রুইতনের কাছেই বুঝি চলে গেলেন কাকলী...
আজ ৪ জুন। অভিনেত্রী রিশতা লাবণী সীমানার মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০২৫ সালের এই দিনে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষ হয়েছিল তাঁর জীবনসংগ্রাম। ১৪ দিনের লড়াইয়ের পর ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছেন স্বজনেরা, হয়েছে অস্ত্রোপচার, আইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ফেরেননি তিনি।
২০০৬ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিনোদন অঙ্গনে যাত্রা শুরু করেন সীমানা। এরপর ‘সাকিন সারিসুরি’ ধারাবাহিক দিয়ে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। পরে নাটক ও চলচ্চিত্র—দুই মাধ্যমেই নিজের উপস্থিতি জানান দেন। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পান। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন টেলিভিশনের পরিচিত মুখ।
ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময়েই অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সীমানা। কারণ, তিনি সময় দিতে চেয়েছিলেন সন্তানদের। ২০১৬ সালে প্রথম সন্তান শ্রেষ্ঠর জন্মের পর কাজ থেকে বিরতি নেন। পরে দ্বিতীয় সন্তান স্বর্গের জন্মের পর সেই বিরতি আরও দীর্ঘ হয়। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর শোবিজ অঙ্গন থেকে দূরে ছিলেন তিনি।
তবে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথা কখনো ভাবেননি। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দীর্ঘ বিরতির কারণে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। নিজের জায়গা ধরে রেখে লেগে থাকতে হয়, তাহলেই একসময় সাফল্য আসে।’ নতুন বাস্তবতায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। নতুন সিনেমা ও ওয়েব সিরিজ নিয়েও কথা চলছিল।
২০২৫ সালের ২১ মে রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। এরপর শুরু হয় জীবনমৃত্যুর লড়াই। ২৫ মে অস্ত্রোপচারও করা হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। অবশেষে ৪ জুন সকালে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে যান না-ফেরার দেশে।
সীমানার মৃত্যুর পর চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। সেদিনের একটি দৃশ্য এখনো অনেকের মনে গেঁথে আছে। চারদিকে শোকের আবহ, কান্না আর বিদায়ের আয়োজন। কিন্তু তাঁর দুই ছেলে—শ্রেষ্ঠ ও স্বর্গ—তখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি কী ঘটেছে। তারা খেলছিল, দৌড়াচ্ছিল, মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। উপস্থিত অনেকের চোখ ভিজে উঠেছিল সেই দৃশ্যে।
বড় ছেলে শ্রেষ্ঠ তখন বলেছিল, ‘মায়ের ইচ্ছে ছিল আমাকে ক্যাডেটে পড়াবে। কিন্তু মা তো মারা গেছে, আমার আর ভালো লাগছে না।’
মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে খুব দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাননি সীমানা। কিন্তু দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য সময়ের দৈর্ঘ্যই সব নয়।
‘রুইতনের কাছেই বুঝি চলে গেলেন কাকলী!’—সেদিন সীমানার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য মন্তব্য দেখা গিয়েছিল। বৃন্দাবন দাসের লেখা ও সালাউদ্দিন লাভলু পরিচালিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক সাকিন সারিসুরি-তে কাকলী চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন সীমানা। নাটকের শেষদিকে গুলিতে মৃত্যু হয় মোশাররফ করিম অভিনীত রুইতন চরিত্রটি। সীমানার মৃত্যু যেন অনেক দর্শককে ফিরিয়ে নিয়েছিল সেই গল্পের আবেগে।