যুদ্ধ নিয়ে সেরা ১০ সিনেমা কোনগুলো

যুদ্ধ নিয়ে সেরা ১০ সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ

যুদ্ধ নিয়ে সারা দুনিয়ায় নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন ঘরানার সিনেমা; বেশির ভাগ সিনেমায়ই উঠে এসেছে যুদ্ধবিরোধী বার্তা। এসব সিনেমার কোনোটি দর্শক–সমালোচকদের প্রশংসা, কোনোটি জিতেছে পুরস্কার। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত সেরা সিনেমা কোনগুলো? চলচ্চিত্র রেটিংয়ের ওয়েবসাইট রোটেন টমেটোজ প্রকাশ করেছিল যুদ্ধ নিয়ে সেরা ১০০ সিনেমার তালিকা। সেখান থেকে জেনে নেওয়া যাক শীর্ষ ১০ সিনেমার কথা।

১০

‘ডাস বুট’

‘ডাস বুট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

১৯৮১ সালের পশ্চিম জার্মান যুদ্ধের চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন উলফগ্যাং পিটারসেন; এতে অভিনয় করেছেন ইয়ুর্গেন প্রোচনো, হার্বার্ট গ্রোনেমায়ার ও ক্লাউস ওয়েনেম্যান। এটি রয়েছে রোটেন টমেটোজের তালিকার ১০–এ। সিনেমাটি যুদ্ধের বাস্তবতা এবং মানুষের মানসিক সংগ্রামকে অত্যন্ত গভীরভাবে উপস্থাপন করেছে। এটি শুধু একটি যুদ্ধের চলচ্চিত্র নয়, বরং এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা, যা দর্শককে সাবমেরিনের ভেতরের সংকীর্ণ পৃথিবীতে প্রবেশ করায়। সিনেমাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের জার্মান সাবমেরিনের অভিযানকেন্দ্রিক। গল্পের মূল থিম হলো ক্রুদের জীবনের দৈনন্দিন ভয়, যুদ্ধের চাপ এবং একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কের মানসিক জটিলতা।

‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’

‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

১৯৮৬ সালে সেবা প্রকাশনী থেকে বের হয় একই নামের বইটি। এরিখ মারিয়া রেমার্কের বইটি অনুবাদ করেছিলেন জাহিদ হাসান। সেই সূত্রে বাংলাদেশি পাঠকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায় উপন্যাসটি, এটি থেকে নানা সময়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমা। উপন্যাসটি থেকে প্রথম সিনেমা হয় বই প্রকাশের দুই বছর পরই, ১৯৩০ সালে। লুইস মাইলস্টোন পরিচালিত ছবিটি দুই শাখায় অস্কার জেতে। রেমার্ক নিজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসটি পায় ভিন্ন মাত্রা। বইটি প্রকাশের মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ২২টি ভাষায় অনূদিত হয়, বিক্রি হয় ২৫ লাখ কপির বেশি। অনেকের মতে, এটি সেরা যুদ্ধবিরোধী সিনেমা। রোটেন টমেটোজের তালিকার ৯–এ জায়গা পেয়েছে ১৯৩০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি; এতে অভিনয় করেছেন লুইস ভোলহেম ও লিউ আয়ার্স।

‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ অর: হাউ আই লারনড টু স্টপ ওরিং অ্যান্ড লাভ দ্য বম্ব’

‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ অর: হাউ আই লারনড টু স্টপ ওরিং অ্যান্ড লাভ দ্য বম্ব’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

তালিকার ৮–এ রয়েছে ১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়া স্ট্যানলি কুবরিকের সিনেমাটি। স্নায়ুযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে একজন মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন মার্কিন জেনারেল সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেন, যা প্রতিরোধ করতে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ব্যর্থ হন। পিটার সেলার্স অভিনীত এই চলচ্চিত্র পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে তৈরি ব্ল্যাক কমেডি সিনেমা। এটিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা কমেডি সিনেমাগুলোর একটি মনে করা হয়। আমেরিকান সেরা সিনেমার তালিকার এটি রয়েছে ২৬ নম্বরে। মুক্তির পর সেরা সিনেমা, সেরা নির্মাতাসহ কয়েকটি বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিল সিনেমাটি।

‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’

‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা পরিচালিত ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত। এটিকে অন্যতম সেরা যুদ্ধবিরোধী সিনেমা মনে করা হয়। জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমার কাহিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার এক গোপন অভিযানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। প্রধান চরিত্র ক্যাপ্টেন উইলারের মিশন হল রবার্ট ডি কাপ নামের এক বিদ্রোহী আমেরিকান অফিসারকে খুঁজে বের করা এবং তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা বা হত্যা করা। এতে অভিনয় করেছেন মার্লোন ব্রান্ডো, রবার্ট ডুভাল, মার্টিন শিন, ফ্রেডেরিক ফরেস্ট। মুক্তির পর এটি কান উৎসবে স্বর্ণপাম জেতে। এটি বক্স অফিসেও ভালো ব্যবসা করে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ৮০ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাপী ১৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করে।

‘শিন্ডলার্স লিস্ট’

‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ডে জার্মান দখলদারত্বের পটভূমিতে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। এটি পরিচালনা করেছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। সিনেমার গল্প মূলত অস্কার শিন্ডলার নামের একজন জার্মান ব্যবসায়ীকে নিয়ে। সিনেমায় তাঁর ইহুদি শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতি এবং তাঁদের জীবন বাঁচানোর গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটিতে যুদ্ধের বিভীষিকা যেমন রয়েছে, তেমনি গল্পটি মানুষকে মানবিক হওয়া কথা বলে। ১৯৮২ সালে বুকার পুরস্কার বিজয়ী অস্ট্রেলিয়ান লেখক থমাস কেনিয়েলির লেখা ‘শিন্ডলার্স আর্ক’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে অভিনয় করেছেন লিয়াম নিসন, বেন কিংসলি, রেইফ ফাইঞ্জ। ১৯৯৪ সালে এটি সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক, সেরা সংগীত পরিচালনা, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা সিনেম্যাটোগ্রাফি, সেরা সম্পাদনা, সেরা প্রোডাকশন ডিজাইনসহ মোট ৭টি বিভাগে একাডেমি (অস্কার পুরস্কার) পুরস্কার লাভ করে।

‘হেনরি ৫’

‘হেনরি ৫’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

কেনেথ ব্রানা পরিচালিত ও অভিনীত সিনেমাটি উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের নাটক অবলম্বনে নির্মিত। শতবর্ষের যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই মহাকাব্যিক সিনেমাটি রাজা পঞ্চম হেনরির ফ্রান্স জয়ের অভিযানের চিত্র তুলে ধরে। এটি শুধুই একটি যুদ্ধের গল্প নয়, বরং এক রাজা ও তার সৈন্যদের সাহস, নেতৃত্ব এবং নৈতিক দ্বন্দ্বের মানসিক যাত্রা তুলে ধরে। পরিচালক ও প্রধান চরিত্রে অভিনয়কারী কেনেথ ব্রানা দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি ১৬ শ শতকের নাটককে আধুনিক দর্শকের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। মুক্তির পর সিনেমাটি সমালোচক ও দর্শক উভয়ই দ্বারা প্রশংসিত হয়। এ সিনেমাটি রয়েছে রোটেন টমেটোজের তালিকার পাঁচে।

‘ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’

‘ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

এই তালিকার চারে রয়েছে জিল্লো পন্তেকোর্ভো পরিচালিত ইতালীয়-আলজেরিয়ান রাজনৈতিক চলচ্চিত্রটি। ১৯৫৪-১৯৫৭ সালের মধ্যে আলজেরিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আলজেরীয়দের সশস্ত্র সংগ্রাম এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নিও-রিয়েলিস্টিক ও তথ্যচিত্র স্টাইলে নির্মিত এই সাদা-কালো ছবিটি তার রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সাইট অ্যান্ড সাউন্ডের জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের সেরা ২৫০টি ছবির মধ্যে ৪৮তম। এম্পায়ার ম্যাগাজিনের সেরা ৫০০ চলচ্চিত্রের তালিকায় এটি ১২০তম স্থান দখল করেছে। এতে অভিনয় করেছেন জঁ মার্তে, সাদি ইয়াসেফ, ব্রাহিম হাগিয়াগ, টমমাসো নেরি।

