গ্যারেজভর্তি দামি গাড়ি, চালক হিসেবে কেমন ছিলেন মহানায়ক
পর্দায় কখনো মোটরসাইকেলে পেছনে সুচিত্রা সেন, বাজছে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’। কখনো আবার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে দিব্যি পথ পাড়ি দিচ্ছেন। পর্দায় তাঁকে দেখে মনে হতে পারে, গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল চালানো উত্তমকুমারের কাছে ডাল–ভাত। বাস্তবের গল্পটা অবশ্য খানিকটা অন্য রকম।
৩ সেপ্টেম্বর উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মেছিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়, পরে যিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির ‘মহানায়ক’। জন্মের এক শ বছরপূর্তিতে কলকাতাজুড়ে তাঁকে ঘিরে চলছে নানা আয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ফিরে আসছে তাঁর সিনেমা, অভিনয়, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে কালজয়ী জুটির পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন ও যাপনের নানা গল্প। মহানায়ক কী খেতে ভালোবাসতেন, অবসর কাটাতেন কীভাবে, কী ছিল তাঁর শখ—এসব নিয়েও নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সেই যাপিত জীবনেরই একটি অধ্যায় তাঁর গাড়িপ্রীতি। গাড়ির প্রতি প্রবল দুর্বলতা ছিল মহানায়কের। নতুন মডেলের গাড়ির খবর রাখতেন, তারকাখ্যাতি বাড়ার সঙ্গে গ্যারেজেও যোগ হয়েছে একের পর এক গাড়ি। শুটিংয়ের ফাঁকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেও ভালোবাসতেন। অথচ উত্তম-ঘনিষ্ঠদের স্মৃতিচারণা বলছে, এত গাড়ির মালিক হয়েও চালক হিসেবে খুব স্বচ্ছন্দ ছিলেন না তিনি। বেশির ভাগ সময় স্টিয়ারিং থাকত তাঁর বিশ্বস্ত চালকদের হাতেই।
গ্যারেজে একের পর এক গাড়ি
উত্তমকুমারের তারকাখ্যাতি যত বেড়েছে, তাঁর গাড়ির সংগ্রহও তত সমৃদ্ধ হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর গ্যারেজে জায়গা করে নিয়েছিল মরিস, ডজ কিংসওয়ে, র্যাম্বলার, শেভ্রোলে ইম্পালা থেকে অ্যাম্বাসেডর, সে সময়ের অভিজাত ও আকর্ষণীয় সব গাড়ি।
এর মধ্যে ডজ কিংসওয়ের প্রতি উত্তমের বিশেষ টান ছিল বলে তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে। বিশাল আকৃতির এই মার্কিন গাড়ি সে সময় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত ছিল।
স্ত্রী-সন্তান কিংবা বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে গাড়িতে বেরিয়ে পড়তে পছন্দ করতেন উত্তম। শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যে অবসর পেলেই কখনো চলে যেতেন লং ড্রাইভে। গাড়ির প্রতি এই টান কেবল শহরের মধ্যে চলাফেরায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ষাটের দশকে শেভ্রোলে ইম্পালা নিয়ে ডায়মন্ড হারবারসহ কলকাতার আশপাশে ঘুরতে যাওয়ার কথাও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়।
ডজের পাশাপাশি তাঁর সংগ্রহে আসে র্যাম্বলার ও শেভ্রোলে ইম্পালার মতো গাড়ি। পরে গ্যারেজে জায়গা করে নেয় অ্যাম্বাসেডর। শেষ দিকে দুটি সাদা অ্যাম্বাসেডর ব্যবহারের কথা উত্তমের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন।
উত্তমের ব্যবহৃত একটি অ্যাম্বাসেডরের নম্বর ছিল ‘৮৭৮৭’। মৃত্যুর পরও গাড়িটি গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির গ্যারেজে ছিল। উত্তমের শেষযাত্রার স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে গাড়িটি। তাঁর মরদেহ এই গাড়িতে বাড়িতে আনা হয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণায় জানা যায়।
ছিল মরিসও
উত্তমকুমারের গাড়িপ্রীতির আরেক সাক্ষী মরিস মাইনর। তাঁর ব্যবহৃত এমনই একটি গাড়ির সন্ধান নিয়ে আগেও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রথম আলো।
গাড়িটির পরবর্তী মালিক ছিলেন হাওড়ার সুবোধ সেন। তাঁর বাবা কেদারনাথ সেন ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক। সেই সূত্রে উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। নতুন গাড়ি কেনার পর নিজের ব্যবহৃত মরিস মাইনরটি কেদারনাথ সেনের কাছে বিক্রি করেছিলেন উত্তম।
পরে উত্তমকুমার ও তনুজা অভিনীত ‘রাজকুমারী’ ছবিতেও গাড়িটি দেখা যায়। কিশোর কুমার ও আশা ভোসলের গাওয়া ‘বন্ধ ঘরের অন্ধকারে থাকব না’ গানের দৃশ্যের বড় অংশজুড়ে ছিল সেই মরিস মাইনর। অর্থাৎ গাড়ি শুধু মহানায়কের ব্যক্তিগত শখে আটকে থাকেনি, তাঁর সিনেমার পর্দাতেও জায়গা করে নিয়েছে।
গাড়ির খবরও রাখতেন
গাড়ি কিনেই আগ্রহ শেষ হয়ে যেত না উত্তমের। কোন নতুন মডেল বাজারে এল, গাড়ির যন্ত্রাংশ কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ—এসব নিয়েও আগ্রহ ছিল তাঁর। তাঁর দীর্ঘদিনের সহকারী সাধন বাগচীর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়, নিজের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতে ছিলেন মহানায়ক। গাড়িতে কোনো অস্বাভাবিক শব্দ শুনলে সেটি পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করতেন।
কলকাতার এন্টালি-সিআইটি রোড এলাকার এক গাড়ি ব্যবসায়ীর কাছেও নতুন মডেলের খোঁজ নিতে যেতেন বলে স্মৃতিচারণায় জানা যায়। সময় পেলেই গাড়ির গ্যারেজে ঢুঁ মারতেন।
কাজের প্রয়োজনে কলকাতার বাইরেও গাড়িতে যেতে হতো তাঁকে। সাধন বাগচী নদীয়ার করিমপুরে একটি অনুষ্ঠানে উত্তমকুমারের সঙ্গে অ্যাম্বাসেডরে যাওয়ার স্মৃতিও জানিয়েছেন।
মহানায়কের বিশ্বস্ত চালকদের মধ্যে ন্যাপা ও প্রভু নামের দুজনের কথা বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়। দীর্ঘ যাত্রা থেকে প্রতিদিনের শুটিং—উত্তমের ব্যস্ত জীবনের বহু পথের সঙ্গী ছিলেন তাঁরা।
কিন্তু গাড়ির প্রতি এত ভালোবাসা যাঁর, স্টিয়ারিংয়ে সেই উত্তম নিজে কেমন ছিলেন?
চালক হিসেবে কেমন ছিলেন
এখানেই গল্পে মজার বাঁক। পর্দায় তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই। গাড়ি চালানোর দৃশ্যে উত্তমের শরীরী ভাষা ছিল সাবলীল। অথচ তাঁর ছোট ভাই, অভিনেতা তরুণ কুমারের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, বাস্তবে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে খুব স্বচ্ছন্দ ছিলেন না উত্তম। তাই সাধারণত বিশ্বস্ত চালকের ওপরই গাড়ি চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন।
তবে নিজে যে একেবারেই স্টিয়ারিং ধরতেন না, তা নয়। গাড়ি চালানোর আগ্রহ ছিল তাঁর। ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়, কখনো কখনো শুটিং থেকে ফেরার পথে চালককে পাশে বসিয়ে নিজেই স্টিয়ারিং ধরতেন।
তাই বলা যায়, গাড়ির প্রতি ভালোবাসায় উত্তম ছিলেন পুরোদস্তুর ‘উত্তম’; চালক হিসেবে অবশ্য ততটা নন।
‘সপ্তপদী’র সেই মোটরসাইকেল
উত্তমকুমার আর বাহনের কথা উঠলে ‘সপ্তপদী’র কথা না বললেই নয়। ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া অজয় কর পরিচালিত ছবিটির ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক গানের দৃশ্য। মোটরসাইকেলে উত্তম, পেছনে সুচিত্রা সেন—এই দৃশ্য কয়েক প্রজন্মের বাঙালির কাছে প্রেমের এক আইকনিক ছবিতে পরিণত হয়েছে।
তবে মোটরসাইকেলের চেয়ে চার চাকার গাড়ির প্রতিই উত্তমের টান বেশি ছিল। ‘সপ্তপদী’–তে মোটরসাইকেলের দৃশ্যের জন্য তিনি প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় উল্লেখ আছে।
এখানেও অভিনেতা উত্তমের পেশাদারত্বের পরিচয় মেলে। পর্দায় মোটরসাইকেলের আরোহীর শরীরী ভাষা ও অভিব্যক্তিতে অস্বস্তির কোনো ছাপ রাখেননি। ক্যামেরার সামনে দৃশ্যটিকে করে তুলেছিলেন বিশ্বাসযোগ্য।
‘দেয়া নেয়া’য় চালক মহানায়ক
গাড়ির সঙ্গে উত্তমের পর্দার সম্পর্ক আরও জমে ওঠে ‘দেয়া নেয়া’য়। ১৯৬৩ সালের এই ছবিতে তাঁর চরিত্র প্রশান্ত রায়। ঘটনাচক্রে নিজের পরিচয় গোপন করে ‘হৃদয়হরণ’ নামে গাড়িচালকের কাজ নেন তিনি।
ফলে ছবিজুড়েই গাড়ির উপস্থিতি। এখানে গাড়ি কেবল যাতায়াতের বাহন নয়, গল্প এগিয়ে নেওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মালিক ও চালকের সম্পর্ক তৈরি থেকে সেই সম্পর্কের বদলে যাওয়া—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে যায় গাড়ি।
উত্তমের গাড়িপ্রীতি নিয়ে একটি গল্পও দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত—‘দেয়া নেয়া’র গাড়ি চালানোর দৃশ্য তিনি এতটাই উপভোগ করতেন যে কখনো কখনো পরিচালক ‘কাট’ বলার পরও আরও খানিকটা গাড়ি চালিয়ে যেতেন। তবে এই গল্পের নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক উৎস স্পষ্ট নয়। তাই মহানায়ককে ঘিরে প্রচলিত গল্প হিসেবেই এটিকে দেখা ভালো।
পর্দায় নিখুঁত চালক, তবে...
বাস্তবে গাড়ি চালানোয় খুব স্বচ্ছন্দ না হলেও পর্দায় চালকের ছোট ছোট অভিব্যক্তি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলতেন উত্তম। ‘দেয়া নেয়া’ তার বড় উদাহরণ। আবার ‘শুধু একটি বছর’-এ গাড়ি রেসিংয়ের দৃশ্যেও তাঁকে দেখা গেছে। স্টিয়ারিং ধরা থেকে সামনে তাকানোর ভঙ্গি—পর্দায় তাঁকে দেখে অনভিজ্ঞ চালক মনে হওয়ার সুযোগ নেই।
সেখানেই সম্ভবত অভিনেতা উত্তমের জয়। বাস্তবে যে মানুষটি নিজে গাড়ি চালানোর চেয়ে গাড়ি সংগ্রহ, যত্ন আর গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন, ক্যামেরার সামনে সেই তিনিই অনায়াসে হয়ে উঠতেন দক্ষ চালক।
আজ জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমারকে ঘিরে যখন নতুন করে এত চর্চা, তখন ফিরে আসছে তাঁর এমন অনেক গল্পও। সিনেমা ও অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর পোশাক, চুলের ধরন, প্রেম, বন্ধুত্ব, পছন্দের খাবার থেকে নানা শখ—‘মহানায়ক’-এর আড়ালে থাকা মানুষটিকেও যেন নতুন করে জানতে চাইছেন অনুরাগীরা। গাড়ির প্রতি তাঁর প্রবল ভালোবাসার গল্প সেই যাপিত জীবনেরই একটি অধ্যায়।