কেবিন নম্বর ১০৩, এখন কেমন আছেন ৫০০ নাটকের অভিনেতা রিফাত চৌধুরী

রিফাত চৌধুরী। ছবি : ফেসবুক থেকে

শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন কবি ও অভিনেতা রিফাত চৌধুরী। প্রথম কদিন থাকতে হয়েছে হাসপাতালের মেঝেতেই। তাঁর অসুস্থতার খবর গণমাধ্যমে উঠে এলে দুদিন আগে কেবিন পেয়েছেন। নতুন ভবনের দশম তলায় গতকাল বুধবার তাঁর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। দুই ঘণ্টার আড্ডায় উঠে আসে রিফাত চৌধুরীর নানান অজানা কথা।

এখন কেমন আছেন রিফাত চৌধুরী
অসুস্থতাটা তিন বছরের। টানা ১০ কদমও হাঁটতে পারেন না। হঠাৎ করেই পা অবশ হয়ে যায়। এর মাঝে কয়েকবার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছেন। সর্বশেষ একটি নাটকের শুটিং করছিলেন, সেখানেই মাথা ঘুরে পড়ে যান। এরপর চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মেঝে থেকে এখন ঠিকানা কেবিন নম্বর ১০৩।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ রিফাত চৌধুরীর খবর রাখছে। বিভিন্ন বিভাগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। চিকিৎসকেরা সেসব পর্যালোচনা করার পর মূল চিকিৎসা শুরু হবে। শারীরিক অবস্থা নিয়ে রিফাত চৌধুরী বলেন, ‘এখন কিছুটা ভালো অনুভব করছি। তবে মূল চিকিৎসা শুরু হলে বাকিটা বলতে পারব। প্রথমে তো শঙ্কায় ছিলাম, চিকিৎসা কি পাব? এরপর আমার এক ডাক্তার বন্ধু ফেসবুকে খবরটি দিল। এরপর যা করার আপনারা (গণমাধ্যম) করেছেন। এর মাঝে কেবিন পেলাম। কর্তৃপক্ষ নিয়মিত খবর নিচ্ছেন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ কল করছেন। অবাক হচ্ছি, আগে তো ভাবিনি যে এত লোক আমাকে ভালোবাসে। আমি ভালো আছি।’

কথা বলার মাঝেই নার্স, হাসপাতালের কর্মকর্তা থেকে ইলেকট্রিশিয়ান। বারবার রিফাত চৌধুরীর খবর নিতে আসছিলেন। সব ঠিকঠাক কি না। কিছু প্রয়োজন কি না। সবার উদ্দেশে রিফাত চৌধুরীর একই কথা, ‘আরে আপনারা এত উদ্গ্রীব হবেন না, আমি ভালো আছি।’

কখনো অভিনেতা হতে চাননি
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে পাঁচ শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন রিফাত চৌধুরী। ‘হাউসফুল’, ‘এইম ইন লাইফ’, ‘পাটিগণিত’, ‘ফোর টোয়েন্টি’, ‘সিক্সটি নাইন’, ‘বনমানুষ’, ‘বাইসাইকেল’, ‘৪২০’, ‘ক্যারাম’, ‘মুড়ির টিন’সহ বহু জনপ্রিয় নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে। বিশেষ করে ‘সিক্সটি নাইন’ নাটকের ‘জাতীয় কাকা’ চরিত্রটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেলেও রিফাত চৌধুরী কখনো অভিনেতা হতে চাননি। কবিতা ও কবি পরিচয় নিয়েই বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি।

তবে জীবনধারণের প্রয়োজনেই একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। বন্ধুদের আড্ডার মধ্যে একটি নাটকে অভিনয়ের প্রস্তাব আসে। মজা করতে করতে রাজি হয়ে যান। সেখান থেকেই শুরু। রিফাত চৌধুরী বলেন, ‘অভিনেতা হিসেবেই তো সবাই আমাকে চেনেন। তবে এই বয়সে এসেও সত্যিটা বলছি। আমি কখনোই অভিনেতা হতে চাইনি। জীবনের আর্থিক প্রয়োজনে আমি এখানে এসেছিলাম। আমি যে কাজগুলো করি, এগুলো অভিনয় না, যতটা বাস্তবের কাছাকাছি যাওয়া যায়।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন কবি ও অভিনেতা রিফাত চৌধুরী। প্রথম আলো

এখন পর্যন্ত রিফাত চৌধুরীর মোট ২৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘আলিঙ্গনের নাম’। কবি পরিচয়ই দিতেই তৃপ্তি অনুভব করেন তিনি। বলেন, ‘অভিনয় করার কোনো প্যাশন ছিল না যে অভিনয় করব। আমার মূল হলো লেখালেখি। লেখালেখির সুবাদেই নিজেকে বেশি প্রকাশ করতে পারি এবং তৃপ্তি পাই। আমি কবি হয়েই বাঁচতে চেয়েছিলাম।’

৬৫ বছরকে দেখছেন ‘বোনাস’ হিসেবে
এই বয়সে এসে জীবনকে বোনাস হিসেবে দেখেন রিফাত চৌধুরী। এত দিন বাঁচতে হবে, এ করতে হবে, ও করতে হবে এসব নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই রিফাত চৌধুরীর। তবে সুস্থ হলে আর অভিনয় নয়, নাটক পরিচালনার ইচ্ছা আছে তাঁর। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে রিফাত চৌধুরী বলেন, ‘আমার সময় ফুরিয়ে আসছে, আর বেশি দিন হয়তো থাকব না। ৬৫ বছর তো এনাফ। অনেক আগেই মরে যাওয়া উচিত ছিল, এতটা দিন বোনাস পেয়েছি।’

সুস্থ হওয়ার পর আর কি অভিনয়ে দেখা যাবে প্রশ্নে এই অভিনেতা বলেন, ‘আমি যদি সুস্থ হয়ে উঠি, তাহলে আমি আর অভিনয় করব না। আমি টেলিভিশনে নাটক বানাব।’

আরও পড়ুন

সরকারি সহায়তা চান না
বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার থেকে ফলাদি এসবে বেশ ভালো অঙ্কের টাকা খরচ হচ্ছে রিফাত চৌধুরীর। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও এই শরীর নিয়ে আপাতত কাজ না করে বিশ্রামে থাকতে হলে টাকার প্রয়োজন। তবে সে অর্থ আসবে কোত্থেকে? রিফাত চৌধুরী কি সরকারি সহায়তা চান? এ প্রশ্নে খানিকটা ক্ষোভ নিয়ে অভিনেতা বলেন, ‘কখনো নয়, সরকারই তো জনগণের টাকায় চলে। আমি কেন সাহায্য চাইব। আমি তো নাগরিকই না, আমি “অনাগরিক”, আমার জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, পাসপোর্ট নেই, হোল্ডিং নম্বর নেই। আমি যদি নাগরিক হতাম, এগুলো আমার থাকত না? সরকার আমাকে এগুলো দিয়েছে? আমার মৌলিক চাহিদা পূরণ করেছে?’

বিদায় দিতে দিতে এক আক্ষেপের কথা জানান রিফাত চৌধুরী। অভিনয়জীবন ও সাহিত্যজীবনে প্রকাশকদের কাছ থেকে পাওনা সম্মানীর অর্থ না পাওয়ার আক্ষেপ। পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংবাদমাধ্যম তাঁর বইকে নিয়মিতভাবে সামনে আনলে তাঁর কবিতাও অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারত।