সিডনিতে ৭০ দেশের ২৪০ ছবির ভিড়ে বাংলাদেশের ‘মাস্টার’ নিয়ে উচ্ছ্বাস

‘মাস্টার’ সিনেমার দৃশ্যে নাসির উদ্দিন খান ও শরীফ সিরাজছবি: নির্মাতার সৌজন্যে

মর্যাদাপূর্ণ সিডনি চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৩তম আসরে উড়ল বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। ৩ জুন শুরু হওয়া ১২ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক উৎসবে বিশ্বজুড়ে আলোচিত সব চলচ্চিত্রের ভিড়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৪ জুন প্রিমিয়ার হয়েছে তরুণ বাংলাদেশি নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের রাজনৈতিক থ্রিলার চলচ্চিত্র ‘মাস্টার’।
এবারের উৎসবে ৭০টির বেশি দেশ থেকে নির্বাচিত ২৪০টির বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে, যার মধ্যে সরাসরি কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে আসা ২৬টি চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে স্থান পাওয়া মাত্র পাঁচটি চলচ্চিত্রের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে ‘মাস্টার’-এর এই অন্তর্ভুক্তি বাংলা সিনেমার এক গৌরবমণ্ডিত অর্জন।

এর আগে চলচ্চিত্রটি গত জানুয়ারিতে নেদারল্যান্ডসের ৫৪তম রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারে মর্যাদাপূর্ণ ‘বিগ স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড’ জয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে।

নির্মাতা ও প্রযোজক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত

মোহগঞ্জের দর্পণে বাংলাদেশের রাজনীতি
চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ও প্রযোজক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত সিডনিতে প্রথম আলোকে জানান, ‘মাস্টার’ মূলত একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাল্পনিক উপজেলা ‘মোহগঞ্জ’-এর স্থানীয় রাজনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তা রূপক অর্থে পুরো বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী মহলের মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় আঁতাতকে নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে। উন্নয়নের নামে করপোরেট স্বার্থে প্রান্তিক মানুষের উচ্ছেদ ও তার বিপরীতে টিকে থাকার লড়াই এই চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রে একজন আদর্শবাদী শিক্ষকের রাজনীতিতে পদার্পণ এবং ক্ষমতার মোহে তাঁর নৈতিক রূপান্তর ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার এক ধূসর বাস্তবতাকে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে গতকাল অস্ট্রেলিয়ার মূল স্রোতের মানুষজনও ছবিটির প্রশংসা করেছেন।

এবারের উৎসবে ৭০টির বেশি দেশ থেকে নির্বাচিত ২৪০টির বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে
আয়োজকদের সৌজন্যে

জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দিন খান। এ ছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, ফজলুর রহমান বাবু, লুৎফর রহমান জর্জ, শরিফ সিরাজ ও তাসনোভা তামান্না। চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণ করেছেন তুহিন তামিজুল এবং এর চূড়ান্ত সম্পাদনা ও শব্দ মিশ্রণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও বুসানে।
সিডনি চলচ্চিত্র উৎসবের অনুষ্ঠানপ্রধান জাস্টিন মার্তিনিয়ুক এই চলচ্চিত্রটির গভীরতা ও নারী অধিকারের মতো বহুস্তরীয় বিষয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ ছাড়া উৎসবের নান্দনিকপ্রধান সুমিতের গল্পের গাঁথুনি নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া উৎসব পরিচালক নেশেন মোডলি সুমিতের গল্পের গাঁথুনি নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে এশীয় চলচ্চিত্র গবেষক ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘সিডনি চলচ্চিত্র উৎসবের মতো বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্মে “মাস্টার” চলচ্চিত্রের অস্ট্রেলিয়ান প্রিমিয়ার আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত তাঁর অসাধারণ নির্মাণশৈলী দিয়ে স্থানীয় রাজনীতি বাস্তবতাকে আন্তর্জাতিক ভাষায় রূপান্তর করেছেন বলে প্রশংসা শুনছি। এটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থানের এক নতুন মাইলফলক। আমি সিডনি যাচ্ছি, ৮ জুন সেখানে সবার সঙ্গে ছবিটি দেখব।’

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও টেলিভিশন উপস্থাপক তানভীর আহমেদ বলেন, ‘চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে বাস্তবতার যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপ দেওয়া হয়েছে, তা এককথায় অনবদ্য। সিডনির প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির জন্য এটি একটি বিশাল উৎসবের মতো। বিশ্বমঞ্চে আমাদের নিজস্ব গল্প এভাবে সাহসের সঙ্গে উঠে আসছে দেখে একজন প্রবাসী হিসেবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।’

‘মাস্টার’ সিনেমার পোস্টার

সিডনিতে বসবাসরত স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চলচ্চিত্র শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘রটারডামে সেরা পুরস্কার জেতার পর সিডনি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে “মাস্টার”-এর আগমন বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করল। ছবির গল্পের গাঁথুনি ও নির্মাণকৌশলে যে পরিপক্বতা রয়েছে, তা আমাদের সিনেমাকে বিশ্বদরবারে নতুন মর্যাদায় আসীন করবে।’

সিডনিতে চলচ্চিত্রটির দুটি বিশেষ প্রদর্শনীর একটি ইতিমধ্যে ৪ জুন রাত পৌনে ৯টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আরেকটি প্রদর্শিত হবে ৮ জুন; যেখানে নির্মাতা সুমিত উপস্থিত থেকে দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করবেন। আগামী আগস্টে চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে সাধারণ দর্শকদের জন্য মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে স্নাতক শেষ করে চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসার টানে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির টিশ স্কুল অব দ্য আর্টস থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনায় উচ্চতর ডিগ্রি নেন। সেখানে অস্কারজয়ী পরিচালক স্পাইক লি ছিলেন তাঁর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নোনাজলের কাব্য’ (বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ প্রযোজনা) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ প্রশংসিত হয়, যার চিত্রনাট্যের জন্য তিনি ‘স্পাইক লি রাইটিং গ্রান্ট’ পেয়েছিলেন।