default-image

বিশ্বের অনেক মানুষের হাতে এখন স্মার্টফোন। ফলে বাড়ছে বেশি সময় ধরে মুঠোফোনে সময় কাটানো মানুষের সংখ্যা। যুক্তরাষ্ট্রে একজন মুঠোফোন ব্যবহারকারী ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ২ হাজার ৬১৭ বার মুঠোফোন স্পর্শ করেন। আবার এই তালিকার ওপরের দিকে থাকা ১০ শতাংশ মানুষ ২৪ ঘণ্টায় স্পর্শ করেন ৫ হাজার ৪০০ বার!

২০১৬ সালে মার্কিন জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ডিসকট এই তথ্য দিয়েছিল। তবে জরিপের ফল যে আমাদের দেশেও প্রায় একই রকম হবে, তা তরুণদের মুঠোফোনে মুখ গুঁজে বসে থাকা দেখলেই বলে দেওয়া যায়। আগে এলাকার মুরব্বিরা অভিযোগ করতেন, ‘অমুকের ছেলেটা চোখে চোখ রেখে কথা বলে।’ এখন পারলে তাঁরাই বলেন, ‘বাবা, মাথাটা তোলো। মুখের দিকে একবার তাকিয়ে কথা বলো।’

তো কেন আমরা সারা দিন কারণে-অকারণে মুঠোফোনটা হাতে নিই? গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. জোবায়ের মিয়া বলেন, ‘মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার একধরনের আসক্তি। এই ধরনের সমস্যাকে বলা হয় মানসিক ও আচরণগত আসক্তি। যেহেতু এই আসক্তি সরাসরি শরীরে কোনো সমস্যা তৈরি করে না, তাই এটাকে অনেকে সমস্যা মনে করতে চান না। তবে এই আসক্তি আপনাকে সহজে অসামাজিক করে ফেলতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

মুঠোফোন বেশি ব্যবহারের কারণ

মুঠোফোন এখন শুধু কথা বলার জন্য নয়, হাজার রকম ফিচার আছে স্মার্টফোনে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, মেসেঞ্জার, ইউটিউব, ওটিটির মতো নানা রকম অ্যাপের ফাঁদে পড়ে সময় যাচ্ছে নদীর স্রোতের গতিতে। আধুনিক ও সহজ জীবনযাপনে বেড়েছে ফোনাসক্তি। ঘরের বাজার থেকে আত্মীয়ের খোঁজ—সবখানেই ভরসা মুঠোফোন। করোনাভাইরাস মহামারি এসে সেই পালে দমকা হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। মানুষ একাকিত্ব কাটাতেও মুঠোফোনের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে হয়তো সাময়িক একটা সময় পার হচ্ছে, কিন্তু দিন শেষে একাকিত্ব আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যেকোনো তথ্য জানতে গুগল করা, বিনোদনের জন্য ইউটিউব বা ওটিটিতে থাকা, তথ্য আদানপ্রদান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি ইত্যাদি কারণে মুঠোফোনের বেশি ব্যবহার চোখে পড়ছে।

বেশি ব্যবহারে সমস্যা

অকারণে মুঠোফোন ব্যবহারের ফলে আসক্তি তৈরি হয়। মনোরোগ চিকিৎসকের মতে, এটা একধরনের মানসিক সমস্যা। অনেক মানুষের মধ্যে থেকেও অনেকে মুঠোফোনে ডুবে থাকেন। তাঁরা আসলে নিজের অজান্তে নিজেকে অন্যদের কাছে অসামাজিক হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলছেন। কোনো জরুরি সভা-সেমিনার বা আড্ডায় বারবার মুঠোফোন ঘাঁটলে বাকিরাও বিরক্ত হন। তৈরি হয় নেতিবাচক ধারণা। বেশি বেশি মুঠোফোন ব্যবহারে মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। কাজের সময় কমে আসে। অভ্যাসের কারণে অনেককে উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তায় ভুগতে দেখা যায়। ঘুমের সমস্যা বাড়াতেও বেশি বেশি মুঠোফোনের ব্যবহার দায়ী।

বিজ্ঞাপন

বদভ্যাস দূর করবেন যেভাবে

আইফোন ব্যবহারকারীরা স্ক্রিন টাইম দেখে সেটা প্রতিদিন একটু একটু করে কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারেন। একইভাবে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা গুগলের ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারেন। এই অ্যাপগুলো আপনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে সময় নষ্ট করার হিসাব। মনোরোগ চিকিৎসক মো. জোবায়ের মিয়াও পরামর্শ দিয়েছেন, প্রতিদিন মুঠোফোন ব্যবহারের জন্য নিজেই সময় বরাদ্দ করে নিন। মনে মনে ভাবতে হবে, কিছুতেই আমি ওই সময়ের বাইরে ফোন ধরব না।

পরিবারের সঙ্গে বা জরুরি কাজে থাকলে এয়ারপ্লেন মোড অন করে বা সুইচ অফ করে রাখতে পারেন। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। যদিও করোনার কারণে সেটা কঠিন। তারপরও জোবায়ের মিয়ার পরামর্শ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে অল্পসংখ্যক মানুষের সঙ্গে দেখা করা যেতেই পারে। কারও সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সময় অবশ্যই মুঠোফোন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। অফিসে বসার ডেস্ক ও বাসায় একটা নির্দিষ্ট স্থানে মুঠোফোন রেখে দিন। ঘুমানোর সময় মাথার কাছে না রেখে মুঠোফোন রাখুন একটু দূরে, এতে উঠে আনা-নেওয়ার ঝামেলা থেকে ব্যবহার কমবে। যোগাসনের মাধ্যমেও এই আসক্তি কমানো যায়। তাতেও কাজ না হলে চিকিৎসকের কাছ থেকে ঘুরে আসা ছাড়া উপায় নেই।

মন্তব্য পড়ুন 0