শখের গাড়ি বিক্রি, চিকিৎসার বিল দিতে হিমশিম—নির্মাতার কঠিন লড়াই
গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি এক সকাল। সবকিছু তখনো স্বাভাবিক ছিল—অন্তত বাইরে থেকে তা–ই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেই সকালই বদলে দেয় এক নির্মাতার জীবন, এক পরিবারের ছন্দ, এক স্বপ্নের গতিপথ। চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহনেওয়াজ কাকলী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাত–পা ঝিমঝিম, খেতে না পারা ও অস্বস্তি—সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে উপসর্গ। শেষমেশ পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতালে নেওয়ার। পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তিনি স্ট্রোক করেছেন।
স্ট্রোকের পর প্রথমে দুটি হাসপাতালে টানা এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন শাহনেওয়াজ কাকলী। এরপর বাসায় নেওয়া হয়। কিন্তু সুস্থতার পথ ছিল আরও দীর্ঘ।
সপ্তাহখানেক পর শুরু হয় থেরাপি। ঢাকার মিরপুরের সিআরপিতে (পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র) শুরু হয় নিয়মিত চিকিৎসা। প্রথম দফায় টানা দুই মাস সিআরপিতে থেকে থেরাপি নেন। এরপর এক মাস বাসায় চিকিৎসা। আবার এক মাস ধরে তিনি সিআরপিতে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিদিন তিনটি থেরাপি—ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও স্পিচ থেরাপি। এ তিনটি থেরাপিই এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সকাল থেকে বিকেল শরীরকে আবার নতুন করে হাঁটা শেখানো, হাত তুলতে শেখানো ও শব্দ উচ্চারণ শেখানো।
অভিনয়শিল্পী স্বামী প্রাণ রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু খুব ধীরে। আগে স্ট্রেচারে করে আনতাম, এখন হুইলচেয়ারে আনি। দুই পাশে দুজন ধরলে ১০–১২ পা এগোতে পারে। বাঁ হাত–পা এখনো নড়াতে পারে না। কথা বলতে পারে, কিন্তু মুখ বেঁকে যায়।’
একসময় ক্যামেরার সামনে শিল্প নির্দেশনায় নিখুঁত দৃশ্য সাজানো মানুষটি আজ নিজের শরীরের জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। হাতের পেশি ঢিলে হয়ে গেছে। থেরাপির শুরুর দিকে ব্যথা এতটাই তীব্র ছিল যে থেরাপি নিতে যেতে চাইতেন না। অভিযোগ করতেন, ‘ব্যথা দেয় সবাই।’ ব্যথা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করতেন। এখন সহনশীলতা বেড়েছে, কিন্তু ব্যথা যায়নি।
প্রতিদিনের থেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা মিলিয়ে খরচ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। চার মাসে ব্যয় হয়েছে অনেক টাকা। প্রাণ রায় বলেন, ‘আমাদের জমানো টাকা শেষ। “ফ্রম বাংলাদেশ” সিনেমা বানানোর জন্য যে টাকা জমা ছিল, সেটাও চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে। শখের গাড়ি ছিল, সেটাও বিক্রি করে দিয়েছি। হাসপাতালের খরচ আছে, বাসার খরচ আছে—সব মিলিয়ে জীবনের খুব কঠিন সময় পার করছি।’
চার বছর আগে কেনা সেই গাড়ি ছিল শাহনেওয়াজ কাকলী ও প্রাণ রায়ের খুবই শখের একটি বাহন। শুটিং, লোকেশন দেখা ও পারিবারিক ভ্রমণ—সব স্মৃতির সঙ্গী। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে না পেরে সেটিও আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে প্রাণ রায় নিজেও চার মাস কোনো শুটিং করতে পারেননি। তাই আয়রোজগারও নেই সেই অর্থে। জমানো টাকাই খরচ হচ্ছে। শুটিং করতে না পারার কারণ হিসেবে বলেন, ‘কাকলীর জন্য সারাক্ষণ একজন মানুষ লাগে। বাসায় একা রেখে বাইরে গেলে কোনো কাজে মন বসে না। সারাক্ষণ টেনশনে থাকতে হয়।’
শাহনেওয়াজ কাকলী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সংবেদনশীল ও মানবিক গল্পকার হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রথম ছবি ‘জলরং’ মুক্তি না পেলেও ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘উত্তরের সুর’ তাঁকে এনে দেয় বিশেষ পরিচিতি। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা ছবি, পার্শ্ব অভিনেত্রী ও শিশুশিল্পী—এই তিন বিভাগে পুরস্কার পায়। দেশ–বিদেশের বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হয়, প্রশংসা কুড়ায়। ২০১৫ সালে তাঁর ‘নদীজন’ মুক্তি পায়। ছবিটিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। নদী, মানুষ, জীবনসংগ্রাম—কাকলীর গল্পে ছিল মাটির গন্ধ, ছিল প্রান্তিক মানুষের কথা।
নিয়মিত টেলিভিশন নাটক, চিত্রনাট্য ও শিল্প নির্দেশনার কাজও করতেন কাকলী। ২০২২ সালে শুরু করেন নতুন স্বপ্ন, ‘ফ্রম বাংলাদেশ’। শুটিং শেষ, পোস্ট–প্রোডাকশনের কাজও প্রায় সম্পন্ন। কিন্তু নির্মাতার অসুস্থতা ও নানা সংকটের কারণে ছবিটি এখনো মুক্তি পায়নি। বলা যায়, একজন নির্মাতার নিজের জীবনের গল্পই যেন থেমে আছে মুক্তির অপেক্ষায়।
স্ট্রোকের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডে ভুগছিলেন কাকলী। চিকিৎসাও চলছিল। কিন্তু অক্টোবরের সেই সকালে উপসর্গ হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে। পরিবার দেরি না করে হাসপাতালে নেয়। শেষমেশ নিশ্চিত হয় স্ট্রোক। স্ট্রোক শুধু শরীরের একাংশকে পঙ্গু করে না, বদলে দেয় জীবনযাত্রা, সম্পর্ক, স্বপ্ন—সবকিছুর গতি।
কয়েক মাস আগেও যাঁর নির্মাণে দর্শক হাসতেন, কাঁদতেন, ভাবতেন; আজ তাঁর পরিবার অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা কত দিন চলবে, নিশ্চিত নয়। জমানো টাকা প্রায় শেষ। বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় কোনোমতে চিকিৎসা চলছে। প্রাণ রায়ের কণ্ঠে ক্লান্তি, কিন্তু হাল ছাড়েননি—‘সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু চাই, কাকলী যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।’
একজন নির্মাতা যখন গল্প বলেন, তিনি সমাজের স্মৃতি ও অনুভূতিকে ধারণ করেন। শাহনেওয়াজ কাকলীর এই লড়াই তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, শিল্প–সংস্কৃতিরও বেদনাদায়ক অধ্যায়। যে মানুষটি পর্দায় আলো জ্বালাতেন, আজ তাঁর ঘরেই আলো জ্বালিয়ে রাখার সংগ্রাম চলছে। তবু আশা আছে, কারণ শিল্পীরা সহজে হার মানেন না। হয়তো একদিন আবার ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেই বলবেন, ‘অ্যাকশন’, ‘কাট’।