প্রতিকূল এক সময়ে টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুশ সিনেমা

পরিচালক আলেক্সেই গের্মান ও ডিজাইনার এলেনা ওকোপনায়া। প্রথম আলো

পশ্চিমা বিশ্বের চোখে রাশিয়া এখন ভয়ংকর এক খলনায়ক। দেশটির সবকিছু তাদের চোখে শুধু খারাপই নয়, বরং ক্ষতিকরও। ফলে পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের শাসকগোষ্ঠী রাশিয়াকে বর্জন করেই বসে নেই, একই সঙ্গে সে দেশের অর্থনীতি যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য একের পর এক নিষেধাজ্ঞা মস্কোর বিরুদ্ধে আরোপ করে চলেছে। সেই সঙ্গে রুশবিরোধী প্রচারযুদ্ধে শামিল হয়ে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমও দেশটিকে বিপজ্জনক এক রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করা থেকে বিরত থাকছে না। ফলে রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়া এবং দেশটির নাগরিকদের অবস্থান অত্যন্ত প্রতিকূল হচ্ছে পশ্চিমে। খেলাধুলার পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকেও ‘রুশ বর্জন’ হয়ে উঠেছে যেন সমাজ জীবনের অংশ।

জাপানের অবস্থান ভৌগোলিক সংজ্ঞার দিক থেকে পশ্চিমে না হলেও রাজনীতি ও অর্থনীতির নানা রকম হিসাবের দিক থেকে জাপান পশ্চিমা বিশ্বেরই একটি অংশ। ফলে জাপানেও সরকারিভাবে রাশিয়া এখন ঠিক শত্রু রাষ্ট্র না হলেও শত্রু সমতুল্য একটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাপানও তাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপ করে চলেছে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। ফলে জাপানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনো অর্থেই রাশিয়ার জন্য অনুকূল নয়।

কথা বলছেন আলেক্সেই গের্মান। প্রথম আলো

এ রকম একটা অবস্থায় রাশিয়ার একটি ছায়াছবির ৩৬ –তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগদানই কেবল নয়, একই সঙ্গে উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের জন্য বাছাই করা ১৫টি ছবির একটি হিসেবে জায়গা করে নেওয়া নিঃসন্দেহে ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। জুরি সদস্যদের চূড়ান্ত বিচারে ছবিটি পুরস্কৃত না হলেও দর্শকদের মধ্যে ছবিটি কিছুটা হলেও ছাপ রেখে যেতে পেরেছে। রুশ ছায়াছবি ‘ভোজদুখ’ বা ‘বাতাস’–এর ব্যতিক্রমী দিকগুলো বিবেচনা করে ছবির পরিচালক ও শিল্পনির্দেশকের সঙ্গে উৎসব চলাকালে এক সাক্ষাৎকারে আমরা মিলিত হয়েছিলাম ছবির খুঁটিনাটি বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি রুশ চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার উদ্দেশ্যে।

ছবিটি পরিচালনা করেছেন আলেক্সেই গের্মান, পারিবারিক পরিচয়ের দিক থেকে তিন পুরুষ ধরে রুশ চলচ্চিত্রের সঙ্গে যিনি জড়িত। তাঁর পিতা একই নামে পরিচিত হওয়ায় পুত্রের নামের শেষে ‘জুনিয়র’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। পিতা ছিলেন লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটি ছবি যিনি পরিচালনা করেছেন। পিতামহ ইয়ুরি গের্মানও চিত্রনাট্যকার হিসেবে ছায়াছবি নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আলেক্সেই গের্মান জুনিয়রের ছায়াছবির জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া তাই অনেকটা যেন পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখা। তবে বলতেই হয়, গৌরবময় সেই ঐতিহ্যকে তিনি কেবল ধরেই রাখেননি, বরং একই সঙ্গে সেটাকে আরও কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ২০০৮ সালে নির্মিত তাঁর ছবি ‘কাগজের সৈনিক’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার লায়ন পুরস্কার পেয়েছিল। পরবর্তীকালে ২০১৮ সালে নির্মিত তাঁর ছবি ‘দবলাতোভ’ সে বছর বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা শিল্পনির্দেশনার জন্য সিলভার বেয়ার পুরস্কার লাভ করে। ফলে চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলেক্সেই গের্মান জুনিয়র হচ্ছে পরিচিত একটি নাম।

শুরুতেই খ্যাতিমান এই রুশ পরিচালকের কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম, রাশিয়ার জন্য প্রতিকূল হিসেবে বিবেচিত এই সময়ে চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য টোকিওতে অবস্থানকালে নেতিবাচক কোনো অভিজ্ঞতার মুখে তাঁদের পড়তে হয়েছে কি না? উত্তরে তিনি বলেন, সে অর্থে বিব্রতকর পরিস্থিতির দেখা তাঁদের পেতে হয়নি, যদিও দলের বিচ্ছিন্ন দুয়েকজন সদস্যের বেলায় সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে তা ঘটেছে। ফলে তিনি ও ছায়াছবির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্যরা টোকিওতে তাঁদের অবস্থান উপভোগ করছেন, যে শহর সার্বিক অর্থে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহরগুলোর অন্যতম।

ছবির পোস্টার। উৎসব কমিটির সৌজন্যে৪।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এখনকার সেন্ট পিটার্সবার্গের ওপর জার্মান সামরিক বাহিনীর আরোপিত দীর্ঘ অবরোধের মুখে শহরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহের পথ খোলা রাখার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া একদল নারী বিমানসৈনিকের মুখোমুখি হওয়া কঠোর বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালক ছবিটি তৈরি করেছেন।

এই ছবির মধ্য দিয়ে হানাহানি চলতে থাকা বর্তমান বিশ্বের জন্য বিশেষ কোনো বার্তা তিনি পৌঁছে দিতে চেয়েছেন কি না, সে প্রশ্নের উত্তরে আলেক্সেই গের্মান বলেন, সে অর্থে একক কোনো বার্তা তাঁর এই ছবিতে নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে তৈরি ছায়াছবিতে একপক্ষীয় বার্তা থাকা উচিত বলেও তিনি মনে করেন না, ‘কেননা যুদ্ধকে আমরা যেভাবে দেখি, সেই বাস্তবতা কিন্তু সময়ের পরিক্রমণে বদলে যায়। তবে সার্বিকভাবে আমি যা দেখাতে চেয়েছি তা হলো, যুদ্ধ হচ্ছে বর্বরতা। মানুষের জীবনের স্বপ্ন যেটা নানাভাবে ভেঙে দেয়। সেদিক থেকে যুদ্ধের অমানবিক দিকগুলো আমার ছবিতে উঠে এলেও এর জন্য একক একটি পক্ষ যে সর্বাংশে দায়ী ছিল না, সেই দিকের ওপর আমি আলোকপাত করতে চেয়েছি। ফলে সোভিয়েত সমাজের ত্রুটিপূর্ণ কিছু দিকও আমার এই ছবিতে উঠে এসেছে, যা হয়তো আগে এতটা খোলামেলাভাবে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। তবে তা সত্ত্বেও বলতে হয়, যুদ্ধ যে কতটা অমানবিক, সেটাই আমি আমার ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ব্যক্তির সুখ-দুঃখ যুদ্ধের সময় গৌণ হয়ে যায়। ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় যুদ্ধ আর বিপ্লব নিয়েও আমাদের অবস্থানের রদবদল ঘটে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে ফরাসি বিপ্লবের হাত ধরেই সন্ত্রাস একসময় মঞ্চে প্রবেশ করেছিল এবং পরবর্তীকালে নেপোলিয়নের নেতৃত্বে আসীন হওয়াকে যা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। একইভাবে রুশ বিপ্লবকেও সেই আলোকে বিবেচনা করে দেখা যায়। কোনো ছায়াছবির পক্ষেই বিশ্বের ইতিহাসে এতটা যুগান্তকারী হিসেবে চিহ্নিত ঘটনার একেবারে সঠিক প্রতিফলন তুলে ধরা হয়তো সম্ভব নয়।’

আরও পড়ুন

জেনিয়া নামে পরিচিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন এক নারী পাইলটের জীবন নিয়ে এই চলচ্চিত্রের নির্মাণ, যার পিতার মৃত্যু হয় তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়ে। পুরুষপ্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে নানা বিদ্রুপ ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজেকে ক্রমেই অভিযানের জন্য প্রস্তুত করে নেয় জেনিয়া। অন্যান্য নারী সহযোদ্ধার সঙ্গে অম্ল-মধুর সম্পর্কে এগিয়ে যায় তার যুদ্ধকালীন দিন। প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও শুরুতে সুযোগ পেয়েও শত্রু বধে অপারগ হলে, এক সহমর্মী পুরুষ কমান্ডারের সহায়তায় সেই দৃঢ়তা অর্জন করে নেয় জেনিয়া। একপর্যায়ে বয়সের তফাত অগ্রাহ্য করে প্রেমে পড়ে যায় সেই কমান্ডারের। কিন্তু বিধি বাম থাকায় প্রেমিককে হারাতে হয় বিমানঘাঁটিতে অকস্মাৎ হৃদ্রোগের থাবায়। অন্যদিকে, যুদ্ধে একে একে সহযোদ্ধারাও শিকার হতে থাকে নাৎসি বিমান হামলার। প্রতিটি মৃত্যু যেন তাকে করে তোলে শত্রু নিধনে আরও বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অনেকগুলো সফল অভিযান পরিচালনার মধ্য দিয়ে জেনিয়া পরিণত হয় এক সফল নেতৃস্থানীয় আকাশযোদ্ধায়। তবে শেষ পর্যন্ত সে নিজেও এড়াতে পারে না শত্রুর নিশানা।

কিন্তু এই আত্মত্যাগ বৃথা যায় না। জেনিয়াদের বীরত্বগাথায় উৎসাহিত হয়ে অন্য নারীরাও ক্রমেই যুক্ত হতে থাকে আকাশসমরে এবং একসময় চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে ভূমিকা রাখে। মূল চরিত্র জেনিয়া কাল্পনিক হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনীর হয়ে অনেক নারী পাইলট যুদ্ধ করেছিলেন। তার মানে বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই এই ছবির নির্মাণ। লিদিয়া লিথবিয়াক নামের বিখ্যাত এক নারী পাইলটের উদাহরণ পরিচালক দেন, যিনি নিজে শহীদ হওয়ার আগে অনেক জার্মান বিমান ভূপাতিত করেছিলেন। মূলত এই চলচ্চিত্রজুড়ে স্তালিনগ্রাদ ও লেনিনগ্রাদের বিমানযুদ্ধ এবং অল্প পরিসরে স্থলযুদ্ধ থাকলেও, চরিত্রগুলোর নিজস্ব এবং পারস্পরিক আবেগ-অনুভূতি, প্রেম-ভালবাসা, কখনো বা ঈর্ষা, পুরুষ সহকর্মীদের বিদ্রুপ অথবা সহযোগিতা-এসব দিকের ওপরই পরিচালক জোর দিয়েছেন আগাগোড়া। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমি মূলত চরিত্রগুলোর আবেগ ও অভিনয় নিয়ে কাজ করেছি, কোনো অ্যাকশন ব্লকবাস্টার তৈরি করতে চাইনি।’

চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রের কথোপকথনে সম্ভবত এ কারণেই উঠে আসে সোভিয়েত শাসনের নানা বিতর্কিত দিক। যেমন, জেনিয়ার মা-বাবার মৃত্যু হয়েছিল সরকারি নির্দেশে। এই সামাজিক গ্লানি থেকে বাঁচতে নিজের নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে নেয় জেনিয়া। আদর্শগত অমিলের কারণে অনেকের ঘরবাড়ির ওপর রাষ্ট্রের হামলে পড়ার তথ্যও উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গের্মান বলেন, ‘সব বিপ্লবেরই একটি অন্ধকার দিক থাকে। আর সেটি হলো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। ফরাসি বিপ্লবের পর যেমনটি ঘটেছিল, স্তালিনের সময় তা আরও ব্যাপক আকার লাভ করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধকালীন আবহে বহিঃশত্রুর আঘাতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অন্তর্ঘাতের এই দ্বন্দ্ব আমি তুলে ধরতে চেয়েছি।’ এখানে বলে রাখা দরকার যে চলচ্চিত্রকারের পিতাও সোভিয়েত বিধিনিষেধের খপ্পরে পড়েছিলেন। এ কারণে তাঁর চলচ্চিত্রের সংখ্যাও ছিল কম। অন্যদিকে তাঁর একাধিক চলচ্চিত্রের বিষয়াদি মনঃপুত না হওয়ায় সেগুলোর মুক্তিও বিলম্বিত হয়, আশির দশকে পেরোস্ত্রাইকার সময়ই যেগুলো আলোর মুখ দেখে।
আবার সোভিয়েত সময়ের আরেকটি দ্বন্দ্ব যেমন, ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে ব্যক্তির দোদুল্যমানতাও ফুটে উঠেছে চলচ্চিত্রে। নারী পাইলটদের একান্ত আলাপচারিতায়, একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করার কথা জানালেও মূল চরিত্র জেনিয়া তার অবিশ্বাসের কথা জোর গলায় উল্লেখ করে। নিজ জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে সেই শিক্ষাই দেয় বলে তার দাবি। পরিচালকের কাছে সেই প্রসঙ্গ তুললে তিনি বলেন, সত্যি বলতে গেলে, যুদ্ধকালীন রাশিয়ায় নাস্তিকতা বলতে গেলে অনুপস্থিতই ছিল। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা ভয়ানক সেসব দিনে সবাই একান্তে যে যার ধর্মবিশ্বাস আঁকড়ে ধরে ছিলেন।
মূল চরিত্র জেনিয়ার বিমান যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভূমিতে নেমে আসে, তখন সে বিড়বিড় করে বলে ওঠে, ‘মা, আমি তোমার কাছে আসছি...বাবা, আমি তোমার কাছে আসছি...মাসা (সহযোদ্ধা) আমি, তোমার কাছে আসছি।’ আর পরিচালক এই দৃশ্যের উল্লেখ করে বলেন, এ সময় জেনিয়া ক্রমেই যেন আস্তিক হয়ে ওঠে। কারণ, পরকালে প্রিয়জনদের সাক্ষাৎ মূলত আস্তিক হয়ে ওঠার ইঙ্গিত। আর বর্তমান রুশ সমাজের কথা তুললে গের্মান বলেন, এখন বেশির ভাগ মানুষই ঈশ্বরে বিশ্বাসী। কিছু ব্যতিক্রম হয়তো রয়েছে।

চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সময় ‘ক্রেইনস আর ফ্লাইং’ বা ‘ব্যালাড অব আ সোলজার’-এর মতো বিখ্যাত সোভিয়েত চলচ্চিত্রগুলো গের্মানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব চলচ্চিত্র তাঁর দেখা বলে নিজের অজান্তেই কোনো না কোনো প্রভাব হয়তো পড়ে থাকতে পারে। তবে তিনি মূলত চেয়েছেন পূর্বের চলচ্চিত্রগুলোর বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক প্রেক্ষিত তুলে ধরতে। যুদ্ধের মুখে সাধারণ মানুষ ‘বিশেষ করে, নারীদের সাহস আর আত্মমর্যাদা’র দিকটি রয়েছে যার কেন্দ্রভাগে।
অন্যদিকে, এই চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি বড় অংশেই যুক্ত ছিলেন সব নারী কর্মী। তিন ক্যামেরাম্যানের দুজনই ছিলেন নারী। সম্পাদক আর প্রযোজকও নারী। আবার প্রোডাকশন ও ফ্যাশন ডিজাইনারের দায়িত্বে ছিলেন এলেনা ওকোপনায়া, সম্পর্কে যিনি পরিচালকের স্ত্রী। যুদ্ধের আবহ পুনর্নির্মাণের গুরুদায়িত্ব বর্তেছিল তাই তাঁর ওপর। অবশ্যই এর সেট ও কস্টিউম ডিজাইনের সময় তিনি পূর্বোক্ত চলচ্চিত্রগুলোর সহায়তা নিয়েছেন বলে আমাদের জানান। ঐতিহাসিক আবহের নির্মাণে তিনি মূলত চরিত্রগুলোর বাহ্যিক অভিব্যক্তি বা অবয়ব, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্ব তুলে ধরার দিকেই বেশি মনোযোগী হন। যুদ্ধের সময়ের ওপর চালানো গবেষণার মধ্য দিয়ে এমন একটি কারখানা তিনি খুঁজে বের করেন, যেটি যুক্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সেনাদের পোশাক প্রস্তুতিতে। সেট ও কস্টিউমের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত বিমানগুলোর বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপনায়ও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

ছবির একটি দৃশ্য। উৎসব কমিটির সৌজন্যে

বিষয়বস্তুর কারণে স্বাভাবিকভাবেই এই চলচ্চিত্রের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল রুশ ও জার্মান যুদ্ধবিমানের লড়াই। এলেনার সুচারু গবেষণায় ঐতিহাসিক নানা প্রপস ও ডিজাইনে যা হয়ে উঠেছিল বিশ্বাসযোগ্য। এই বিশ্বাসযোগ্যতার নেপথ্যের গল্প জানতে চাইলে গের্মান বলেন, এখানে সত্যিকার বিমান আন গ্রাফিক অ্যানিমেশন দুটোরই কৃতিত্ব রয়েছে। বিমানের ককপিটের অংশের চিত্রায়ন স্টুডিওতে হলেও বহির্দৃশ্যের চিত্রায়ন হয়েছে অনেক সময় রেডিও দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা বিমানের সাহায্যে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্পোর্টস বিমানও ব্যবহার করা হয়েছে। আর পরে পাইলটের স্থানে অভিনেতাদের প্রতিস্থাপন করে নেওয়া হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন কিংবা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আমরা গের্মানকে স্মরণ করিয়ে দিই যে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বিশ্বের বাকি অংশ এখন মুখোমুখি। পাশাপাশি রুশবিদ্বেষও তুঙ্গে। এই চলচ্চিত্র কি তাহলে সমকালীন প্রজন্মকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সোভিয়েত বা রুশ আত্মত্যাগ ও বীরত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া নয়? জবাবে গের্মান বলেন, ‘এটি প্রোপাগান্ডা ছবি নয়, আমি আজ থেকে ছয় বছর আগেই এই চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা করি এবং যা দেখাতে চেয়েছি, তা মূলত আর কিছু নয়, যুদ্ধের করাল থাবায় ছিন্নভিন্ন ব্যক্তির জীবন, সাহস, দুর্দশা ও নৃশংসতা।’
নারী পাইলটরা রয়েছেন যার কেন্দ্রে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে যাদের

প্রতিনিধিত্ব এর আগে কখনো এত ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। গের্মান মনে করেন না, তাঁর এই চলচ্চিত্র চলমান বিশ্বের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে। তিনি ‘শুধু ইতিহাসের একটি অজানা অধ্যায়ের ওপরই আলোকপাত’ করতে চেয়েছেন। অন্যদিকে, চলচ্চিত্রের ভাষায় ইতিহাসের এই পুনর্নির্মাণ জরুরি বর্তমানকে অনুধাবনের জন্যই। বিশেষ করে, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিনিয়ত ভেসে আসা আর্তনাদের বিপরীতে অতীতের এই পুনর্দৃশ্যায়ন যেন শান্তির জন্য মানবজাতির তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকেই মূর্ত করে তোলে।