এক সিনেমার দুই সমাপ্তি, পরিচালকও দুই—শতবর্ষে গার্বোর ‘দ্য টেম্পট্রেস’
পর্দাজুড়ে একটি মুখ। কখনো রহস্যময়, কখনো বিষণ্ন, কখনো আবার এমন আকর্ষণীয় যে চোখ ফেরানো কঠিন। কোনো সংলাপ নেই, কণ্ঠস্বর শোনারও সুযোগ নেই। শুধু চোখ–মুখের অভিব্যক্তি আর শরীরী ভাষা দিয়েই দর্শককে আটকে রাখছেন তিনি। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে সেই মুখটি ছিল গ্রেটা গার্বোর।
হলিউডে তখন তাঁর যাত্রা সবে শুরু। সুইডেন থেকে আসা তরুণীকে নিয়ে হলিউডের ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের (এমজিএম) আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি যে হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন, সেই গল্প তখনো লেখা হয়নি। এই সময়েই এল ‘দ্য টেম্পট্রেস’।
১৯২৬ সালের ৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের নথিতেও মুক্তির তারিখ ৩ অক্টোবর ১৯২৬। সেই হিসাবে আজ ছবিটির মুক্তির ১০০ বছর পূর্ণ হলো।
এক শতাব্দী পর ‘দ্য টেম্পট্রেস’কে ফিরে দেখার কারণ অবশ্য শুধু এর বয়স নয়। ছবিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গার্বোর হলিউডে তারকা হয়ে ওঠার শুরুর দিন, তাঁর গুরু মরিত্জ স্টিলারের সঙ্গে এমজিএমের সংঘাত, শুটিং শুরুর অল্প দিনের মধ্যেই পরিচালক বদল এবং স্টুডিও-নিয়ন্ত্রিত হলিউডের এক অন্য রকম অধ্যায়।
হলিউডে গার্বোর দ্বিতীয় ছবি
‘দ্য টেম্পট্রেস’ ছিল গ্রেটা গার্বোর দ্বিতীয় আমেরিকান চলচ্চিত্র। এর আগে ‘দ্য টরেন্ট’ দিয়ে হলিউডে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, দুটি ছবির উৎসেই ছিলেন একই লেখক—স্প্যানিশ ঔপন্যাসিক ভিসেন্তে ব্লাসকো ইবানিয়েস।
ইবানিয়েসের ১৯২২ সালের উপন্যাস ‘লা তিয়েরা দে তোদোস’ অবলম্বনে তৈরি হয় ‘দ্য টেম্পট্রেস’। উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ পরের বছর ‘দ্য টেম্পট্রেস’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। ছবির চিত্রনাট্য করেন ডরোথি ফারনাম। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের নথিতে ছবিটিকে ‘আ কসমোপলিটান প্রোডাকশন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রযোজনা-সংযোগে ছিল এমজিএম, পরিবেশনার দায়িত্বেও ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
ছবিতে গার্বোর চরিত্রের নাম এলেনা। প্যারিসের এক মুখোশের পার্টিতে তাঁর পরিচয় হয় আর্জেন্টাইন প্রকৌশলী ম্যানুয়েল রোব্লেদোর সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই দুজনের মধ্যে তৈরি হয় আকর্ষণ। কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ নির্ভার থাকে না। রোব্লেদো জানতে পারেন, যে নারীর প্রেমে তিনি পড়েছেন, তিনি তাঁর পরিচিত মার্কুইস দে তোরে বিয়াঙ্কার স্ত্রী।
এরপর এলেনাকে ঘিরে প্রেম, ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা আর বিপর্যয়ের গল্প চলে যায় প্যারিস থেকে আর্জেন্টিনায়। শুরুতে এলেনাকে বিপজ্জনক মোহিনী নারীর আদলে হাজির করা হলেও গল্প এগোনোর সঙ্গে তাঁর আরেকটি দিকও সামনে আসে। বিশেষ করে রোব্লেদোর প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের জায়গাটি চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দেয়।
গার্বোর বিপরীতে রোব্লেদোর চরিত্রে ছিলেন আন্তোনিও মোরেনো। ক্যানতেরাক চরিত্রে অভিনয় করেন লায়োনেল ব্যারিমোর। আরও ছিলেন মার্ক ম্যাকডারমট, আরমান কালিজ ও রয় ডি’আর্সি।
যে পরিচালক ছবিটি শেষ করতে পারেননি
পর্দার গল্প যতটা নাটকীয়, ‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর ক্যামেরার পেছনের গল্পও কম নয়। ছবিটির পরিচালনা শুরু করেছিলেন সুইডিশ নির্মাতা মরিত্জ স্টিলার। গার্বোর জীবনে তাঁর গুরুত্ব ছিল অন্য রকম। সুইডেনে তরুণ গার্বোর প্রতিভা যাঁরা প্রথম চিনেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন স্টিলার। তাঁর ‘দ্য সাগা অব গোস্তা বেরলিং’ ছবিতে অভিনয়ের পরই আন্তর্জাতিকভাবে নজরে পড়েন গার্বো। হলিউডে আসার পথেও স্টিলার ছিলেন তাঁর পরামর্শদাতা ও অভিভাবকের মতো।
তাই নিজের দ্বিতীয় হলিউড ছবিতে স্টিলারের পরিচালনায় কাজ করার সুযোগটি গার্বোর জন্য বিশেষ ছিল। কিন্তু সেই পুনর্মিলন বেশি দিন টেকেনি। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতির পর ১৯২৬ সালের ৩ এপ্রিল ‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর মূল শুটিং শুরু হয়। ঠিক এক মাস পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। ‘ভ্যারাইটি’র ৫ মে ১৯২৬ সংখ্যার বরাতে আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, মরিত্জ স্টিলারের জায়গায় ফ্রেড নিবলোকে এনে ছবিটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ছবিটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান নিবলো।
কেন স্টিলারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে পরে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। টার্নার ক্ল্যাসিক মুভিজের গার্বোবিষয়ক ইতিহাসে বলা হয়েছে, স্টিলারের কাজের পদ্ধতি এমজিএমের স্টুডিও ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না। তাঁর কাজের গতিও স্টুডিও কর্তৃপক্ষের কাছে ধীর মনে হয়েছিল। ভাষাগত সমস্যা, ব্যয় এবং কাজের ধরন নিয়েও স্টুডিওর অসন্তোষের কথা বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়।
ঘটনাটি গার্বো সহজভাবে নিতে পারেননি। টার্নার ক্ল্যাসিক মুভিজের তথ্য অনুযায়ী, স্টিলারের সঙ্গে স্টুডিওর আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছিলেন। এমনকি হলিউড ছেড়ে সুইডেনে ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য থেকে যান।
আর সেটিই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপরই আসে ‘ফ্লেশ অ্যান্ড দ্য ডেভিল’। জন গিলবার্টের বিপরীতে সেই ছবির সাফল্য গার্বোকে দ্রুত হলিউডের প্রথম সারির তারকাদের কাতারে নিয়ে যায়।
‘দ্য টেম্পট্রেস’ তাই তাঁর ক্যারিয়ারের অদ্ভুত এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—একদিকে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে আসন্ন তারকাখ্যাতি।
ক্যামেরার সামনে তৈরি হচ্ছিলেন এক তারকা
‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর শুটিং যখন শুরু হয়, গার্বোর বয়স মাত্র ২০ বছর। তাঁর জন্ম ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯০৫। ফলে ৩ অক্টোবর ১৯২৬ ছবিটি যখন মুক্তি পায়, তিনি সদ্য ২১ বছরে পা দিয়েছেন।
কিন্তু বয়স যা-ই হোক, ক্যামেরার সামনে তাঁর উপস্থিতি এর মধ্যেই আলাদা করে নজর কেড়েছিল।
ছবিটির চিত্রগ্রহণে ছিলেন টনি গাউদিও ও উইলিয়াম ড্যানিয়েলস। ড্যানিয়েলস পরে গার্বোর বহু ছবির চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। আলো-ছায়া, ক্লোজআপ আর গার্বোর মুখ—এই সমন্বয়ই পরবর্তী সময়ে তাঁর পর্দার রহস্যময় উপস্থিতি নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখে।
ছবিটি মুক্তির পরও গার্বোর উপস্থিতি আলোচনায় আসে। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯২৬ সালের ২৩ অক্টোবর ‘মোশন পিকচার নিউজ’ ছবিটিকে সব দিক থেকেই উন্নত মানের বিনোদন হিসেবে প্রশংসা করেছিল।
তবে গার্বোর সবচেয়ে বড় সময় তখনো সামনে।
নির্বাক যুগ শেষ হওয়ার পর অনেক তারকার ক্যারিয়ার থমকে গেলেও গার্বো ছিলেন ব্যতিক্রম। নির্বাক পর্দার সেই রহস্যময় মুখ সবাক যুগেও হারিয়ে যায়নি। বরং তাঁর কণ্ঠ প্রথমবার শোনানোর ঘটনাটিকেই এমজিএম ‘গার্বো টকস’! বলে প্রচার করে ‘আনা ক্রিস্টি’ ছবির অন্যতম আকর্ষণ বানিয়েছিল।
একই ছবির দুই সমাপ্তি
‘দ্য টেম্পট্রেস’ নিয়ে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক গল্পগুলোর একটি এর সমাপ্তি ঘিরে। ছবিটির দুটি ভিন্ন সমাপ্তি তৈরি হয়েছিল।
একটি বিষাদময়। কয়েক বছর পর রোব্লেদো আবার এলেনাকে দেখতে পান। তত দিনে তাঁর জীবন আমূল বদলে গেছে। একসময়ের মোহময়ী নারী এখন ভগ্ন, নিঃস্ব। রোব্লেদো তাঁকে চিনতে পারলেও এলেনার জীবনে আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অন্য সমাপ্তিটি তুলনামূলক সুখের—সেখানে এলেনা ও রোব্লেদোর পুনর্মিলনের সুযোগ রাখা হয়।
টার্নার ক্ল্যাসিক মুভিজে ছবিটি নিয়ে আলোচনায় বলা হয়েছে, মূল বিষাদময় সমাপ্তি দেখে এমজিএমপ্রধান লুই বি মেয়ার একটি সুখী সমাপ্তি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময় দর্শকের পছন্দের কথা মাথায় রেখে একই ছবির বিকল্প সমাপ্তি তৈরির নজিরও ছিল।
দুটি সমাপ্তিই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায়নি। পরবর্তী সময়ে গার্বোর চলচ্চিত্র নিয়ে প্রকাশিত ঘরোয়া ভিডিও সংগ্রহে বিকল্প সমাপ্তিটিও রাখা হয়। নির্বাক চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার ‘সাইলেন্ট এরা’র নথিতেও এর উল্লেখ রয়েছে।
এক শতাব্দী পর দাঁড়িয়ে ব্যাপারটি বেশ মজারই মনে হয়—একই প্রেমের গল্প, অথচ দুটি পথ। শেষটা বিষাদের হবে, না মিলনের?
হারিয়ে যায়নি ছবিটি
‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর শতবর্ষের আরেকটি তাৎপর্য এখানেই।
নির্বাক যুগের বিপুলসংখ্যক চলচ্চিত্র আজ আর দেখার উপায় নেই। সময়ের সঙ্গে নেগেটিভ ও প্রিন্ট নষ্ট হয়েছে, কোনোটি আগুনে পুড়েছে, কোনোটি আবার সংরক্ষণের অভাবে চিরতরে হারিয়ে গেছে। ‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর ভাগ্য তেমন হয়নি।
নির্বাক চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার ‘সাইলেন্ট এরা’ জানিয়েছে, ছবিটির ৩৫ মিলিমিটার প্রিন্টের অস্তিত্ব রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ছবিটি ঘরোয়া ভিডিওতেও প্রকাশিত হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে। তাদের চলচ্চিত্রের স্বত্ব নিবন্ধনসংক্রান্ত সংগ্রহে ‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর ১৯২৬ সালের নিবন্ধনের তথ্য সংরক্ষিত আছে। সেখানে দাবিদার হিসেবে মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার করপোরেশনের নাম পাওয়া যায়।
অর্থাৎ ১৯২৬ সালে প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে বসে যে দর্শকেরা তরুণ গার্বোকে এলেনা হয়ে পর্দায় দেখেছিলেন, এক শতাব্দী পরের দর্শকের কাছেও সেই অভিনয় হারিয়ে যায়নি।
এক শতাব্দী পর
‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর পর গার্বোর পথ দ্রুত বদলে যায়। ‘ফ্লেশ অ্যান্ড দ্য ডেভিল’, ‘লাভ’, ‘আ ওম্যান অব অ্যাফেয়ার্স’ পেরিয়ে নির্বাক যুগ থেকে তিনি প্রবেশ করেন সবাক চলচ্চিত্রে। এরপর ‘আনা ক্রিস্টি’, ‘গ্র্যান্ড হোটেল’, ‘কুইন ক্রিস্টিনা’, ‘কামিল’, ‘নিনোচকা’—একের পর এক ছবি তাঁকে চলচ্চিত্র ইতিহাসের কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
অথচ সেই দীর্ঘ যাত্রার একেবারে শুরুর দিকে দাঁড়িয়ে আছে ‘দ্য টেম্পট্রেস’। যে ছবির শুটিং শুরুর এক মাসের মাথায় তাঁর সবচেয়ে কাছের পরামর্শদাতাকে পরিচালকের চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে ঘটনায় ক্ষুব্ধ তরুণ গার্বো হলিউড ছেড়ে সুইডেনে ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। আবার সেই ছবিরই তৈরি হয়েছিল দুটি আলাদা সমাপ্তি।
তারপর কেটে গেছে ১০০ বছর। সেই স্টুডিও ব্যবস্থা নেই। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগও ইতিহাস। ওটিটি,শর্টস, রিলসের দুনিয়া এখন। মরিত্জ স্টিলার, ফ্রেড নিবলো, আন্তোনিও মোরেনো—সবাই এখন চলচ্চিত্রের অতীতের অংশ।
কিন্তু এটা বললে বাড়াবাড়ি হবে না, সেই ছবিটি রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে ক্যামেরার সামনে ২০ বছরের এক তরুণীর সেই মুখ। সামনে পড়ে আছে তাঁর প্রায় পুরো হলিউড–জীবন। তখনো তিনি জানেন না, কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর মুখ, তাঁর চোখ আর তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্য—সব মিলিয়ে জন্ম নেবে হলিউডের সবচেয়ে স্থায়ী কিংবদন্তিগুলোর একটি। তাঁর নাম গ্রেটা গার্বো।
আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট; ভ্যারাইটি, নির্বাক চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার ‘সাইলেন্ট এরা’ অবলম্বনে