রুনা লায়লার গানে ‘বর্ণমালা’ চিনেছে ভারতের বিলুপ্তপ্রায় যে জাতি
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আলিপুরদুয়ার জেলার ভুটান সীমান্তবর্তী ছোট্ট গ্রাম টোটোপাড়া। এই এলাকায় বাস করে ভারতের অন্যতম প্রাচীন, ক্ষুদ্র এবং বিপন্ন জাতি ‘টোটো’। জনসংখ্যা অল্প, জীবনযাপনও অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। বহুদিন ধরেই তাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও ছিল না কোনো লিখিত বর্ণমালা। ফলে ভাষাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।
এই পরিস্থিতিতেই কয়েক বছর আগে টোটো ভাষার জন্য নিজস্ব বর্ণমালা তৈরি করে আলোচনায় আসেন ধনীরাম টোটো। ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে। তবে খুব কম মানুষই জানেন, এই বর্ণমালা তৈরির প্রেরণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার একটি গান।
ধনীরাম টোটো এক সাক্ষাৎকারে জানান, একদিন রেডিওতে তিনি শুনছিলেন রুনা লায়লার গাওয়া গান—‘তুমি আমি লিখি প্রাণের বর্ণমালা।’ গানটির এই লাইন তাঁর মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। তখনই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—যদি অন্য ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা থাকে, তবে তাঁদের টোটো ভাষার কেন থাকবে না? সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ গবেষণা ও প্রচেষ্টা। পরবর্তী সময়ে তিনি টোটো ভাষার জন্য একটি স্বতন্ত্র লিপি বা হরফ তৈরি করেন, যা এখন ‘টোটো-হরফ’ বা ‘তোত্বিকো আল্লাবেত’ নামে পরিচিত।
অন্যদিকে টোটো ভাষা সংরক্ষণের আরেকটি প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন ভক্ত টোটো। তিনি বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করেই লুপ্তপ্রায় এই ভাষাকে নথিভুক্ত করার উদ্যোগ নেন। স্থানীয়ভাবে টোটো ভাষায় শব্দ সংগ্রহ, গল্প লেখা এবং প্রাথমিক শিক্ষায় ভাষাটি ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনো কম নয়। পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার তোর্সা নদীর তীরে বসবাসকারী এই ছোট্ট জনজাতির সামনে ভাষা টিকিয়ে রাখার লড়াই এখনো চলমান। আধুনিক শিক্ষা, বহিরাগত সংস্কৃতির প্রভাব এবং সীমিত জনসংখ্যার কারণে ভাষাটি সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। তবু নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে টোটো সম্প্রদায়।
বিবিসি বাংলা অবলম্বনে