কাবাডির মাঠ থেকে গানের দুনিয়ায়, গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে অসমাপ্তই থেকে গেল অঙ্কিতের গল্প

অঙ্কিত বালিয়ান। শিল্পীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

জিমে শরীরচর্চা শেষে বের হচ্ছিলেন তিনি। হয়তো দিনের আর দশটা সন্ধ্যার মতোই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু জিমের দরজা পেরোতেই ওত পেতে থাকা হামলাকারীদের গুলিতে থেমে গেল জীবন। কয়েক মিনিটের মধ্যে উত্তর ভারতের জনপ্রিয় হরিয়ানার গায়ক, অভিনেতা ও ইউটিউবার অঙ্কিত বালিয়ানের জীবনের গল্প বদলে গেল শোকের গল্পে।

২৬ আগস্ট উত্তর প্রদেশের শামলি জেলায় জিমের বাইরে অঙ্কিত বালিয়ানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা একের পর এক গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি পুলিশ।

অঙ্কিতের মৃত্যু শুধু হরিয়ানার সংগীতজগতের আরেকটি অপরাধের খবর নয়। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম করে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। গ্রামের এক তরুণ কীভাবে খেলাধুলার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর নতুন পথ খুঁজে নিলেন, কীভাবে গান, অভিনয় আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন—আর সেই উত্থানের মধ্যেই কীভাবে অকালে থেমে গেল তাঁর পথচলা, সেটিই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়।

কাবাডি ছিল প্রথম ভালোবাসা
শামলি জেলার বান্টিখেরা গ্রামের ছেলে অঙ্কিত বালিয়ান। সংগীতজগৎ তাঁর প্রথম স্বপ্ন ছিল না বলেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তরুণ বয়সে তিনি কাবাডি খেলতেন এবং খেলাধুলাতেই ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু চোট তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

খেলার মাঠ থেকে সরে আসতে বাধ্য হওয়ার পর অনেকের মতো তিনিও হয়তো অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু থেমে থাকেননি। নতুন করে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজতে শুরু করেন। সেই খোঁজই তাঁকে নিয়ে যায় হরিয়ানভি বিনোদনজগতে।
হরিয়ানার সংগীতের বাজার তখন দ্রুত বদলাচ্ছিল। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন শিল্পীদের সামনে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। অঙ্কিতও সেই সুযোগ কাজে লাগান।

অঙ্কিত বালিয়ান। শিল্পীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

স্বপ্নের খোঁজে হরিয়ানায়
গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে অঙ্কিত চলে যান হরিয়ানায়। রোহতক ও সোনিপতের মতো শহরে কয়েক বছর ধরে সংগীত ও অভিনয়ের জগতে নিজের জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। শুরুটা সহজ ছিল না। প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ভিড়ে নতুন একজনের জন্য পরিচিতি পাওয়া ছিল কঠিন।

কিন্তু অঙ্কিত শুধু গায়ক হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। গান করেছেন, অভিনয় করেছেন, ইউটিউবের জন্য ভিডিও বানিয়েছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। ধীরে ধীরে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

এই দীর্ঘ চেষ্টার ফলও পেয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলের অনুসারী ছিল তিন লাখের বেশি। হরিয়ানার সংগীতের ডিজিটাল দুনিয়ায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিচিত নাম।

যে গান তাঁকে পরিচিতি দিল
অঙ্কিত বালিয়ানের সবচেয়ে আলোচিত গানগুলোর একটি ছিল ‘ভরি কোর্ট মে গোলি মারেঙ্গে মেরি জান’। বন্দুক, সহিংসতা ও দাপটের ভাষা হরিয়ানভি সংগীতের একটি জনপ্রিয় ধারার অংশ হয়ে উঠেছে বহুদিন ধরেই। অঙ্কিতের গানও সেই ধরনের শ্রোতাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।

কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই গানই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
যে শিল্পী গানে গুলি ও সহিংসতার প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, বাস্তব জীবনে তাঁকেই গুলিতে হত্যা করা হলো—এই ভয়াবহ মিল অনেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁর গান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু দাবি এবং সম্ভাব্য অপরাধী চক্রের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছেন। তবে এসবের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ভারতের উত্তর প্রদেশের শামলিতে জিম থেকে বের হওয়ার পর হরিয়ানার গায়ক ও ইউটিউবার অঙ্কিত বালিয়ানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কোলাজ

মৃত্যুর আগের সেই ভিডিও
অঙ্কিতের মৃত্যুর পর তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শেষ পোস্টও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হত্যার কিছু সময় আগে তিনি নতুন গান প্রচারের একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। সেই গানের কথাতেও ছিল হত্যা ও রাস্তার সহিংসতার উল্লেখ।

পরে বাস্তবেই রাস্তার কাছেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ব্যাখ্যা ও জল্পনা ছড়িয়েছে। কিন্তু তদন্তের বাইরে গিয়ে এসব জল্পনাকে সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পুলিশ এখনো হত্যার প্রকৃত কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

সন্ধ্যার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত
২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় শামলির সিটি কোতোয়ালি এলাকার একটি জিম থেকে বের হচ্ছিলেন অঙ্কিত। তখন মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন হামলাকারী তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে গুলির সংখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকলেও পুলিশ সূত্রে প্রায় ১৮টি গুলি চালানোর কথা বলা হয়েছে। অঙ্কিত একাধিক গুলিতে আহত হন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে। শামলি থেকে হরিয়ানা—সর্বত্র তাঁর ভক্ত ও পরিচিতজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, অঙ্কিত কারও ক্ষতি করেননি। তাঁরা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

সংগ্রাম ছিল, স্বপ্নও ছিল আরও বড়
মাত্র কয়েক বছর আগেও অঙ্কিত বালিয়ানের জীবন ছিল প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভরা। কাবাডির মাঠে চোট তাঁর প্রথম স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু তিনি নতুন স্বপ্ন খুঁজেছিলেন সংগীতে। সেই পথেও তাঁকে শুরু থেকে লড়াই করতে হয়েছে।

গ্রাম থেকে বেরিয়ে নতুন শহরে নিজের জায়গা তৈরি করা, গান প্রকাশ করা, দর্শক তৈরি করা—সব মিলিয়ে তাঁর সাফল্য রাতারাতি আসেনি। ধীরে ধীরে তিনি নিজের একটি পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর একাধিক নতুন গান ও প্রকল্পের কাজ চলছিল। সংগীতের পাশাপাশি অন্য ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন তিনি। কিন্তু সেই পরিকল্পনাগুলো আর বাস্তব হবে না।

টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে