ফরীদি ভাই বললেন, ‘তুই আমেরিকা যেতে পারতি, অ্যাটলিস্ট থাইল্যান্ড বলতি’
ঘটনাটা ১৯৯৩ সালের এক সন্ধ্যার। মাত্রই শেষ হলো ‘কেরামত মঙ্গল’ মঞ্চনাটকের প্রদর্শনী। এবার থিয়েটারকর্মীরা সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক হওয়ার। মঞ্চে কার কী ভুল, আরও কীভাবে নাটকটি ভালো করা যেত—সেসব নিয়ে কথা বলতে জড়ো হচ্ছেন সবাই। এই সবাই বলতে নাসির উদ্দীন ইউসুফ, হুমায়ূন ফরীদি, আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফা, শহীদুজ্জামান সেলিমসহ ঢাকা থিয়েটারের অনেকে। নাটক ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শেষ হওয়ার পরেই সবাইকে উদ্দেশ করে হুমায়ূন ফরীদি বলেন, ‘এবার আমার একটা কথা আছে।’
এ কথা বলেই হুমায়ূন ফরীদি সোজা উঠে গেলেন মঞ্চে। সবার সামনে ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের ফারুক অবশেষে বিয়ে করছে। এই বিয়েতে তো কিছু দিতে হয়। আমি ফারুকের বিয়ের পরে হানিমুনে যাওয়ার টিকিট দেব। সে পৃথিবীর যে দেশে যাবে, সেই দেশে যাওয়া–আসার প্লেনভাড়া আমার।’ এ তথ্য জানিয়ে ফারুক আহমেদ আরও বলেন, এরপর সবাই ঘিরে ধরলেন অভিনেতাকে। কারণ, তাঁর বিয়ে ঢাকা থিয়েটারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছিল।
সেই ঘটনা নিয়ে ফারুক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি থিয়েটারের আরেক সহকর্মী নাসরিন নাহারকে পছন্দ করতাম। তাঁকে জানিয়েছিলাম পছন্দের কথা; কিন্তু সে বিয়েতে রাজি হচ্ছিল না। এর কারণ একই থিয়েটারে এসে প্রেম–বিয়ে নিয়ে কথা হবে। যে কারণে এই বিয়েতে নাসরিনের মত ছিল না। আমিও গোঁ ধরে বসে ছিলাম। বলে দিয়েছিলাম, তাঁকে ছাড়া বিয়ে করব না। তত দিনে আমাদের এই খবর সবাই জেনে যায়। একসময় আমাদের দেখলেই হাসিঠাট্টা শুরু হয়ে যেত। এভাবে সাত বছর চলার পরে নাসরিন বিয়েতে রাজি হয়। সেই খবরে খুশি হয়ে হুমায়ূন ফরীদি ভাই সবার সামনে এই ঘোষণা দেয়।’
পরিবার থেকে বারবার বিয়ের কথা বলা হলেও ফারুক আহমেদ বিয়ে করেননি। এবার আর কোনো বাধা নেই। তাঁদের ধুমধামে বিয়ে হয়ে যায়। ‘মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি বিয়েও করেছি হুমায়ূন ফরীদি ভাইয়ের গাড়িতে। ফরীদি ভাই বিয়ের আগে ফোন দিয়ে বললেন, ‘ফারুক বিয়ের আগে আমার গাড়ি নিস। আমার গাড়িতে বিয়ে করবি।’ ফরীদি ভাই আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। পরে তো বিয়ের প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। এমন সময় ফরীদি ভাই ডাকলেন।’
বিয়ের আগেই হুমায়ূন ফরীদি ডেকে বললেন, ‘তুই বিয়ের পরে কোথায় যাবি?এখনই বল। কবে কোথায় কোন দেশে যেতে চাস?’ এ সময় ফারুক আহমেদ বলেছিলেন, ‘আমি কক্সবাজার যাব।’ শুনে বেশ অবাক হয়েছিলেন ফরীদি। সেই স্মৃতিচারণা করে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘ফরীদি ভাই অবাক হয়ে বললেন, “তুই আমেরিকা যেতে পারতি, অ্যাটলিস্ট থাইল্যান্ড বলতি। তুই বললি কক্সবাজার। এখনো সময় আছে বিদেশে যা। বিয়ের পরে কিছুদিন কাটিয়ে আয়।” ফরীদি ভাই মন খারাপ করেছিলেন, তবে এর মধ্যে ভালোবাসা ছিল।’
ফারুক জানান, সেই সময় তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তারপরও চাইলে বিদেশে যেতে পারতেন। কিন্তু আগে থেকেই তাঁরা পরিকল্পনা করেছিলেন দেশে—কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে যাবেন হানিমুনে। ‘ফরীদি ভাই টিকিট পাঠিয়েছিলেন। বিয়ের তিন দিন পরেই আমরা কক্সবাজার চলে আসি। আমার স্ট্র্যাগলের সময় অনেকেই নানাভাবে সহায়তা করেছেন। এর কারণ, সবাই আমাকে খুবই পছন্দ করতেন। একজন সহকর্মীর পাশে সবাই থাকেন—সেই চর্চাটা তখন ছিল।’
৩৩ বছর আগের হানিমুনের সেই ছবি সম্প্রতি ফেসবুকে পোস্ট করে ফারুক আহমেদ লিখেছেন, ‘৩৩ বছর আগের ছবি খুঁজে পেলাম। বিয়ের পর হানিমুন, কক্সবাজারে। তখন কে জানত আমি আর নাসরিন হুমায়ূন আহমেদের ‘আজ রবিবার’ নাটকে মতি আর ফুলি হব? জীবন এত ছোট ক্যানে?’
কথা প্রসঙ্গে মজার ঘটনা ভাগাভাগি করলেন এই অভিনেতা। তিনি জানান, অনেকেই মনে করেন, এই অভিনয়শিল্পীদ্বয়ের মধ্যে প্রেম হয়েছে ‘আজ রবিবার’ নাটকের শুটিং সেটে। ‘এ নাটকের শুটিংয়ের সময় আমরা তখন বিবাহিত। আমাদের সন্তানেরও তখন জন্ম হয়েছে। এই নাটক থেকেই আমরা দুজন একসঙ্গে জনপ্রিয়তা পাই। অবস্থা এমন হতো যে আমরা একসঙ্গে বাইরে বের হতে পারতাম না। সেই সময় একবার ঈদের আগে একটি জুতার দোকানে কেনাকাটা করতে গেলে আমাকে একনজরে দেখতে সবাই ঘিরে ধরেছিল। তখন দোকানদার আমাকে বলেছিলেন, পরে আসতে। এমন বহু ঘটনা রয়েছে।’
‘আজ রবিবার’ নাটকের পর ক্যারিয়ারে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একের পর এক দর্শকপ্রিয় সব কাজ দিয়ে পরিচিতি বাড়িয়েছেন এই অভিনেতা; কিন্তু ক্যারিয়ারে ফারুক আহমেদ যতটা এগিয়েছেন, ততটাই পিছিয়েছেন তাঁর স্ত্রী নাসরিন নাহার। এ প্রসঙ্গে নাসরিন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম সংসার করতে। কারণ, দুজনই যদি সংসার করি, তাহলে সন্তান দেখবে কে? একজনকে ছাড় দিতে হবে। তখন আমি অভিনয় থেকে সরে যাই। তবে মঞ্চে ছাড়িনি। এখনো মঞ্চে অভিনয় করে যাচ্ছি।’
এই দম্পতির ৩৩ বছরের সংসারে এক কন্যাসন্তান রয়েছে। সংসার নিয়েও তাঁরা খুশি। সর্বশেষ তাঁদের একসঙ্গে দেখা গেছে ‘রঙমহাল’ মঞ্চনাটকে। এটি নির্দেশনা দিয়েছেন ফারুক আহমেদ। সবশেষে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘জীবন, সংসার ও কর্ম নিয়ে ভালো আছি। এটা ৩৩ বছরের সংসার থেকে বড় প্রাপ্তি।’