default-image

২০১০ সালের ১৫ জুলাই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান ‘মহানায়ক’ বুলবুল আহমেদ। প্রয়াত গুণী এই অভিনেতার স্মৃতি ধরে রাখতে তাঁর পরিবার ও বুলবুল আহমেদ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রবীণ বরণীয় শিল্পীদের সম্মাননা দেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছর এ ‘মহানায়ক বুলবুল আহমেদ স্মৃতি সম্মাননা ২০২০’ দেওয়া হচ্ছে প্রবীণ অভিনেত্রী মীরানা জামানকে।

‘যেকোনো সম্মাননাই অনেক গৌরব এবং সম্মানের। বুলবুল ভাই আমার প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। সেই সম্পর্ক থেকেই তিনি অনেক আপনজন ছিলেন। এমন একজন মানুষের স্মৃতি সম্মাননা পদক পেয়ে কতটা যে ভালো লাগছে, সেটা বলে প্রকাশ করতে পারব না’—অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এমন কথা বলেন ৮১ বছর বয়স্ক প্রবীণ অভিনেত্রী মীরানা জামান। বয়সের ভারে কিছুটা কাবু করলেও পরিষ্কার শোনা যায় তাঁর কথাগুলো। মুঠোফোনে গুণী এই অভিনেত্রী বুলবুল আহমেদ সম্পর্কে আরও বলেন, ‘বুলবুল ভাই মানুষ এবং অভিনেতা হিসেবে অসাধারণ ছিলেন। কখনো উঁচু স্বরে কথা বলতেন না। একসঙ্গে আমরা অনেক শুটিং করেছি। সব সময় তাঁকে নম্রভদ্র দেখেছি। আবার কাজের সময় তিনি খুবই সরব থাকতেন। কো-আর্টিস্ট যদি কাজের সময় সহযোগিতা না করে, তাহলে ভালো অভিনয় কখনো সম্ভব হয় না। বুলবুল ভাই কাজের জায়গায় অত্যন্ত সত্য এবং হেল্পফুল ছিলেন। তিনি আমার চেয়ে বয়সে ছোট। সব সময় সবাইকে যোগ্য সম্মান করতেন। তাঁর অমায়িক আচরণ এখনো আমাকে মুগ্ধ করে। এমন গুণী মানুষের অকালপ্রয়াণ আমাকে ব্যথিত করেছে। তাঁর পরিবার থেকে আমাকে সম্মাননা পদক দেওয়া হচ্ছে শুনে মনে হয়েছে এটা আমার অন্যতম একটা সেরা উপহার।’

১৯৬২ সালে রেডিও পাকিস্তানের একটি নাটকে কণ্ঠ দিয়ে ক্যারিয়ারে পা রাখেন মীরানা জামান। এরপর গত প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক তিনি রেডিও, টিভি ও চলচ্চিত্রে সমানতালে অভিনয় করেছেন। অভিনয় করেছেন বেশ কটি মঞ্চনাটকে। এই সময়ে তিনি অসংখ্য বেতারনাটকে কণ্ঠ দিয়েছেন। এই অভিনেত্রী শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি ঠিক কতটি নাটকে অভিনয় করেছেন, সেই সংখ্যা বলতে পারেন না। শুধু এটুকু বলেন, একসময় বছরের পর বছর ধরে বিটিভির প্রায় প্রতিটি নাটকেই তাঁকে দেখা যেত।

default-image

বুলবুল আহমেদ ও মীরানা জামানের শুরুটাও মিল আছে। দুজনের ক্যারিয়ার শুরু হয় রেডিও দিয়ে। বুলবুল আহমেদ বাংলাদেশ বেতারের ঘোষক হিসেবে প্রথম ক্যারিয়ারে পা রাখেন। করোনার এই সময়ে বিটিভিতে প্রচারিত নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’তে একসঙ্গে অভিনয় করেছেন তাঁরা। বুলবুল আহমেদের সঙ্গে সেসব দিনের স্মৃতি সম্পর্কে মীরানা জামান বলেন, ‘আমরা তখন একসঙ্গে স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতাম। গল্পে যেমন আমরা ছিলাম পরিবারের মতো, তেমনি শুটিং সেটেও আমাদের পরিবারের মতোই সম্পর্কে ছিল। এই নাটক থেকে বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা আরও আপন হয়।’

১৫ জুলাই বুলবুল আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর চলে যাওয়ার ১০ বছর। দিনটি সামনে রেখে বুলবুল আহমেদ স্মৃতি সম্মাননা পদক দেওয়ার আয়োজন প্রসঙ্গে বুলবুল আহমেদ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তাঁর মেয়ে তাহসিন ফারজানা তিলোত্তমা বলেন, ‘যাঁরা আমাদের সংস্কৃতির জন্য অনেক করেছেন কিন্তু এখন বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে কিছু করতে পারেন না, তাঁদের স্মরণ করেই প্রতিবছর বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে সম্মাননা জানাই। মীরানা জামানের মতো গুণী মানুষকে সম্মাননা দিতে পেরে আমাদের ভালো লাগছে। এবার করোনার জন্য বড় করে তেমন কোনো আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না। সীমিত উপস্থিতিতে মীরানা জামানের বাসায় গিয়ে সম্মাননা পদকটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে।’

default-image

২০১৫ সালে ‘বুলবুল আহমেদ ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলা হয়। এই ফাউন্ডেশন থেকে চতুর্থবারের মতো এবার সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। এর আগে এই সম্মাননা পেয়েছেন অভিনেতা নাজমুল হুদা বাচ্চু, কেরামত মওলা এবং এ টি এম শামসুজ্জামান।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের একসময়ের সাড়া জাগানো এই নায়কের জন্ম ১৯৪১ সালে পুরান ঢাকায়। দারুণ মেধাবী ছিলেন বুলবুল আহমেদ। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল, নটর ডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষ করার পর একটি ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরির পাশাপাশি বুলবুল আহমেদ টিভিতে অভিনয় শুরু করেন। বুলবুল আহমেদ অভিনীত প্রথম টিভি নাটক ছিল আবদুল্লাহ আল-মামুনের পরিচালনায় ‘বরফ গলা নদী’। বুলবুল আহমেদ অভিনীত উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকগুলো হচ্ছে ‘মালঞ্চ’, ‘ইডিয়েট’, ‘মাল্যদান’, ‘বড়দিদি’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’। ধারাবাহিক ও খণ্ড নাটক মিলিয়ে চার শতাধিক নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত সর্বশেষ টিভি নাটক ছিল ২০০৯ সালে শুটিং করা ‘বাবার বাড়ি’। ১৯৭৩ সালে আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের (ইউসুফ জহির) ‘ইয়ে করে বিয়ে’র মাধ্যমে প্রথম সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন। এর পরের বছর আবদুল্লাহ আল-মামুনের ‘অঙ্গীকার’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। দুটি চলচ্চিত্র সে সময় দারুণ হিট হয়। তবে বুলবুল আহমেদ ঢাকাই সিনেমার দর্শকের কাছে চিরদিন শ্রদ্ধেয় হয়ে থাকবেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি দুই চরিত্র ‘শ্রীকান্ত’ ও ‘দেবদাস’-এ দুর্দান্ত রূপদান করে। ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ও ‘দেবদাস’—এই দুটি চলচ্চিত্র দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন সব শ্রেণির দর্শকের অন্তরে। এ ছাড়া ‘মহানায়ক’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘সূর্যকন্যা’ সিনেমাগুলোয় বুলবুল আহমেদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন অনন্য উচ্চতায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন