ভোটকেন্দ্র বসাতে প্রত্যন্ত দ্বীপে হাজির এক তরুণী, অত:পর...

‘সিক্রেট ব্যালট’ সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য। কোলাজ

ইরানি পরিচালক বাবাক পায়ামির ছবি ‘সিক্রেট ব্যালট’ আজও সময়োপযোগী রাজনৈতিক সিনেমা। প্রায় নিঃশব্দ এক গল্পের ভেতর দিয়ে ছবিটি তুলে ধরে—ভোটাধিকার, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের জীবনের জটিল সম্পর্ক।

গল্প অত্যন্ত সরল। ইরানের একটি প্রত্যন্ত দ্বীপে একটি ভোটকেন্দ্র বসাতে যান এক তরুণী সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর দায়িত্ব—দ্বীপের বাসিন্দাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা; কিন্তু দ্বীপে পৌঁছেই তিনি বুঝতে পারেন, কাগজে-কলমে যত সহজ, বাস্তবে বিষয়টি ততটা নয়। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় এক তরুণ সেনা সদস্যকে, যিনি তার নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। এই দুই চরিত্রের যাত্রাই ছবির মূল কাঠামো—একদিকে আদর্শবাদী, নিয়মনিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা; অন্যদিকে কর্তব্যপরায়ণ কিন্তু প্রশ্নহীনভাবে আদেশ মানতে অভ্যস্ত সেনা।

‘সিক্রেট ব্যালট’ নামটাই ইঙ্গিত দেয় ছবির মূল দর্শনের দিকে—গোপন ব্যালট অর্থাৎ নাগরিকের স্বাধীন ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অধিকার; কিন্তু ছবিটি ধীরে ধীরে দেখায়, এই ‘গোপনীয়তা’ বাস্তবে কতটা ভঙ্গুর। দ্বীপের বাসিন্দাদের অনেকেই জানেন না ভোট কী, কেন ভোট দেবেন; কিংবা কাকে দেবেন। কেউ কেউ বয়সের কারণে ভোট দিতে পারেন না, কেউ পরিচয়পত্রের সমস্যায় পড়েন, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অর্থই বোঝেন না। ফলে ভোট দেওয়া এখানে কোনো স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার নয়; এটি হয়ে ওঠে একধরনের প্রশাসনিক অভিযান।

‘সিক্রেট ব্যালট’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

বাবাক পায়ামি এই অভিযানকে তুলে ধরেছেন প্রায় ডকুমেন্টারি ঘরানার বাস্তবতায়। ক্যামেরা শান্ত, সংলাপ কম, আবহসংগীত প্রায় অনুপস্থিত। এই নীরবতা ছবির বড় শক্তি। দর্শককে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান শোনানো হয় না; বরং দৈনন্দিন ছোট ছোট দৃশ্যের ভেতর দিয়েই বোঝানো হয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যে কী বিশাল দূরত্ব।

তরুণী কর্মকর্তার চরিত্রটি এক অর্থে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি নিয়ম মেনে চলেন, ফরম পূরণ করেন, বয়স যাচাই করেন, ব্যালট বাক্স বহন করেন। তাঁর কাছে ভোট মানে একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব, একটি নৈতিক কর্তব্য; কিন্তু দ্বীপবাসীদের কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের জীবনে রাষ্ট্র প্রায় অনুপস্থিত; তাই ভোটও তাঁদের কাছে বিমূর্ত। কেউ ভোট দিতে চাইলেও বাধার মুখে পড়েন—কখনো নিয়মের কারণে, কখনো সামাজিক বাস্তবতার কারণে।

এই দ্বন্দ্বের ভেতর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্র হলো সেই তরুণ সৈনিক। তিনি আদেশ পালন করেন, কর্মকর্তাকে অনুসরণ করেন, ব্যালট বাক্স বহন করেন; কিন্তু ধীরে ধীরে তার মধ্যেও একধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। সে কি শুধু আদেশ মানা যন্ত্র? নাকি সে-ও এই প্রক্রিয়ার একজন অংশগ্রহণকারী নাগরিক? ছবির এক পর্যায়ে এই প্রশ্ন নীরবে কিন্তু গভীরভাবে উঠে আসে।

‘সিক্রেট ব্যালট’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

‘সিক্রেট ব্যালট’ আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা পায়। ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার জেতে। সমালোচকদের মতে, ছবিটির সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর সংযম। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের সমালোচনা করে না, কিন্তু ছোট ছোট পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করে।

‘সিক্রেট ব্যালট’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

অনেক রিভিউতে ছবিটিকে ‘মৃদু কিন্তু গভীর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এখানে কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ নেই, নেই নাটকীয় সংঘর্ষ; কিন্তু যে প্রশ্নগুলো ছবিটি তোলে, সেগুলো অত্যন্ত তীব্র—ভোটাধিকার কি সত্যিই সবার জন্য সমান? রাষ্ট্র কি কেবল নিয়মের মাধ্যমে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারে? নাকি মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত না হলে এই প্রক্রিয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে? ‘সিক্রেট ব্যালট’ মনে করিয়ে দেয়, ভোটাধিকার কেবল সংবিধানে লেখা একটি অধিকার নয়; এটি বাস্তবে প্রয়োগের প্রশ্ন। ভোটার যদি প্রক্রিয়াটি না বোঝেন, যদি তিনি মনে করেন ভোটে তাঁর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না, তাহলে গণতন্ত্র কাগজে টিকে থাকলেও বাস্তবে তা দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

ছবিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী কর্মকর্তার উপস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে একজন তরুণী নারী সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে দ্বীপে গিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন—এটি নিজেই একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। তিনি শুধু ভোটের প্রতিনিধি নন, তিনি রাষ্ট্রের আধুনিক মুখ; কিন্তু তার ক্ষমতাও সীমিত। নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি খুব বেশি কিছু করতে পারেন না। ফলে দর্শক দেখেন, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়েও তিনি অনেক সময় অসহায়।

‘সিক্রেট ব্যালট’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

এই অসহায়ত্বই ছবিটির আবেগের কেন্দ্র। ‘সিক্রেট ব্যালট’ কোনো আশাবাদী স্লোগানে শেষ হয় না, আবার সম্পূর্ণ হতাশাবাদীও নয়; বরং এটি একধরনের খোলা প্রশ্ন রেখে যায়—গণতন্ত্রের প্রকৃত মানে কী? এটি কি শুধু নিয়ম মেনে ভোট নেওয়া? নাকি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রক্রিয়া?

রটেন টমাটোজ, আইএমডিবি অবলম্বনে