কৈশোরের ডায়েরি থেকে বিশ্বমঞ্চে, কীভাবে অলিভিয়া হয়ে উঠলেন পপ দুনিয়ার নতুন তারকা

অলিভিয়া রদ্রিগো। রয়টার্স

এই সময়ের আলোচিত সংগীত তারকা অলিভিয়া রদ্রিগো। আজ ২০ ফেব্রুয়ারি সময়ের জনপ্রিয় এই পপ তারকার জন্মদিন। আজ ২৩ বছরে পা দেওয়া এই গায়িকার জন্মদিন উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।

২০২১ সালের শুরুতে বিশ্বসংগীত অঙ্গনে এক বিস্ময়ের নাম হয়ে ওঠেন অলিভিয়া রদ্রিগো। কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি ছিলেন ডিজনি প্লাসের এক জনপ্রিয় ধারাবাহিকের তরুণ অভিনেত্রী। আর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে? তিনি বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত পপ তারকা—চার্টের শীর্ষে, স্ট্রিমিং রেকর্ড ভাঙার উল্লাসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলা এক নাম। এই উত্থান যেন আচমকা। অথচ গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি প্রস্তুতি, প্রতিভা, সময়ের সঠিক সমীকরণ।

বজ্রগতির শুরু: ‘ড্রাইভার্স লাইসেন্স’–এর বিস্ফোরণ
২০২১ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি পায় অলিভিয়ার প্রথম একক গান ‘ড্রাইভার্স লাইসেন্স’। পিয়ানো-নির্ভর কোমল কিন্তু হৃদয়ভাঙা এক ব্যালাড—যেখানে আছে সদ্য পাওয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স, প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ, আর ভেঙে যাওয়া প্রেমের স্মৃতি।
গানটি প্রকাশের তিন দিনের মাথায় স্পটিফাইয়ে এক দিনে সর্বোচ্চ স্ট্রিমের (অ-ছুটির গান হিসেবে) রেকর্ড ভেঙে ফেলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন স্ট্রিম স্পর্শ করে, যা প্ল্যাটফর্মের ইতিহাসে দ্রুততম অর্জনগুলোর একটি। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশেই সরাসরি এক নম্বরে অভিষেক। নতুন শিল্পীর ক্ষেত্রে এমন সাফল্য প্রায় নজিরবিহীন।

অলিভিয়া পরে বলেছিলেন, পুরো ঘটনাটা তাঁর কাছে ‘অবাস্তব’ লেগেছিল। ঘরে বসে থাকতে থাকতে তিনি দেখছিলেন সংখ্যার পর সংখ্যা ভাঙছে, অথচ মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকের সামনে গান গাওয়ার সুযোগও তখনো পাননি।

অলিভিয়া রদ্রিগো। রয়টার্স

ডিজনি থেকে ডায়েরির পাতা
অলিভিয়ার যাত্রা শুরু অভিনয় দিয়ে। ডিজনি চ্যানেলের ধারাবাহিক ‘বিজারভার্ক’-এ প্রথম পরিচিতি। পরে ডিজনি প্লাসের হিট সিরিজ ‘হাই স্কুল মিউজিক্যাল: দ্য মিউজিক্যাল: দ্য সিরিজ’-এ নিনি চরিত্রে অভিনয় করে কিশোর দর্শকদের প্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন।
অভিনয়ের এই পটভূমিই অলিভিয়াকে আলাদা সুবিধা দেয় রেকর্ডিং স্টুডিওতে। তাঁর প্রযোজক ড্যানিয়েল নিগ্রোর ভাষায়, ‘ক্যামেরা অন হলেই অলিভিয়ার পারফরম্যান্স যেন আরও গভীর হয়। তিনি গানের প্রতিটি শব্দ অভিনয় করে অনুভব করেন। মুখভঙ্গি, দেহভাষা—সব মিলিয়ে গান হয়ে ওঠে নাটকীয় অথচ সত্য।’

গুজব আর প্রজন্মের কণ্ঠস্বর
‘ড্রাইভার্স লাইসেন্স’ ঘিরে ব্যক্তিগত জীবনের গুঞ্জনও কম ছিল না। সহ-অভিনেতা জশুয়া বাসেটের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার ইঙ্গিত আছে কি না—তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা তুঙ্গে ওঠে। অভিনেত্রী-গায়িকা সাবরিনা কার্পেন্টারের নামও আলোচনায় আসে।
কিন্তু অলিভিয়া বরাবরই নির্লিপ্ত। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—গান কার জন্য লেখা, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো অনুভূতির সততা। তাঁর থেরাপিস্টও নাকি তাঁকে বলেছিলেন, বয়সে বড় হয়েও গানটির প্রতিটি আবেগের সঙ্গে তিনি সংযোগ খুঁজে পান। অর্থাৎ এটি কেবল কিশোর প্রেমের গল্প নয়—এটি ভাঙা হৃদয়ের সর্বজনীন ভাষা।

অলিভিয়া রদ্রিগো। রয়টার্স

টেইলর সুইফটের আশীর্বাদ
অলিভিয়া নিজেকে প্রকাশ্যে ‘সবচেয়ে বড় সুইফটি’ বলে দাবি করেন। তাই যখন টেইলর ইনস্টাগ্রামে তাঁকে অভিনন্দন জানান, সেটি তাঁর জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে। ঘুম থেকে উঠে বন্ধুর ফোনে খবর পেয়ে তিনি নাকি চিৎকার করে উঠেছিলেন।
অনেক সমালোচক অলিভিয়ার গানের ব্রিজ অংশের শক্তির তুলনা করেছেন টেইলর সুইফটের সঙ্গে। আবার ‘সাওয়ার’ অ্যালবামের একটি গানে সুইফটের সুরের প্রভাবও রয়েছে। তবে প্রভাব থাকলেও অনুকরণ নয়—অলিভিয়া দ্রুতই নিজের ভাষা তৈরি করেন।

‘সাওয়ার’: রাগ, হিংসা, অনিরাপত্তার খোলা খাতা
২১ মে ২০২১ মুক্তি পায় অলিভিয়ার প্রথম অ্যালবাম সাওয়ার। এটি কেবল একটি ভাইরাল হিটের পর তড়িঘড়ি করা অ্যালবাম নয়; বরং এক শিল্পীসত্তার ঘোষণা। পপ-পাঙ্কের রাগ, অন্তর্মুখী স্বীকারোক্তি, ঈর্ষা ও অপ্রাপ্তির খোলামেলা ভাষা—সব মিলিয়ে অ্যালবামটি যেন এক প্রজন্মের মানসিক ডায়েরি। অনেকেই তাঁর সংগীতে লর্ডে, ফিওনা অ্যাপেলের ছায়া খুঁজে পান। কিন্তু তাঁর রেফারেন্স জেন–জি প্রজন্মের—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুলজীবন, অস্থিরতা, আত্মসন্দেহ।

আরও পড়ুন

ডিজিটাল ঝড় ও সঠিক সময়
মহামারির সময় বড় শিল্পীদের নতুন গান প্রকাশ তুলনামূলক কম ছিল। সেই শূন্যতায় ‘ড্রাইভার্স লাইসেন্স’ যেন আবেগের বিস্ফোরণ ঘটায়। টিকটকে ভাইরাল ট্রেন্ড, গসিপ, চার্টের রেকর্ড, সমসাময়িক তারকাদের শুভেচ্ছা—সব মিলিয়ে এক ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ তৈরি হয়।
তবে শুধুই কৌশল নয়—অলিভিয়ার আসল শক্তি তাঁর লেখনী। তিনি ডায়েরির ভাষাকে গানে রূপ দেন। ব্যাকরণগত ভুল নিয়েও হাসতে পারেন—কারণ আবেগই তাঁর কাছে মুখ্য।

সামনে কোন পথ
সাফল্যের এই ঝড়ের মাঝেও অলিভিয়া নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করেন। টেকসই ফ্যাশন, পরিবেশ-সচেতনতা—এসব বিষয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, এই উন্মাদনার ভেতর কৃতজ্ঞ থাকাই তাঁর লক্ষ্য। মাত্র কয়েক সপ্তাহে ডিজনি তারকা থেকে বৈশ্বিক পপ আইকন—অলিভিয়া রদ্রিগোর এই উত্থান প্রমাণ করে, ডিজিটাল যুগে সৎ আবেগের শক্তি কতটা বিস্ময়কর হতে পারে।

ভোগ, বিবিসি ও টাইম অবলম্বনে