‘৪০ রাত বোমার শব্দে কেঁপেছে আমার সন্তানেরা’

নিজের অনুভূতির কথা লিখেছেন মুর্তজা অতাশ জমজমকোলাজ

‘ফেরেশতে’ চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনের গল্প তুলে এনেছেন ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা মুর্তজা অতাশ জমজম। তিনি সর্বশেষ ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ইরানে যুদ্ধের দিনগুলোতেও বাংলাদেশের মানুষের খোঁজখবর ও সহমর্মিতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। নিজের অনুভূতির কথা লিখেছেন মুর্তজা অতাশ জমজম

প্রায় তিন মাস ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর যখন আবার বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হলো, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, এ সময়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে থাকা বন্ধুদের কাছ থেকে অসংখ্য বার্তা এসেছে। তাঁরা যুদ্ধের দিনগুলোতে আমার, আমার পরিবার ও ইরানের মানুষের খোঁজখবর নিয়েছেন।

এই বার্তাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল বাংলাদেশ থেকে। শুধু আমার পরিচিত শিল্পী ও বন্ধুদের কাছ থেকেই নয়, এমন অনেক মানুষের কাছ থেকেও বার্তা পেয়েছি, যাঁদের আমি কখনো দেখিনি। এই সুন্দর ও হৃদয়ছোঁয়া অনুভূতির আমার কাছে একটিই অর্থ—আমাদের জাতিগুলোর মধ্যে মানবতা ও সংস্কৃতির এক গভীর ও অভিন্ন শিকড় রয়েছে।
আপনাদের দেশের গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে আমি উপলব্ধি করেছি, ইরানের মানুষের প্রতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা কত গভীর। এই ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি কেবল একটি শব্দ নয়, এর গভীর শিকড় মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত।

আমার বন্ধুদের অনেকেই—নারী ও পুরুষ, বাংলাদেশে আমাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন; কিন্তু আজ বুঝলাম, এটি শুধু একটি প্রচলিত সম্বোধন নয়; বরং আপনাদের জাতির হৃদয়ে লালিত এক সত্যিকারের অনুভূতি। হয়তো বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই আন্তরিকতা স্বাভাবিক ব্যাপার, তবে একজন অন্য দেশের মানুষ হিসেবে আমি এটিকে গর্ব করার মতো এক মহৎ মানবিক গুণ বলে মনে করি।
আজ আগের চেয়েও বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে আমি আপনাদের সঙ্গে এই ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে গর্ব অনুভব করি।

পরিচালক ও ইরানি প্রযোজক মুর্তজা অতাশ জমজম

আমাদের অভিন্ন সাংস্কৃতিক শিকড়
আপনারা জানেন, ইরান হলো মাওলানা, সাদি, হাফিজ, খৈয়াম, নিজামি ও রুদাকির দেশ। একটি জাতি—যারা প্রেম, সৌন্দর্য ও মানবিকতাকে শ্রদ্ধা করে; আর যুদ্ধকে মানবতার শত্রু ও অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখে।
যুদ্ধ কখনো ধ্বংস আর হত্যাযজ্ঞ ছাড়া কিছু নয়; আর ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে অসহায় শিকার হয়ে এসেছে শিশু ও নারীরা। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি; সাম্প্রতিক ইসরায়েল ও আমেরিকার আগ্রাসনেও সেই নির্মম সত্য আবার সামনে এসেছে।
আপনারা আমার ও আমার পরিবারের খোঁজ নিয়েছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভালো আছি। তবে আমাদের বাসা থেকে দুই রাস্তা দূরের একটি হাসপাতালে বোমা হামলার কারণে অ্যাপার্টমেন্টের জানালাগুলো ভেঙে যায়। সে কারণে কয়েক সপ্তাহ পরিবার নিয়ে আমাকে আমার অফিসেই থাকতে হয়েছিল।

আপনারা আমার সন্তানদের কথাও জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তারা ভালো আছে; কিন্তু টানা ৪০ রাত বোমা হামলার ভয়াবহ শব্দে ঘুম ভেঙে আতঙ্কে কেঁপে উঠত। আমি তাদের বুকে জড়িয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতাম। অথচ আমার দেশের অনেক শিশু তাদের মা-বাবার কোলেই প্রাণ হারিয়েছে।

মুর্তজা অতাশ জমজমের ‘ফেরেশতে’ সিনেমার দৃশ্যে সুমন ফারুক ও জয়া আহসান
প্রযোজকের সৌজন্যে

বর্তমান যুদ্ধে ৩ হাজার ৩৭৫ জন শহীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন নিরীহ নারী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। আপনারা দেখেছেন, হামলার প্রথম দিকেই মিনাবের শাজারা তাইয়েবা স্কুলে ১৬৭ শিশু নিহত হয়েছিল—নিষ্পাপ ফেরেশতারা মুহূর্তেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।
ইরানের মানুষ কখনো যুদ্ধ চায় না; কিন্তু নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য তারা সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই হাজারো বিমান হামলায় ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য স্কুল, হাসপাতাল ও ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা—যেগুলোর ইতিহাস আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের বহু আগের। ইউনেসকোর ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন, শত শত বছরের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রেহাই পায়নি।
হয়তো তারা ঝড় তুলতে পেরেছে; কিন্তু সত্য হলো—আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিবৃক্ষের ডালপালা ঝড়ে নুইয়ে পড়তে পারে; কিন্তু তার শিকড় কখনো উপড়ে যায় না।

সিমুর্গের উপাখ্যান

আমাদের শিকড় সংস্কৃতি, ভালোবাসা ও মানবতায়। আপনারা জানেন, আমাদের সংস্কৃতিতে একটি কিংবদন্তির পাখি আছে, সিমুর্গ। মহান কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তার তাঁর বিখ্যাত মানতিকুত তোয়ায়ের-এ যার কাহিনি বর্ণনা করেছেন।

সত্যের সন্ধানে ৩০টি ক্লান্ত ও অনুসন্ধানী পাখি কাফ পর্বতের দিকে উড়ে গিয়েছিল সেই কিংবদন্তির সিমুর্গকে খুঁজে পাওয়ার আশায়। যত তারা এগিয়ে গেল, ততই ঐক্য, আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার শক্তি তাদের এক করে দিল। অবশেষে তারা উপলব্ধি করল, সিমুর্গ আসলে তাদের সম্মিলিত অস্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি। সবাই মিলে তারা এক সত্য, এক আত্মা ও এক পাখিতে পরিণত হয়েছিল।
ইরানও তেমনই। এই মাটি হয়তো আজও জালিম ও অশুভ শক্তির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত; কিন্তু এর মানুষের আত্মা সিমুর্গের মতোই ঐক্যের ডানায় ভর করে আবারও উড়বে।
আমরা দাঁড়িয়ে আছি প্রেম, মানবতা ও মর্যাদাকে রক্ষার জন্য।
ঘৃণা থেকে নয়, বিশ্বাস থেকে। (ফারসি থেকে অনূদিত)


মুর্তজা অতাশ জমজম, ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা