যৌনতা জীবনের স্বাভাবিক অংশ, মন্তব্য স্বস্তিকার

‘টক্সিক’–এর দৃশ্যে কিয়ারা ও যশ। পাশে স্বস্তিকা। কোলাজ

‘মাদার তেরেসার মতো চরিত্রেই অভিনয় করবেন বলে কি কিয়ারা চুক্তি করেছিলেন?’ ‘টক্সিক’-এ অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয়ের কারণে কিয়ারা আদভানিকে ট্রল করার ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখার্জি। তাঁর মতে, সিনেমা না দেখেই অভিনেত্রীদের নিয়ে মতামত তৈরি করে ফেলা সমাজের গভীর সংকটের লক্ষণ।

কিয়ারা আদভানি পর্দায় অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করেছেন—এতেই আপত্তি! আর সেই আপত্তির বড় কারণ, তিনি এখন বিবাহিত এবং একজন মা। দক্ষিণের তারকা যশের সঙ্গে ‘টক্সিক’ ছবিতে কিয়ারার ঘনিষ্ঠ দৃশ্য প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও ট্রলিং।

এবার সেই বিতর্কে কিয়ারার পাশে দাঁড়ালেন অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখার্জি। তাঁর সোজাসাপ্টা প্রশ্ন, একজন অভিনেত্রী বিয়ে করেছেন বা মা হয়েছেন বলেই কি তাঁর

অভিনয়ের চরিত্র বদলে যাবে?
গীতু মোহানদাস পরিচালিত ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’ মুক্তি পেয়েছে ২৬ আগস্ট। মুক্তির আগে ছবিটির ‘তাবাহি’ গান প্রকাশের পর থেকেই যশ ও কিয়ারার অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে কিয়ারাকে ঘিরেই সমালোচনার মাত্রা ছিল বেশি। অনেকেই তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়—বিবাহিত ও মা হওয়াকে সামনে এনে এমন দৃশ্যে অভিনয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বস্তিকা বলেন, কোনো সিনেমা না দেখেই সেটি নিয়ে মতামত তৈরি করে ফেলা খুবই উদ্বেগের বিষয়। তাঁর ভাষায়, মানুষ ছবির গল্প জানে না, চরিত্রের প্রেক্ষাপট জানে না, দৃশ্যটি কেন আছে বা কীভাবে ধারণ করা হয়েছে, সেটিও জানে না। তারপরও শুধু জানা যায়, ছবিতে অন্তরঙ্গতা আছে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় সমালোচনা।

স্বস্তিকার মতে, নারী ও অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা আরও বেশি। তাঁর প্রশ্ন, একটি কাজ না দেখেই যদি সেটি নিয়ে সমাজ চূড়ান্ত রায় দিয়ে ফেলে, তাহলে সেটি শিল্প ও শিল্পী—উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।
নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন স্বস্তিকা। ‘সাহেব বিবি গোলাম’ কিংবা ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’র মতো ছবিতে প্রগতিশীল ও প্রচলিত ধারণার বাইরে থাকা চরিত্রে অভিনয়ের কারণে তিনিও নানা সময়ে সমালোচিত হয়েছেন। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তাঁর দর্শক এখন জানেন, এসব মন্তব্যে তিনি খুব একটা বিচলিত হন না।
তবে কিয়ারাকে নিয়ে স্বস্তিকার প্রশ্ন আরও সরাসরি। ‘কিয়ারা বা অন্য কোনো অভিনেতা কি দর্শকদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করেছেন যে তাঁরা শুধু মাদার তেরেসার মতো চরিত্রেই অভিনয় করবেন?’

স্বস্তিকা মুখার্জি। অভিনেত্রীর ফেসবুক থেকে

‘মা হওয়া মানেই অভিনয়ে সীমাবদ্ধ হওয়া নয়’
কিয়ারা আদভানি ও অভিনেতা সিদ্ধার্থ মালহোত্রার ঘরে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই জন্ম নেয় কন্যাসন্তান সারায়াহ মালহোত্রা। এরপর মা হওয়ার বিষয়টি সামনে এনে ‘টক্সিক’-এ তাঁর অন্তরঙ্গ দৃশ্যের সমালোচনা করেন একদল নেটিজেন।
এই মানসিকতারও তীব্র সমালোচনা করেছেন স্বস্তিকা। তাঁর বক্তব্য, যৌনতা এখনো সমাজের অনেকের কাছে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
স্বস্তিকার মতে, যৌনতা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতাকেই সমাজ এখনো সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি।

যশের প্রশংসা, কিয়ারার সমালোচনা কেন
এই বিতর্কে এর আগে মুখ খুলেছিলেন ছবিটির ব্রিটিশ অভিনেতা বেনেডিক্ট গ্যারেটও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক ভিডিওতে তিনি যশ ও কিয়ারাকে নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে থাকা দ্বৈত মানসিকতার কথা তুলে ধরেন।
বেনেডিক্ট বলেন, যশের একই ধরনের দৃশ্য দেখে অনেকেই তাঁকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন, তাঁর আকর্ষণীয় উপস্থিতির প্রশংসা করছেন। অথচ কিয়ারার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তাঁর বিয়ে ও মাতৃত্বকে সামনে আনা হচ্ছে।

‘টক্সিক’–এ কিয়ারা ও যশ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

বেনেডিক্টের প্রশ্ন, একই কাজ করার জন্য একজন পুরুষ অভিনেতা প্রশংসা পাবেন আর একজন নারী অভিনেত্রী অপমানের শিকার হবেন কেন? তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, যশও বিবাহিত এবং তাঁর সন্তান রয়েছে। তাহলে সমালোচনার তির শুধু কিয়ারার দিকেই কেন?

বেনেডিক্টের মতে, যশ ও কিয়ারা দুজনই অভিনেতা। তাঁদের কাজ হলো চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। গল্পের প্রয়োজনে প্রেম, ঘনিষ্ঠতা, চুম্বন কিংবা যৌনতার অভিনয়ও সেই কাজের অংশ হতে পারে।

আরও পড়ুন

পর্দার চরিত্র আর ব্যক্তিজীবন এক নয়
বেনেডিক্টের মতে, দর্শকের একটি অংশ প্রায়ই অভিনেতার পর্দার চরিত্র ও বাস্তব জীবনকে গুলিয়ে ফেলে। কিন্তু অভিনয় তো বাস্তব জীবন যাপন করা নয়; অভিনয় হলো একটি চরিত্রকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা।

বেনেডিক্ট বলেন, কিয়ারা ও তাঁর স্বামী সিদ্ধার্থ মালহোত্রা নিশ্চয়ই বোঝেন, অভিনয়ের প্রয়োজনে একজন অভিনেত্রীকে কখনো প্রেম, ঘনিষ্ঠতা বা চুম্বনের দৃশ্যেও অভিনয় করতে হতে পারে। সেটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলন নয়, পেশাগত কাজেরই অংশ।

বেনেডিক্টের ভাষায়, সমালোচকেরা কিয়ারার অভিনয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না। তাঁরা মূলত তাঁকে কারও স্ত্রী এবং কারও মা হিসেবে বিচার করছেন। যেন বিয়ের পর একজন অভিনেত্রীর অভিনয়ের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যাওয়ার কথা।
এমন ধারণাকে বেনেডিক্ট ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ ও ভণ্ডামি বলেই মনে করেন।

বেনেডিক্ট নিজেও চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও টেলিভিশনে কাজ করেছেন। অন্তরঙ্গ দৃশ্য, নগ্নতা ও যৌনতার অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, অভিনয় কোথায় শেষ হয় এবং ব্যক্তিগত জীবন কোথায় শুরু হয়—এই সীমারেখা বোঝা জরুরি। তাঁর মতে, একজন অভিনেতার কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর অভিনয় দিয়ে, বৈবাহিক অবস্থা বা পারিবারিক পরিচয় দিয়ে নয়।

কেমন ‘টক্সিক’
গীতু মোহানদাস পরিচালিত ‘টক্সিক’ প্রযোজনা করেছেন ভেঙ্কট কে নারায়ণা ও যশ। ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছেন যশ। তাঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন কিয়ারা আদভানি, নয়নতারা, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া ও রুক্মিণী বসন্ত।
পর্তুগিজ শাসনের সময়কার গোয়াকে পটভূমি করে নির্মিত ছবিটির গল্প এক গ্যাংস্টারকে ঘিরে। ক্ষমতার উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতা হারানোর গল্পই উঠে এসেছে ছবিতে।

তবে মুক্তির পর ছবিটির গল্প, নির্মাণ ও অভিনয় নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে যশ ও কিয়ারার অন্তরঙ্গ দৃশ্য। আর সেই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আবারও সামনে নিয়ে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—পর্দায় একই কাজ করার পরও নারী ও পুরুষ অভিনেতাকে কি সমাজ একই চোখে দেখে?