তারকা নয় অচেনা গল্পই টরন্টোর নতুন আকর্ষণ

বড় স্টুডিও আর তারকানির্ভর ছবির পাশাপাশি স্বাধীন সিনেমা অনেক বেশি জায়গা করে নিয়েছে উৎসবে। কোলাজ

এই শহরে শীত আসন্ন। টরন্টোর বাতাসে তার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। কখনো তাপমাত্রা ১৫, কখনো ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে। হালকা জ্যাকেট গায়ে শহরের পথে হাঁটার জন্য বেশ আরামদায়ক আবহাওয়া। আর সেই আবহাওয়ায় কিং স্ট্রিট ওয়েস্টের রাইটম্যান স্কয়ার থেকে আশপাশের এলাকা এখনো ধরে রেখেছে সিনেমার উৎসবের আমেজ।

শনিবার সেখানে গিয়ে দেখা গেল, টিআইএফএফ লাইটবক্স ঘিরে মানুষের আনাগোনা। কারও গলায় উৎসবের পরিচয়পত্র, কারও হাতে ছবির প্রদর্শনীর টিকিট। কেউ এসেছেন সিনেমা দেখতে, কেউ তারকার একঝলক দেখার আশায়। আবার টরন্টো ঘুরতে আসা পর্যটকদের অনেকেও মিশে যাচ্ছেন উৎসবের ভিড়ে। রাইটম্যান স্কয়ার ও কিং স্ট্রিটের আশপাশে তাই সিনেমাপ্রেমী, চলচ্চিত্রকর্মী আর পর্যটকের আলাদা সীমানা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

দেশ-বিদেশ থেকে আসা নানা বয়স ও বর্ণের মানুষের আড্ডায় মুখর এলাকা। কেউ প্রদর্শনী শেষে দাঁড়িয়ে ছবি নিয়ে তর্ক করছেন, কেউ পরের ছবির সময় মিলিয়ে নিচ্ছেন, কেউবা উৎসবের নাম লেখা স্থাপনার সামনে ছবি তুলছেন। আশপাশের ক্যাফে-রেস্তোরাঁতেও একই আবহ। ইংরেজির পাশাপাশি কানে আসে নানা ভাষা। বহুজাতিক টরন্টোর চরিত্র যেন চলচ্চিত্র উৎসবকে ঘিরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শহরের কেন্দ্রের পরিচিত পর্যটন এলাকাগুলোয়ও উৎসব দেখতে আসা মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ল। চলচ্চিত্র দেখতে আসা দর্শকের সঙ্গে মিশে আছেন শহর দেখতে আসা পর্যটকেরা। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব তাই শুধু প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে আটকে নেই; শহরের ব্যস্ত কেন্দ্রের দৈনন্দিন জীবনেও মিশে গেছে।
এই ভিড়ের দিকে তাকালেই এবারের উৎসবের একটি পরিবর্তন চোখে পড়ে। এখানে শুধু বড় তারকার জন্য অপেক্ষা করা দর্শক নেই; বিশ্বের নানা প্রান্তের, নানা ভাষার ছবি দেখতে তরুণদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।

বড় তারকার কমতিও অবশ্য ছিল না। উৎসবের বিভিন্ন দিনে লালগালিচা ও আয়োজনে দেখা গেছে পেনেলোপে ক্রুজ, হাভিয়ের বারদেম, সিনথিয়া এরিভো, নাওমি ওয়াটস, মিশেল ইয়ো ও ব্ল্যাকপিংক তারকা লিসার মতো পরিচিত মুখকে। পেনেলোপে ক্রুজ ও হাভিয়ের বারদেম একসঙ্গে এসেছিলেন ‘বাংকার’–এর প্রিমিয়ারে। আর লিসাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘অলওয়েজ লালিসা’র প্রিমিয়ারে তাঁকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো।

তবে রোববার ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ দিনে এসে আরেকটি ছবি স্পষ্ট—বড় স্টুডিও আর তারকানির্ভর ছবির পাশাপাশি স্বাধীন, আন্তর্জাতিক ও ভিন্ন ভাষার সিনেমা এবার টরন্টোয় অনেক বেশি জায়গা করে নিয়েছে।

বদলাচ্ছে দর্শক
এই পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করলেন টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান প্রোগ্রামিং কর্মকর্তা অনিতা লি। তিনি জানালেন, সিনেমা দেখতে আসা দর্শকের বয়সে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তরুণ দর্শকেরা আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরছেন এবং মূলধারার বাইরের সিনেমা ও বিশ্বের নানা প্রান্তের গল্পের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মের এই দর্শকেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বমুখী।

১০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া উৎসবের ১০ দিন পেরিয়ে সেই প্রবণতার ছাপ আরও স্পষ্ট। উদ্বোধনী ছবি ‘বিয়িং হিউম্যান’ থেকে সিনথিয়া এরিভোর ‘প্রাইমা ফেসি’, অ্যালেক্স গিবনির ‘মাস্ক’, পিটার ফ্যারেলির ‘আই প্লে রকি’, ক্রিস রকের ‘মিস্টি গ্রিন’, জেসি আইজেনবার্গের ‘দ্য ডেব্যু’, ব্ল্যাকপিংক তারকা লিসাকে নিয়ে ‘অলওয়েজ লালিসা’—বিষয় ও নির্মাণে একেবারেই আলাদা এসব ছবি নিয়ে আলোচনা হয়েছে টরন্টোয়।

ফিলিস্তিনি চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাঈদ, ইউক্রেন যুদ্ধ, ভূমধ্যসাগরের অভিবাসন সংকট, শ্রমিক আন্দোলন কিংবা ইরানের নারীদের জীবন নিয়েও ছবি এসেছে উৎসবে। অর্থাৎ এবারের ছবির তালিকা শুধু তারকার নাম দিয়ে তৈরি হয়নি; বিশ্বের চলমান বাস্তবতারও একটি বড় ছবি হয়ে উঠেছে উৎসবটি।

অনিতা লির ভাষায়, বর্তমান বিশ্বের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। টিআইএফএফ এমন একটি জায়গা হতে চায়, যেখানে আলোচনার সুযোগ থাকবে; একই সঙ্গে চলচ্চিত্র, শিল্প ও নির্মাতারাই থাকবেন আয়োজনের কেন্দ্রে।
চীন থেকে ফিলিস্তিন: বাড়ছে বিশ্বের উপস্থিতি

উৎসবের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক চরিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। চীনা ভাষার ও চীন-সংশ্লিষ্ট ছবির উপস্থিতি এবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, এবারের উৎসবে ছয়টি চীনা ভাষার ও চীন-প্রযোজিত ছবি জায়গা পেয়েছে, গত বছর ছিল তিনটি। এর পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ার চীনা ভাষার ছবিও এসেছে টরন্টোয়।

‘অলওয়েজ লালিসা’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

আলোচিত ছবির মধ্যে আছে মিশেল ইয়ো অভিনীত বাই শুয়ের ‘ইটস মাই টাইম’, পিটার চ্যানের ‘দ্য রোড নট টেকেন’ এবং জৌ জিংয়ের ‘আ গার্ল আননোন’। টরন্টোয় মিশেল ইয়ো বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কোরীয় ও জাপানি সিনেমা যেভাবে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছেছে, চীনা সিনেমার ক্ষেত্রেও তেমন সম্ভাবনা তিনি দেখছেন। এবারের উৎসবে চীনা অভিনেত্রী ফ্যান বিংবিংকে বিশেষ সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে।

এশীয় উপস্থিতির আরেক বড় উদাহরণ ‘অলওয়েজ লালিসা’। সু কিম পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্রটির প্রিমিয়ারে লিসা নিজেই হাজির হয়েছিলেন। লালগালিচায় তাঁকে ঘিরে ছিল ভক্তদের ব্যাপক উচ্ছ্বাস। ছবিতে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় উঠে এসেছে—ব্ল্যাকপিংক থেকে বিরতি নিয়ে একক সংগীতজীবন, ‘অলটার ইগো’ অ্যালবাম, ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক এবং কোচেলায় একক পরিবেশনার প্রস্তুতি।

