যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, অস্কারে যাওয়া হচ্ছে না ফিলিস্তিনি অভিনেতার
বাংলাদেশ সময় আগামী সোমবার ভোরে লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে বসবে ৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের আসর। এবারের অস্কারে সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমা বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে তিউনেশিয়া সিনেমা ‘দ্য ভয়েজ অব হিন্দ রজব’। তবে অস্কার অনুষ্ঠানে যাওয়া হচ্ছে না সিনেমাটির ফিলিস্তিনি অভিনেতা মোয়াজ মালহিসের। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মালহিস লিখেছেন, ফিলিস্তিনি নাগরিক হওয়ায় তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে অস্কারের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে নিজের ছবির সাফল্য উদ্যাপন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
মালহিসের ভাষ্যে, ‘অস্কার অনুষ্ঠানের আর মাত্র তিন দিন বাকি। আমাদের ছবি মনোনয়ন পেয়েছে, আর আমি এই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছি। কিন্তু আমি সেখানে থাকতে পারব না।’ তাঁর ভাষায়, ‘পাসপোর্ট আটকানো যায়, কিন্তু কণ্ঠস্বর আটকানো যায় না।’
তিউনিসীয় নির্মাতা কাওথার বেন হানিয়ার ছবি ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’। সিনেমাটি পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের মর্মান্তিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৪ সালে গাজায় তার চাচার গাড়িতে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে সে, তার পরিবারের ছয় সদস্য এবং তাকে উদ্ধার করতে যাওয়া দুই প্যারামেডিক নিহত হন।
সত্যিকারের সেই ঘটনা নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি গত বছর ভেনিস উৎসবে প্রদর্শনের পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পরে অস্কারেও মনোনয়ন পায় সিনেমাটি।
তাই ছবিটির অভিনেতা অস্কার অনুষ্ঠানে যেতে না পারা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মালহিসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারার ঘটনাটি সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি চলচ্চিত্রের গল্প নয়; বরং বিশ্বরাজনীতি, যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের প্রতিফলনও বটে।
মোয়াজ মালহিস জানান, ছবিটির সঙ্গে তাঁর আবেগ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কারণ, এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়; বরং যুদ্ধের ভেতরে আটকে থাকা মানুষের কষ্টের একটি প্রতীক। তিনি বলেন, ছবিটির গল্পে যে বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সেই কারণে অস্কারে উপস্থিত থাকতে না পারা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টের বিষয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে ফিলিস্তিনি পাসপোর্টধারীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারছেন না। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে মালহিস ছাড়াও ছবির সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজন সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারছেন না।
ছবিটির পরিচালক কাওথার বেন হানিয়া তিউনিসিয়ার নাগরিক হওয়ায় অস্কার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে হিন্দ রাজাবের মা উইসাম হামাদাও যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি। তিনি বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে গ্রিসে আশ্রয়ে রয়েছেন এবং সেখান থেকেই অস্কারের অনুষ্ঠান দেখবেন।
পর্দায় হিন্দ রজব
হিন্দ রজবকে নিয়ে গত বছর নির্মিত হয়েছে তিনটি সিনেমা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ সিনেমাটি। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনী ও সমাপনী দিনে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কারের পর সিনেমাটি তুমুল আলোচিত হয়। ছয় বছরের রজবের কণ্ঠ যেন প্রতিবাদী হয়ে সামনে আসে। বার্তা দেয়, বিশ্বজুড়ে গণহত্যা বন্ধ হোক। সিনেমায় হিন্দ রজবের কোনো উপস্থিতি ছিল না। তাকে কোনো ফ্রেমে দেখা যায়নি। সিনেমাজুড়ে ছিল শুধু তার কণ্ঠ, যা গত বছরই বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সেই কণ্ঠই শত শত দর্শক–সমালোচককে কাঁদিয়েছে। বিবিসিতে সিনেমাটির সমালোচনায় নিকোলাস বার্বার লিখেছেন, ‘সিনেমাটি সাংবাদিক, ইন্ডাস্ট্রির পেশাদারদের ভেনিস উৎসবে দেখানো হয়। সিনেমায় দূরের কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। কাছে দেখেছি কান্না। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। কারও চোখ লাল হয়ে যায়। সবাই ছিল চুপচাপ, কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না কেউই।’
৮৯ মিনিটের সিনেমাটিতে কী রয়েছে
ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) জরুরি নম্বরে হঠাৎ একটি ফোন কল আসে। ছয় বছরের একটি শিশু গাড়ির মধ্যে আটকা পড়েছে। শিশুটি ফোন করে তাকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিল। ভয়ার্ত কণ্ঠে শিশুটি জানায়, গাড়িটি তখনো আগুনে জ্বলছে। সেই গাড়ির মধ্যে সে। শুধু তা–ই নয়, গাড়িতে থাকা মানুষেরাও মারা গেছে। রেড ক্রিসেন্ট থেকে ৫২ মাইল দূরে আটকে পড়া শিশুটিকে উদ্ধারের গল্পটি বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে। ভ্যারাইটি থেকে জানা যায়, সিনেমায় শিশুটির ফোন করে বাঁচতে চাওয়ার আকুতির কণ্ঠস্বর অরিজিনাল ফোন কল রেকর্ডিং।
কী ঘটেছিল—এ নিয়ে আল–জাজিরা সিনেমাটির রিভিউতে লিখেছে, চাচা-চাচি আর চার চাচাতো ভাইবোনের সঙ্গে গাজা সিটি থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী তাল আল-হাওয়া শহরের দিকে যাচ্ছিল তারা। পথে রজবদের বহনকারী গাড়িটি ইসরায়েলি ট্যাংকের মুখে পড়ে। পাশ থেকে গোলাগুলির শব্দও শোনা যেতে থাকে। কী হতে পারে, ঘটনা আঁচ করতে পেরে হিন্দের চাচা সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন জার্মানির এক আত্মীয়কে। তাঁকে জানান, তাঁরা বিপদে রয়েছেন। পরে ঘটনাটা ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানানো হয়। দ্রুত তারা এই বিপদে থাকা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকে। কিন্তু পিআরসিএস কল কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। ততক্ষণে গাড়িতে হামলা করা হয়েছে। তখন হিন্দ ও তার ১৫ বছর বয়সী চাচাতো বোন লিয়ান বেঁচে ছিল।
হিন্দ রজবের কাজিন লিয়ানের সঙ্গে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্যদের কথা হয়। লিয়ান পিআরসিএসকে ফোন দিয়ে জানায়, তাদের গাড়ির কাছেই ইসরায়েলের কয়েকটি ট্যাংক। ১৫ বছরের লিয়ানের পরবর্তী সময়ে প্রকাশ পাওয়া সেই অডিওতে ভয় আর কান্নার স্বরে লিয়ান বলতে থাকে, ‘আমি আর হিন্দ বেঁচে আছি। আমার মা-বাবা, আমার বোনেরা সবাই মারা গেছে।’ লিয়ান বলে, ‘তারা আমাদের ওপর গুলি করছে। ট্যাংকটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে। সেখানে ফিলিস্তিনিরা। তারা আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে।’
এমন সময় অডিওতে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। বাধাগ্রস্ত হয় ফোন কল। একসময় শুধু শোনা যায় শিশুটির চিৎকার। একাধিক গোলাগুলির পর চিৎকারও বন্ধ হয়ে যায়। ফোনটি কেটে গেলে রেড ক্রিসেন্টের সদস্য ওমর একই নম্বরে সঙ্গে সঙ্গে কল ব্যাক করে। সে সময়ই রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা জানতে পারেন, গাড়িতে থাকে সবাই মারা গেছে। জীবিত শুধু ছয় বছরের শিশু হিন্দ। শিশুটি গাড়িতে একাই আটকে রয়েছে। ছয়জন মৃত মানুষের পাশে একটা ছয় বছরের জীবিত শিশু। হিন্দকে ফোনে পাওয়া যায়। সে ভয়ে কথা বলতে পারছিল না। ভয়ে আর আতঙ্কে একসময় বলতে থাকে, ‘প্লিজ, এখানে আসো, আমাকে বাঁচাও।’
শিশুটি তখনো ট্যাংক থেকে গুলির শব্দ শুনছিল। সেটা শিশুটির একদমই পেছনে ছিল। একসময় ট্যাংক এগিয়ে এলে শিশুটি চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। রেড ক্রিসেন্টের সেই ফোন কলটি আবার কেটে যায়। তখন তারা ধারণা করেছিল, হয়তো এবার শিশুটি আর বেঁচে নেই। পরে তাকে আবার ফোনে পাওয়া যায়। শিশুটি এবার জানায়, চারপাশে অন্ধকার। তার ভয় লাগছে। কিন্তু ভালো করে কোনো কিছুই তখনো শোনা যাচ্ছিল না। সে সময় ওই এলাকায় ইন্টারনেটের সমস্যা দেখা দেয়। একসময় কারও কোনো কথাই বোঝা যায় না। তবে রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা তখন হঠাৎ ড্রোনের শব্দ শুনতে পান। তেমন কিছু বোঝা না গেলেও তাঁরা শিশুটির উদ্দেশে বলেন গাড়িতে থাকতে। বাইরে বের হলে তার সঙ্গে খারাপ কিছু হতে পারে। তাকে লাঞ্ছিতও করতে পারে ইসরায়েলিরা।
কিছুটা সময় নেটওয়ার্কের সিগন্যাল পাওয়া যায় না। কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। এদিকে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি হচ্ছে যাওয়ার জন্য। তারা শিশুটির ফোন কলের অপেক্ষা করে। ধরেও নেয়, শিশুটিকে হয়তো আর পাওয়া যাবে না। তারাও আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটায়। পরে শিশুটিকে ফোনে পাওয়া যায়। তখন রেড ক্রিসেন্টের এক সদস্য ও শিশুটি একসঙ্গে সুরা ইখলাস পাঠ করেন। শিশুটি রেড ক্রিসেন্টের সদস্যের সঙ্গে ভয়ে ভয়ে পাঠ করে, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম...।’ পরে শিশুটি সাহায্যের জন্য বারবার অনুরোধ করে। এ ঘটনা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাঁদিয়েছিল।
কিন্তু একদমই যুদ্ধের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তারা নানাভাবে শিশুটিকে সহায়তার চেষ্টা করে। তারা আগে থেকেই জানত, ইসরায়েল সেখানে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা দিতে থাকে। তবু চেষ্টা চলতে থাকে। রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা জানিয়েছিলেন, এমন পরিস্থিতিতে গত চার মাসের মধ্যে তাঁরা পড়েননি। পরে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়। এদিকে হিন্দকে ফোনে নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়া হয়, যেন ভেঙে না পড়ে। যেন ভয় না পায়। কারণ, তখনো মনে করা হচ্ছিল, হিন্দ রজবকে উদ্ধার করা সম্ভব। এরই মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ হয়। সঙ্গে সঙ্গে রেড ক্রিসেন্টের সদস্যদের সঙ্গে হিন্দের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কেটে যায় ফোন কলটি। তাহলে হিন্দের কী হলো?
রেড ক্রিসেন্টের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার বেশ কিছু অডিও বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হয়। সেই অরিজিনাল অডিও সংগ্রহ করেন পরিচালক। সেটা দিয়েই নির্মিত সিনেমা ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর ২৩ মিনিট করতালি পায়। এমন ঘটনা খুবই কম ঘটে। একই সঙ্গে সিনেমাটি দেখে আপ্লুত হন দর্শক, সমালোচকেরা। দর্শকেরা হিন্দের ভয়েস শুনে ইমোশনাল হয়ে যান। শেষ সময়েও শিশুটি বারবার বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আর ছয় বছরের শিশুটি বাঁচতে পারেনি।
টাইমস অব ইন্ডিয়া, ভ্যারাইটি অবলম্বনে