ব্রাজিলের ওপরে তো কোনো দল হয় না। কিন্তু ভাবো, ফাইনালের দিন আমাদের তো আম্মুর কাছেই যেতে হবে, টিভি তো বেডরুমেই।

‘আব্বু, বাংলাদেশের জনসংখ্যা আর তোমাদের ছেলেমানুষি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামান্য খেলা নিয়ে তোমরা যা করছ! কাল খাবার টেবিলে সেভেন আপ দেখে তুমি রাগ করে ভাত রেখে উঠে গেলে। আজ আবার এই ঘরে ঘুমাতে এসেছ। এসব কী?’

‘লাইট জ্বালা।’

‘কেন?’

‘অন্ধকারে তোর গালে চড় মারলে জায়গামতো বসবে না। বাতি জ্বালা, ঠিকমতো দেখে মারি।’

আমি চুপ করে রইলাম। সহিংস আচরণ! লকডাউনে অনেকেই মারমুখী হয়ে উঠেছে। এর কারণ স্ট্রেস! আর কিছু না।

‘এটাকে তুই সামান্য খেলা বলছিস?’ ধমকে উঠল আব্বু, ‘সেই ১৯১৯ সালে রিও ডি জেনিরোতে শিরোপ উঁচিয়ে ধরেছিল ব্রাজিল। তারপর থেকে শুরু…এই ২০১৯ সালেও শিরোপা জিতল কে? ব্রাজিল…।’

কানে ইয়ারফোন গুঁজে দিলাম আমি। কোপা আমেরিকার ইতিহাস শোনার কোনো আগ্রহ আমার নেই। দ্রুত এখান থেকে বেরোতে হবে আমাকে। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এল। কান থেকে ইয়ারফোন নামিয়ে বললাম, ‘ব্রাজিলের ওপরে তো কোনো দল হয় না। কিন্তু ভাবো, ফাইনালের দিন আমাদের তো আম্মুর কাছেই যেতে হবে, টিভি তো বেডরুমেই।’

‘আর্জেন্টিনার সমর্থকের পাশে বসে আমরা খেলা দেখব, এটা হতে পারে না।’

‘তো কী করবা? তোমার তো টিভি নাই।’

‘টিভি কিনব। হেহ্, কী ভেবেছিস তুই? কালই টিভি অর্ডার দিয়ে দেব। ডিসকাউন্ট চলছে এখন। আচ্ছা, কাল কেন? এখনই তো অর্ডার দিতে পারি। লাইট জ্বালা।’

আমি বাতি জ্বালিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। খুব ভালো লাগছে।

ডাইনিংয়ে গিয়ে কল দিলাম রিমাকে। অনেকক্ষণ ধরে কল দিচ্ছিল আমার ফোনে। ধরেই গর্জে উঠল রিমা, ‘অ্যাই, তুমি কান্তার ছবিতে লাভ দিলা কেন?’

‘কোন ছবি? নাহ্, কী বলো? কখন?’

’১০ মিনিট আগে। ও ছবি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমি লাভ দিছ।’

সেরেছে! বোধ হয় আব্বুর কথায় চমকে উঠে ভুলে লাভ রিঅ্যাক্টে চাপ পড়ে গেছে! কী বিপদ!

‘ইয়ে আমি দিই নাই, আব্বু দিয়েছে।’

‘কী?’

‘মানে আব্বু হঠাৎ এসে ফোনটা কেড়ে নিয়েছিল তো, মনে হয় চাপ পড়ে গেছে।’

‘কত মিথ্যা কথা যে তুমি বলো! ইতালির জার্সি কিনেছ?’

‘অবশ্যই। তুমি কিনতে বলেছ, না কিনে পারি? আর আমি তো ছোটবেলা থেকে ইতালির সাপোর্টার।’

‘জার্সি পরে ছবি পাঠাও এখনই। ফাইনালের দিন আমরা দুজন ইতালির জার্সি পরা ছবি ফেসবুকে স্টোরি দেব। ওকে?’

‘অবশ্যই। ইতালিই জিতবে এবার ইউরোতে।’

আমি বহু কষ্টে খুশি চেপে রাখলাম। যাক, এবার আমার ঘরে একটা টিভি আসবে। ইটস কামিং হোম! ইতালির জার্সিটা খুলে শুয়ে পড়লাম।

এমন সময় আম্মু এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে, তুই জার্সি পরে কী করিস এখানে?’

‘ওই রিমার সঙ্গে ইউরো নিয়ে কথা বলছিলাম।’

‘এত রাতে?’

‘ইউরোর খেলা তো রাতেই হয়। তা ছাড়া আব্বু তখন থেকে শুধু ব্রাজিল এই ব্রাজিল সেই বলে যাচ্ছে। কেমন লাগে, বলো?’

‘তোর আব্বু দিন দিন অসহ্য হয়ে উঠছে। না বুঝে অযথা চেঁচামেচি করার অভ্যাস তার গেল না। কোনো দিন যাবেও না। ব্রাজিলের প্রত্যেকটা সাপোর্টার এ রকম। খেলার কিছু বোঝে না, খালি ট্রফি ট্রফি! ব্রাজিল সাপোর্ট করে—এটা আগে জানলে বিয়েই করতাম না!’

রিমা আবার কল দিচ্ছে। আমি কেটে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আম্মু বলল, ‘আজকে সে কত বাজেভাবে অপমান করেছে আমাকে, জানিস? বলে, তোমার ছেলেটার কথা ভাবো। বেচারা দুনিয়ার কত কিছু দেখল, একটা মহামারি পর্যন্ত দেখে ফেলল, অথচ আর্জেন্টিনাকে কোনো দিন কোনো ট্রফি জিততে দেখল না। এই কথা বলার পর তার সঙ্গে থাকা যায়? তুই বল!’

‘এই কথা বললে তো থাকা কঠিন।’

‘আমিও একদম বের করে দিয়েছি। ফাইনালের আগে মুখ দেখাদেখি বন্ধ! তুই যা, ঘুমিয়ে পড়।’

রিমার সঙ্গে কথা শেষ করে ঘুমাতে গেলাম আমি। বিছানায় উঠতেই আব্বু ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘টিভি অর্ডার দিয়েছি। ফাইনালের আগেই দিয়ে যাবে বলল।’

আমি বহু কষ্টে খুশি চেপে রাখলাম। যাক, এবার আমার ঘরে একটা টিভি আসবে। ইটস কামিং হোম! ইতালির জার্সিটা খুলে শুয়ে পড়লাম। বালিশের নিচে খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি ইংল্যান্ডের জার্সি। কেউ জানুক আর না জানুক, আমি তো জানি আমার প্রিয় দল কোনটা!