default-image

সাদা বাস ও লাল বাস। কারোরই ডানে যাওয়ার উপায় নেই, বাঁয়ে যাওয়ারও পথ নেই। আবার সামনে যাওয়াও কঠিন, পা যে আটকে আছে। পেছনে অন্যরা আছে ভুরু কুঁচকে। একেই হয়তো বলে নিখুঁত ত্রিশঙ্কু অবস্থা! এই মানবজীবনে আমরাও কখনো কখনো ঠিক এভাবেই আটকে পড়ি। তখনকার অবস্থা নিয়েই একটু আলোকপাত করা যাক।

একটি বহুল চর্চিত বাণী হলো, ‘জীবন বহতা নদীর মতো’। কে দিয়েছেন এ বাণী, সে আলোচনায় না যাই। এ কথা আমরা শুনেছি বহুবার। সমস্যাজর্জর প্রশ্ন হলো, বর্তমান মানবজীবন কি নদীর মতো বয়ে চলে সব সময়? নাকি ছবির বাস দুটির মতো আটকে যায় কখনো কখনো?

এমনটা হওয়া কিন্তু বিচিত্র নয়। উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন, দেশের নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়ার আগে শুনলেন কোনো দলীয় ব্যক্তির এলাকা ছাড়ানোর বজ্র হুংকার। আগে ভালো ভালো কথা বলে ভোট চাওয়ার চল ছিল। এখন তা পাল্টে গেছে হুমকিতে। এমতাবস্থায় আপনার মনের অবস্থা কেমন হতে পারে, তা কিছুটা আন্দাজ করা যায়। ওই সাদা বাসটির মতোই কি?

কিন্তু যদি সহযোগিতার কথা বলে আপনার ভোটই অন্যে দিয়ে দেয়, তখন? এমনটা হয়েছেও। প্রথম আলোর খবরেই প্রকাশ, ঠাকুরগাঁওয়ে সদ্য অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে একজন ভোটারের এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। তেমনটা হলে, আপনার নিজেকে সাদা-নীলরঙা বাসটির মতো অসহায় মনে হতেই পারে। ব্যক্তিগত বা পেশাজীবনেও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। সবাই চেপে ধরলে চিড়েচ্যাপ্টা হতে আর কতক্ষণ?

তবে এমন পরিস্থিতিতে পড়লে কতিপয় বিজ্ঞজনের পরামর্শ হলো, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কৌশল ঠিক করতে হবে। মনে রাখবেন, চাপ সহ্য করে যাওয়াও একটা গুণ। চাপ নিতে নিতে একদিন হয়তো আপনি রাবার হয়ে যেতে পারবেন। কঠিন আকারে না থেকে তখন তরল হতে শিখবেন। দেখবেন, কোনো চিপাই আর নেই সে চিপা! লাল বাসের মতো আকারে তখন বড় হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। যে পাত্রেই রাখা হোক না কেন, সুন্দর মানিয়ে নিতে পারবেন তাতে। ঠিক বাংলা সিনেমার পরিবারদরদি ও সর্বংসহা চরিত্রের মতো আপনি নিজের সুখ বিসর্জন দিতে শিখে যাবেন। তবে খবরদার, ‘ফাইট’ করতে যাবেন না। রুপালি পর্দায় ফাইট করা সহজ, বাস্তব জীবনে সেটির অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। চিপা থেকে মুক্ত হওয়া তখন কঠিন হয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
আটকে পড়া অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য এরপর হয় ব্যাক গিয়ারে আপনাকে পেছনে যেতে হবে, নয় গিয়ার বদলে সামনে এগোতে হবে। দুই অবস্থাতেই আপনার ছাল-চামড়া উঠে যেতে পারে, জানালার কাচ ভাঙতে পারে।

অবশ্য কখনো কখনো চিপা আরও কঠিন হতে পারে। ফ্রানৎস কাফকার গল্পের মতো এক সকালে আপনার রূপ বদলে যেতে পারে। শুনতে পারেন, জীবিত আপনি হয়তো কাগজে-কলমে মরে গেছেন। এমন অভাবিত কাণ্ডও সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ঘটেছে, জীবিত শিক্ষক নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে হয়ে যান ‘মৃত’। এমন অবস্থায় পড়লে ঘাবড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক, মনে অজানা শঙ্কা ও সংশয় উঁকি দিয়ে ভেংচি কাটতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে সবার আগে নিজের গায়ে চিমটি কাটুন জোরে। নিজেই নিজেকে জোরে চিমটি কাটার সাহস সঞ্চয় করতে না পারলে, দুঃসাহসী অন্য কোনো নিকটাত্মীয়কে ডেকে আনুন। চিমটি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা অনুভূত হলে বা অবচেতন মনে দেওয়া আর্তচিৎকারে আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনি উঠলে বুঝবেন, আপনি বেঁচে আছেন। খবরদার, অন্য কোনো সংস্থার সার্ভারে জীবিত ‘আমি’কে খুঁজতে যাবেন না। চিপা আরও সরু হয়ে যেতে পারে, লাল বাস আপনাকে আরও চাপে ফেলতে পারে।

আটকে পড়া অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য এরপর হয় ব্যাক গিয়ারে আপনাকে পেছনে যেতে হবে, নয় গিয়ার বদলে সামনে এগোতে হবে। দুই অবস্থাতেই আপনার ছাল-চামড়া উঠে যেতে পারে, জানালার কাচ ভাঙতে পারে। সে ক্ষেত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনার পর, যে কাজে ছাল-চামড়া কম উঠবে, জানালার কাচ ফাটবে কিন্তু ভাঙবে না—সেটি বেছে নিতে হবে। দেখুন, ছাল-চামড়া, সে যত মোটাই হোক, আপনারই তো, তাই না? সে তুলনায় জানালার কাচ নিয়ে কম ভাবতে পারেন। কারণ কাচ গেলেও, জানালা দিয়ে তো আলো-বাতাস ঢুকবেই! তা ছাড়া জরুরি বহির্গমনের একটা পাকা ব্যবস্থাও তো হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় অবশ্য ওই শিক্ষক যে বেঁচে আছেন, সেই মর্মে তাঁকে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞজনেরা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে দেশের প্রতি কোনায় এমন প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার সুবিধা চালু করা এখন সময়ের দাবি। কে, কখন, কোন সার্ভারে ‘মরে’ যান, কে জানে! আর একদিন হুট করে তা জানতে পেরে, পরিচিতজনেরা যদি ভূতের ভয় পান, সে দায় কে নেবে?

আশা করি, কেউ স্বপ্নেও দায় নেওয়ার চিন্তা করবে না। এতদঞ্চলে ‘দায়মুক্তি’ শব্দের উদ্ভব তো আর এমনি এমনি হয়নি। এর চেয়ে বরং বেঁচে থাকার প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার সুবিধা সব এলাকাতেই চালু হোক।

তবে প্রশ্নটা হলো—বেঁচে থাকা পরীক্ষা করতে চিমটিটা কে কাটবে?

একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন