পাঞ্জাবের এক গ্রামের পটভূমিতে সিনেমার গল্প। শুরুতেই জেভা নাট ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা সরদার জাটদের ওপর আক্রমণ করে। এই আক্রমণে মারা যায় সরদার জাট ও তার স্ত্রী। বেঁচে যায় সরদারের ছেলে মওলা জাট। দানি নামের এক নারীর কাছে বড় হতে থাকে মওলা। একদিন দানির ছেলে মওলাকে তার শিক্ষকের কাছে নিয়ে যায়। এই শিক্ষক কুস্তি শেখান। শুরুতেই মওলার পারদর্শিতা শিক্ষককে মুগ্ধ করে। একসময় কুস্তিগির হিসেবে মওলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ এক রাতে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন মওলাকে অতীতে নিয়ে যায়। মওলা গ্রামে ফিরে গিয়ে এক বৃদ্ধের কাছে জানতে পারে, অত্যাচার, অপহরণ, ধর্ষণসহ নাট পরিবারের অপকর্মে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ। মওলার মধ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। এ খবরে চলে যায় নাট পরিবারের কাছে। এই পরিবারের বর্তমান শাসক নুরি নাট জ্বালিয়ে দেয় মওলাদের গ্রাম। শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।

কেন সিনেমাটি দর্শকের এত ভালো লেগেছে? গল্পটির উপস্থাপনা ও একের পর এক চমক দর্শককে পর্দা থেকে চোখ সরাতে দেয় না। ঐতিহাসিক সিনেমার প্রেক্ষাপট মানেই বড় পরিসর। সাজসজ্জা, মেকআপ, যথাযথভাবে সময়কে ধরতে না পারলে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেবেন—এমন ভাবনা শুরু থেকেই পরিচালকের ছিল। ক্যারিয়ারের এই দ্বিতীয় সিনেমা নিয়ে তাঁকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। ২০১৯ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতরে সিনেমাটির মুক্তির কথা থাকলেও কপিরাইট নিয়ে প্রযোজককে ভুগতে হয়েছে।

কারণ, অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া মওলা জেট ছবির সরাসরি রিমেক। কখনো শুটিংয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অভিনেতা। পরে শুরু হয় করোনার সংক্রমণ। যাহোক, সবকিছু ছাপিয়ে সিনেমাটি এখন পাকিস্তানি ইন্ড্রাস্টিতে সুবাতাস বইয়ে দিয়েছে। অ্যাকশন, ড্রামা, ফ্যান্টাসি ঘরানার সিনেমাটি আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানি সিনেমাকে জায়গা করে দিচ্ছে। দেশটির কোনো সিনেমা এর আগে ১০০ কোটি রুপি আয় করতে পারেনি। আয়ের দিক থেকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সিনেমা জওয়ানি ফির নাহি আনি-২। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি আয় করেছিল ৭০ কোটি রুপি। তৃতীয় আয় করা সিনেমা লন্ডন নাহি জাউঙ্গা, চলতি বছর মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি এখন পর্যন্ত আয় করেছে ৫৫ কোটি রুপি।

‘দ্য লেজেন্ড অব মওলা জাট’-এর প্রশংসা করে গার্ডিয়ান, বিবিসি, আল-জাজিরা, ভ্যারাইটিসহ বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই আল-জাজিরা লিখেছিল, মাত্র ১৫ লাখ ডলার বাজেটের সিনেমা প্রথম সপ্তাহেই সারা বিশ্ব থেকে ২৩ লাখ ডলার আয় করেছে।

সিনেমাটির প্রযোজক আমারা হিকমত আল-জাজিরাকে বলেন, ‘২০১৪ সাল থেকে আমরা সিনেমাটির কাজ শুরু করেছি। চেয়েছি, এ সিনেমা আমাদের অন্য সিনেমা থেকে আলাদা করে নির্মাণ করতে। আমাদের চেষ্টা সফল। আশা করছি সিনেমাটি পাকিস্তানি ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নেবে। যাঁরা এখানে সিনেমায় বিনিয়োগ করেন, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করবে।’ গার্ডিয়ান-এর সিনেমা সমালোচক ক্যাথ ক্লার্ক লিখেছেন, ‘গেম অব থ্রোনস ও গ্ল্যাডিয়েটর-এর মোলাকাত এই সিনেমা...প্রতিটি মিনিট উপভোগ করেছি।’

২০১৩ সালে প্রথম ছবি ‘ওয়ার’ দিয়েই ভারতের রামগোপাল ভার্মার মতো পরিচালকের প্রশংসা পেয়েছিলেন বিলাল লাশহারি। দ্বিতীয় সিনেমা ‘দ্য লেজেন্ড অব মওলা জাট’ তো তাঁকে নিয়ে গেল অন্য উচ্চতায়। সিনেমাটির শুধু পরিচালনাই নয়, ক্যামেরা, সম্পাদনা, চিত্রনাট্যের কাজও নিজেই সামলেছেন তিনি। সিনেমাটি নিয়ে বিলাল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘অনেক দেশ বিশ্ববাজারে বিভিন্ন ধরনের সিনেমা রপ্তানি করছে। তাদের মধ্যে আছে হলিউডের ওয়েস্টার্ন, বলিউডের মিউজিক্যাল, জাপানের সামুরাই বা হংকংয়ের কুংফু ফিল্ম। “পাঞ্জাবি গান্ডাসা” পাকিস্তানি ধারার সিনেমা। এই ধারায় ফিরে গিয়ে ধারাটিকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি।’

সিনেমায় মওলা জাট চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাকিস্তানি গায়ক-অভিনেতা ফাওয়াদ খান, নুরি নাট চরিত্রে অভিনয় করেছেন হামজা আলী আব্বাসী। আরও আছেন মাহিরা খান, হুমাইমা মালিক, গহর রশিদ প্রমুখ।

২৮ অক্টোবর পর্যন্ত সিনেমাটির সর্বমোট আয় ছিল ১১৫ কোটি রুপি। শুধু পাকিস্তান থেকেই রেকর্ড গড়ে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি রুপি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আয় করে ৮২ কোটি রুপি। এটিও নতুন রেকর্ড।