একই উৎসবে মাস্ক, যৌন সহিংসতা, প্রতিবন্ধী অধিকার
বিষয়ের বৈচিত্র্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। অস্কারজয়ী নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনির প্রায় চার ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্র ‘মাস্ক’–এর কেন্দ্রে বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্কের বিপুল অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রভাব। গিবনি বলেছেন, ছবিটির উদ্দেশ্য শুধু মাস্কের জীবনী তুলে ধরা নয়, প্রযুক্তিজগতের অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা তৈরি করা। মাস্ক অবশ্য ছবিটির সমালোচনা করেছেন।

সিনথিয়া এরিভো অভিনীত ‘প্রাইমা ফেসি’ যৌন সহিংসতা, সম্মতি ও বিচারব্যবস্থার জটিলতা নিয়ে। সফল ফৌজদারি আইনজীবী টেসা যৌন অপরাধে অভিযুক্তদের পক্ষে আদালতে লড়েন। কিন্তু সহকর্মীর হাতে নিজেই যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার পর সেই একই বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে একজন অভিযোগকারী হিসেবে। সুজি মিলারের মঞ্চনাটক থেকে ছবিটি পরিচালনা করেছেন সুজানা হোয়াইট।

মিশেল ইয়ো অভিনীত ‘বাই শুয়ের ‘ইটস মাই টাইম’–এর পোস্টার। আইএমডিবি

অন্যদিকে উদ্বোধনী ছবি ‘বিয়িং হিউম্যান’–এ অস্কারজয়ী ‘কোডা’র নির্মাতা শান হেডার তুলে এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের অগ্রণী কর্মী জুডি হিউম্যানের জীবন। জুডির চরিত্রে অভিনয় করেছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী রুথ মেডলি। ১৯৭৭ সালে সান ফ্রান্সিসকোয় জুডির নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মীদের ২৬ দিনের ঐতিহাসিক অবস্থান কর্মসূচিও এসেছে ছবিতে। সেই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের পুনর্বাসন আইনের ৫০৪ ধারা কার্যকর করতে সরকারকে চাপ দিয়েছিল।
প্রামাণ্যচিত্রের নির্বাচনেও ছিল একই বৈচিত্র্য। জেমস মার্কাস হ্যানির ‘ব্ল্যাক সানফ্লাওয়ারস’ ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে তরুণদের জীবন অনুসরণ করেছে। মাইকেন বেয়ার্ডের ‘এডওয়ার্ড সাঈদ: বিটুইন ওয়ার্ল্ডস’ ফিরে দেখেছে ফিলিস্তিনি বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্য সমালোচক এডওয়ার্ড সাঈদের জীবন ও চিন্তার উত্তরাধিকার। সিনে প্লামবেকের ‘রেসকিউ’ ভূমধ্যসাগরের অভিবাসন সংকট নিয়ে; আফসানেহ সালারির ‘তেহরান, আন্ডার দ্য স্কিন’ ইরানের সৌন্দর্যশিল্পের ভেতর দিয়ে নারীদের জীবন দেখেছে। বারবারা কপলের ‘ইউনিয়ন টাউন’–এর কেন্দ্রে শ্রমিক আন্দোলন। ‘রেসকিউ’ ও ‘তেহরান, আন্ডার দ্য স্কিন’–এর নির্বাচনও তরুণ ও আন্তর্জাতিকমুখী দর্শকের জন্য এবারের উৎসবের বৈচিত্র্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে রয়টার্স।

‘প্রাইমা ফেসি’র দৃশ্য। আইএমডিবি

শেষ দিকে আলোচনায় যেসব ছবি
উৎসব যত শেষের দিকে এসেছে, বছরের আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মৌসুমে কোন কোন ছবি আলোচনায় থাকবে, সেই কথাও বেড়েছে। তবে এবারের টরন্টোয় একটি ছবিকে ঘিরে সর্বসম্মত উচ্ছ্বাস তৈরি হয়নি।

আলোচনায় রয়েছে পিটার ফ্যারেলির ‘আই প্লে রকি’। সিলভেস্টার স্ট্যালোনের ‘রকি’ তৈরির নেপথ্যের গল্প নিয়ে ছবিটি। ফ্যারেলির সঙ্গে টরন্টোর পুরোনো সুখস্মৃতিও আছে। তাঁর ‘গ্রিন বুক’ ২০১৮ সালে টরন্টোর দর্শক-পছন্দ পুরস্কার জিতে পরে অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র হয়েছিল।

জেসি আইজেনবার্গের ‘দ্য ডেব্যু’তে নজর কেড়েছেন জুলিয়ান মুর। ক্রিস রকের ‘মিস্টি গ্রিন’–এ রোজালিন্ড এলিয়াজারের অভিনয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মাইক লির ‘টেন্ডার লাভিং কেয়ার’, অ্যান্ড্রু স্কট অভিনীত ‘এলসিনোর’সহ ভিন্ন দেশ ও ঘরানার ছবি আন্তর্জাতিক সমালোচকদের পছন্দের তালিকায় এসেছে। ‘ভোগ’–এর উৎসব–সেরা ১০ ছবির তালিকায়ও ‘দ্য ডেব্যু’, ‘এলসিনোর’, ‘টেন্ডার লাভিং কেয়ার’, হেলেন মিরেন অভিনীত ‘আ ট্যালেন্ট ফর মার্ডার’সহ নানা ধরনের ছবি রয়েছে।

‘মাস্কা’–এর পোস্টার। আইএমডিবি

বাজারেও নতুন পরীক্ষা
শুধু ছবির নির্বাচনে নয়, কাঠামোতেও এবার বড় পরিবর্তন এনেছে টরন্টো। প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ‘টিআইএফএফ: দ্য মার্কেট’। ১০ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর মেট্রো টরন্টো কনভেনশন সেন্টারে বসেছিল এই চলচ্চিত্রবাজার।
‘স্ক্রিন ইন্টারন্যাশনাল’ জানিয়েছে, প্রথম আসরে নিবন্ধিত প্রতিনিধি ছিলেন ৭ হাজার ১০ জন, এসেছিলেন ৯২টি দেশ থেকে। প্রদর্শক ছিলেন ২৩৮ জন এবং ক্রেতা ১ হাজার ৪৭৩ জন। আয়োজকদের হিসাবে, বাজারের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও অধিবেশনে মোট উপস্থিতির হিসাব ১ লাখ ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। নিবন্ধিত প্রতিনিধির লক্ষ্য ছিল ৬ হাজার।

বাজারে ছবির কেনাবেচাও হয়েছে। আনা কেনড্রিক ও সেথ রোজেন অভিনীত ‘বেবিজ’–এর যুক্তরাজ্য, লাতিন আমেরিকা, জার্মানি ও কানাডার পরিবেশনা চুক্তির খবর দিয়েছে ‘স্ক্রিন ইন্টারন্যাশনাল’।

প্রথম আয়োজন নিয়ে চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য মিশ্র। কেউ ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বিক্রির সুযোগের প্রশংসা করেছেন। আবার কেউ কান চলচ্চিত্রবাজারের তুলনায় বিক্রির জন্য প্রস্তুত নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কম বলে মনে করেছেন। শুরুতে পরিচয়পত্র সংগ্রহের দীর্ঘ সারিও ভোগান্তি তৈরি করেছিল। আয়োজকেরা পরে ডিজিটাল পাস ব্যবহারের সুযোগ দেন এবং প্রথম দিনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

শেষ শনিবারে কানাডার গল্প
উৎসবের শেষ শনিবারে আলো অনেকটাই ফিরেছে কানাডার নিজের গল্পে। ১৯ সেপ্টেম্বর টরন্টোয় প্রিমিয়ার হয়েছে শন মেনার্ড পরিচালিত ‘রান টেরি রান’। ক্যানসারে ডান পা হারানোর পর ১৯৮০ সালে কৃত্রিম পা নিয়ে ক্যানসার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহে কানাডাজুড়ে ‘ম্যারাথন অব হোপ’ শুরু করেছিলেন ২১ বছর বয়সী টেরি ফক্স। নতুন প্রামাণ্যচিত্রটিতে আগে না দেখা ফুটেজও ব্যবহার করেছেন নির্মাতা। শনিবারের প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন টেরি ফক্সের ভাই ড্যারেল ফক্স।

শনিবারের গালা আয়োজনের অন্যতম ছবি ছিল ‘ভিলনভ: দ্য রাইজ অব আ লিজেন্ড’। কানাডার কিংবদন্তি ফর্মুলা ওয়ান চালক জিল ভিলনভকে নিয়ে ছবিটি ১৯ সেপ্টেম্বর প্রিন্সেস অব ওয়েলস থিয়েটার ও রয় থমসন হলে প্রদর্শিত হয়েছে। রোববারও ছবিটির আরেকটি প্রদর্শনী রয়েছে।

শেষ শনিবারে বাংলাদেশের উপস্থিতিও ছিল। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’–এর তৃতীয় টরন্টো প্রদর্শনী হয়েছে ১৯ সেপ্টেম্বর। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজন্তি বিভাগে জায়গা করে নেওয়ার পর ছবিটি টরন্টোর সেন্টারপিস বিভাগে আসে।

শেষ দিনেও থামছে না ছবি
আজ রোববার উৎসবের শেষ দিন। কিন্তু সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টরন্টোর বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ছবির প্রদর্শনী চলবে।

প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’, বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ‘ডায়েরি অব আ ম্যাড ওল্ড ম্যান’, দুপুর ১২টায় ‘ফোর সিজনস ইন জাভা’ এবং ১২টা ৪০ মিনিটে বারবারা কপলের ‘ইউনিয়ন টাউন’ দেখানো হবে। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে রয়েছে ‘ভিলনভ: দ্য রাইজ অব আ লিজেন্ড’।

শেষ দিনের বড় আগ্রহ অবশ্য দর্শক-পছন্দ পুরস্কার ঘিরে। টরন্টোর এই পুরস্কারের সঙ্গে অস্কারের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। ‘গ্রিন বুক’ ও ‘নোম্যাডল্যান্ড’–এর মতো দর্শক-পছন্দ পুরস্কারজয়ী ছবি পরে অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র হয়েছে। TIFF নিজেও পুরস্কারটিকে দীর্ঘদিন ধরে অস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
দর্শকের ভোটে এবারের বিজয়ী ছবির বিশেষ প্রদর্শনীও রাখা হয়েছে শেষ দিনে। একই দিনে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কারজয়ী ছবির প্রদর্শনী রয়েছে টিআইএফএফ লাইটবক্সে।

আরও পড়ুন

তারকার বাইরে পৃথিবীর গল্প
শেষ দিকে আয়োজক ও দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে যা বোঝা গেল, বড় তারকার উপস্থিতি টরন্টোর আকর্ষণ কমায়নি। পেনেলোপে ক্রুজ থেকে মিশেল ইয়ো, সিনথিয়া এরিভো থেকে লিসা—তারকারা ছিলেনই। কিন্তু তাঁদের পাশেই জায়গা পেয়েছে ইউক্রেনের তরুণদের গল্প, ফিলিস্তিনি চিন্তাবিদের জীবন, ভূমধ্যসাগরের অভিবাসী, শ্রমিক আন্দোলন, ইরানের নারী কিংবা এশিয়ার নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের ছবি।
৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব তাই শেষ হচ্ছে শুধু কয়েকটি বড় ছবি, তারকার লালগালিচা কিংবা পুরস্কারের হিসাব দিয়ে নয়। ১১ দিনের আয়োজন শেষে যে প্রবণতাটি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো টরন্টোর পর্দা আরও আন্তর্জাতিক, আরও বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের বড় শক্তি হয়ে উঠছেন এমন একদল তরুণ দর্শক, যাঁরা পরিচিত তারকার পাশাপাশি পৃথিবীর অন্য প্রান্তের অচেনা গল্পও দেখতে চান।