‘কাসাব্লাঙ্কা’

‘কাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

১৯৪২ সালের মাইকেল কার্টিজ পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন হামফ্রে বোগার্ট , ইনগ্রিড বার্গম্যান ও পল হেনরেইড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে এগিয়েছে ছবিটির কাহিনি। জার্মানদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় খুঁজছে অনেক শরণার্থী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হলে প্রথমেই যেতে হবে কাসাব্লাঙ্কায়, সেখানেই পাওয়া যেতে পারে সোনার হরিণ এক্সিট ভিসা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত রিক ব্লেইনও থাকে এই শহরে, শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যাফেটির মালিক সে। ঘটনাক্রমে ট্রানজিটের দুটি কাগজ পায় ব্লেইন। এ শহরেই সে আবিষ্কার করে সাবেক প্রেমিকা ইলসাকে, যে কিনা এখন চেকোস্লোভাকিয়ার বিদ্রোহী নেতা লাজলোর স্ত্রী। তাদের পেছনে ধাওয়া করছে জার্মান বাহিনী। ইলসা জানে, কেবল ব্লেইনই সাহায্য করতে পারবে তাদের। কিন্তু ব্লেইন কি সাহায্য করবে তাদের? এমন গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি রয়েছে রোটেন টমেটোজের তালিকার তিনে।

‘আ ম্যান এস্কেপড’

‘আ ম্যান এস্কেপড’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

রোবের ব্রেসোঁ পরিচালিত ১৯৫৬ সালের ফরাসি যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মঁল্যুক কারাগারে দখলকৃত ফ্রান্সে জার্মান সামরিক প্রশাসন কর্তৃক বন্দী ফরাসি প্রতিরোধ দলের সদস্য অঁদ্রে দেভাইনির স্মৃতিকথার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত। চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম পরিবর্তন করা হলেও এটি দেভাইনির বাস্তব জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। চলচ্চিত্রটি ১৯৫৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা শাখায় প্রদর্শিত হয়, সেখানের ব্রেসোঁ শ্রেষ্ঠ পরিচালক বিভাগে পুরস্কৃত হন। এটি ব্রেসোঁর সবচেয়ে সমাদৃত ও প্রভাবশালী সিনেমা। এর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফ্রঁসোয়া ল্যত্যরিয়ে, শার্ল ল্য ক্লাঁশ, মোরিস বিরব্লক, রোল্যাঁ মোঁ।

আরও পড়ুন

‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’

‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

তালিকার শীর্ষে রয়েছে জাপানি অ্যানিমেটেড সিনেমাটি। এটি লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন ইসাও তাকাহাতা এবং প্রযোজনা করেছে স্টুডিও গিবলি। এটি ১৯৬৭ সালের একই নামের আধা আত্মজীবনীমূলক ছোট গল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেটি লিখেছেন আকিউকি নোসাকা। কাহিনি জাপানের কোবি শহরকে ভিত্তি করে, যেখানে ভাইবোন এবং যুদ্ধ অনাথ সেইতা ও সেটসুকো যুদ্ধের শেষ মাসগুলোতে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। এর নির্মাণ শুরু হয় যখন আকিউকি নোসাকা তাঁর বইয়ের অ্যানিমেটেড রূপান্তরে আগ্রহী হন। এটি ছিল তাকাহাতার স্টুডিও গিবলির সঙ্গে প্রথম চলচ্চিত্র। অনেক সমালোচক ছবিটিকে যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র মনে করলেও তাকাহাতা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটিকে সাও তাকাহাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মনে করা হয়। অনেকে সিনেমাটিকে সর্বকালের সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম বলেও মনে করেন।