম্পদের উৎস—অ্যালবাম বিক্রি ও স্ট্রিমিং আয়, বিশ্ব ট্যুর ও কনসার্ট, বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্রে অভিনয় (যেমন ২০২১ সালের ‘সিনডারেলা’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয়)।
পপসংগীতের দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতে টিকে থাকা সহজ নয়। কিন্তু কামিলা নিজেকে বারবার নতুনভাবে হাজির করেছেন। কখনো লাতিন পপ, কখনো আরঅ্যান্ডবি, কখনো নাচের ট্র্যাক—তিনি ধারার ভেতর ভেঙে নিজের জায়গা বানিয়েছেন। সবে তো শুরু, ২৮ বছর বয়সী গায়িকা সামনে নতুন আর কোন চমক নিয়ে আসছেন কে জানে!
ভোগ, পিপলডটকম অবলম্বনে