দীর্ঘদিন নানা সমস্যায় ভুগছিলেন নির্মলা মিশ্র। আগে তিনবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্তও হয়েছেন। এই শিল্পীর সঙ্গে হৃদ্‌রোগের শত্রুতা পুরোনো। সে গল্প জানাতে ফিরে যেতে হয় ছেলেবেলায়। ১৯৩৮ সালে নির্মলা মিশ্রর জন্ম অধুনা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায়। বাবা পণ্ডিত মোহিনীমোহন মিশ্র, দাদা মুরারিমোহন মিশ্র—গানের পরিবারে জন্ম নেওয়া নির্মলার শিল্পী না হওয়াটাই আশ্চর্য ছিল। ছোট থেকেই বাবার কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতের জোর তালিম নিচ্ছিলেন। বাদ সাধল টাইফয়েড। সে সময় টাইফয়েড দুরারোগ্য ব্যাধি। প্রখ্যাত চিকিৎসক ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে চিকিৎসা চলে। টাইফয়েড ভালো হয়েও ক্ষতি হয় চোখের, ধরা পড়ে হৃদ্‌রোগ। এত ছোট বয়সে হৃদ্‌রোগ! চিকিৎসকের কড়া নির্দেশ, গান শেখা চলবে না। বিশেষ করে উচ্চাঙ্গসংগীত তো একেবারেই নয়। কিন্তু নির্মলা সে কথা শুনলে তো। লুকিয়ে শুরু করলেন আধুনিক গান শেখা। নাতনির চেষ্টা দেখে অনুমতি দিলেন দাদু। ব্যস, তাঁর নির্মলা মিশ্র হয়ে ওঠা ঠেকায় কে! প্রথম গান রেকর্ড হলো ১৯৫৭ সালে। ১৯৬০ সালে প্লেব্যাক করেন ওড়িশি ছবি শ্রী লোকনাথ–এ। সুযোগটা দিয়েছিলেন ওড়িশি সংগীতের কিংবদন্তি বালাকৃষ্ণ দাস।

নির্মলা মিশ্রর গানের কথা বললেই নস্টালজিয়ায় ডুবে যান বাঙালি শ্রোতারা। একে একে মনে পড়ে যায় ‘ও তোতাপাখি রে শিকল খুলে উড়িয়ে দেব’, ‘তোমার আকাশ দুটি চোখে’, ‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’ ‘বলো তো আরশি’, ‘আমি তো তোমার’, ‘ছোট্ট সে কথা ভালোবাসা’র মতো অনেক গানের কথা। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের একটি ‘ও তোতাপাখি রে’। যদিও গানটি আকাশবাণীতে প্রথম গানটি গেয়েছিলেন পূরবী দত্ত। শুনেই নির্মলা মিশ্র ছুটে গিয়ে পূরবী দত্তকে বলেন—দিদি, আমি গানটি রেকর্ড করব? পূরবী রাজি। এরপর প্রবীর মজুমদারের কাছ থেকে গান তুলে পুজোর রেকর্ড করেন, তৈরি হয় নতুন ইতিহাস।

default-image

নিজের ভাষার বাইরে অন্য ভাষায় গান গেয়ে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পাওয়া শিল্পীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। নির্মলা মিশ্র ছিলেন সেই প্রতিভাধরদের একজন। তিনি বাংলা নাকি ওড়িশি গানে বেশি জনপ্রিয় তা নিয়ে তর্ক হতেই পারে। ওড়িশি গানে অবদানের জন্য শিল্পীকে সংগীত সুধাকর বালাকৃষ্ণ দাস সম্মানে ভূষিত করা হয়। তাঁর গাওয়া ‘নিদো ভরা রাতি’কে সর্বকালের সেরা ওড়িশি গানের একটি বলে মনে করা হয়। তিনি নিজেই বলতেন, বম্বের লতা, বাংলার সন্ধ্যার মতোই তিনি ওড়িশার নির্মলা।
বাইরে থেকে গুরুগম্ভীর বলে পরিচিতি ছিল নির্মলা মিশ্রর। কিন্তু প্রয়াণের পর তাঁর ছেলে শুভদ্বীপ দাশগুপ্ত লিখেছেন, তাঁর মা ছিলেন প্রচলিত এ ধারণার একেবারেই বিপরীত। ‘মা সারাক্ষণ কিছু না কিছু করতেন। এক জায়গায় বসতে পারতেন না। ছোট থেকেই শুনেছি নির্মলা মিশ্র বড় গুণী শিল্পী। কিন্তু কোনো দিন কাউকে সে কথা বুঝতে দেননি,’ আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন শুভদ্বীপ। ওই লেখায় শিল্পী–পুত্র আরও জানিয়েছেন নির্মলা মিশ্র সম্পর্কে অনেক অজানা কথা, ‘খুব চকলেট, আইসক্রিম খেতে ভালোবাসতেন। সংগীতশিল্পীদের ঠান্ডা খেতে নেই, এ কথা সবার জানা। মায়ের ক্ষেত্রে ঘটে এসেছে ভিন্ন। কোনো দিন ভোরবেলা উঠে রেওয়াজ করতে শুনিনি। সময় ধরে তা করতেই হবে, বাধ্যবাধকতা ছিল না। ঠান্ডা জল থেকে যেকোনো পানীয়—ইচ্ছা হলেই খেয়ে ফেলতেন। বয়স যতই বাড়ুক না কেন, মন থেকে ছিলেন সেই ছোট্ট মেয়েটা।’ সংগীতে অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হন নির্মলা মিশ্র।

গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন